ঘরে তো সকলকেই ফিরতে হয়
চিরায়ত সত্য বই আর কিছু নয়,
তবু আসা যাওয়ার মাঝে এই খেলা
কেউ বলে মায়া, কেউ বলে মেলা,
সময় ফুরোলে ধুলায় যাবো মিশে
যন্ত্রনা নির্মূল, হবে বিষক্ষয় বিষে |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২৩.০৪.২০২৩
Vaskar's Bengali Poetry - ভাস্কর এর বেহিসেবি বিস্ফোরণ ... উচ্ছাস | উন্মাদনা | অনুরণন | যন্ত্রনা | হীনমন্যতা | হাসি-কান্না | প্রেম | যৌনতা | অভিঘাত | সফর | বল্গাহীন গদ্য | নির্বাক পদ্য | অভিমান, ইত্যাদি | Bengali Poems | Bangla Poetry | Bengali Poetry
ঘরে তো সকলকেই ফিরতে হয়
চিরায়ত সত্য বই আর কিছু নয়,
তবু আসা যাওয়ার মাঝে এই খেলা
কেউ বলে মায়া, কেউ বলে মেলা,
সময় ফুরোলে ধুলায় যাবো মিশে
যন্ত্রনা নির্মূল, হবে বিষক্ষয় বিষে |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২৩.০৪.২০২৩
নীল হারায় যেথা দিগন্তের বুকে,
খুঁজেছি সেথায় সুখে আর দুখে;
বারেবার ছুঁয়ে দেখে মুহূর্তরা,
অপটু পুরুষ মন, দৃষ্টি আনকোরা;
সূর্যের অচেনা নীল রঙের খোঁজে,
আলগা অভিমান, ভরসা রোজের;
অমৃতের সন্ধানে কবেই দিয়েছি পাড়ি,
সাথে আকাশ, পাশে সিন্ধু ... আর নারী |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২০.০৪.২০২৩
ভালো আছি, ভালো থাকারই আয়োজন,
কখনো ডাইনে, কখনো বা বাঁয়ে
হয়তো বা গতিপথের বুক চিরে, একটু ধীরে
কোন ঘেসে দাঁড়িয়ে একগুঁয়ে ঠায়ে |
অগুনতি ছায়ালোক পেরিয়ে, নিশুতে
মাথার বালিশের ধারে বা লেপের কোনে,
চুপটি করে গুটলি পাকানো ধূমকেতুটা
ভালো থাকার মন্ত্র আওড়ায় যেখানে এক মনে |
কত শত ভরা কোটালের কালশিটে গায়ে,
প্রৌঢ় নৌকোর শরীর জুড়ে সজীব কাঠের কাজ,
ভাবে যদি নতুনের খোঁজে দেওয়া যায় পাড়ি
আরেকটিবার, গায়ে জোনাকি গাঁথা নতুন সাজ |
হয়তো বসন্ত, নতুবা বিষয়, বাসনা অন্তহীন,
থাকে যদি থাক সব অবসাদ বা জমাট যত গ্লানি,
অলস উঠোন পেরিয়ে সরু গলি ছাড়ালেই
বড় রাস্তার মুখে দাঁড়ানো অমরত্বের হাতছানি |
পরাভব যত, অপমান শত শত, কখনো ভাবিনি
এই চলন অযথা, যত প্রস্তুতি সব নিষ্প্রয়োজন,
ভোরের আলোয় নতুন তারে ফের কষেছি বীণা,
ভালো আছি, আসলে সব ভালো থাকারই আয়োজন |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৩.০২.২০২৩
কাঠামটা তো দুর্বল হয়েছে কয়েক দশক আগেই, নিঃশব্দে
কালের ঝামায় উজ্জ্বল তামাটে ছালটাও ফ্যাকাশে, অচেনা
ঘোলাটে অতীত, চটচটে যন্ত্রনা আর ধূসর খাঁজগুলির সীমানায়
জীর্ণ হাপরের বিষন্ন ধোঁয়া আজও বিলোয় মোক্ষলাভের ঠিকানা |
সেবার সেই যে তুমি কথা দিয়েছিলে পাশে থাকবে
বহু ব্যবহারে বিবর্ণ ক্যানভাসেও এক সাথে ছবি আঁকবে |
সকালের চা শেষে, দুজনে দুজনের বলিরেখা গুনবো
কান পেতে আমাদের পুরোনো ঘড়িটার টিক টিক শুনবো |
আর একবার পাশবালিশের গন্ডি পেরোনোর দুষ্কর চেষ্টায়,
কখনো বা অশক্ত আঙুলের শিরাগুলো ছুঁয়ে দেখার শেষটায়,
টান টান চামড়ার দাপাদাপি শেষে পড়ে থাকা যেটুকু,
অতি সযত্নে আগলে রাখা একরাশ আস্থা বুকে সেটুকু,
ঘষা কাঁচে ধুলো মতো জমা যত মলিন স্বপ্ন আর কিছু হাসি,
দেয়ালের কোন ঘেঁষে পড়ে থাকা অকেজো তুরুপের রাশি,
কেন গেলোনা তবে শেষ পর্যন্ত ভাগের কষ্ট একসাথে সওয়া ?
অগুনতি পিঙ্গল ঋতুচক্র শেষে একসাথে পরিণত হওয়া ?
তুমি সেদিন বড়ো মুখ করে কথা দিয়েছিলে পাশে থাকবে,
মনে আছে বলেছিলে ধূসর ক্যানভাসেও রঙিন ছবি আঁকবে |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ০৭.১২.২০২২
কুয়াশার ঠিক ওপারেই আছো
ফজরের আজানের সূচনায় তুমি,
বসন্তের আশু সবুজে আছো
ঝঞ্ঝা শেষের শান্ত প্রকৃতি তুমি |
নিকষ ক্লান্তির অবসানে আছো
কৈশোরের নাছোড় আবদারে তুমি,
সগর্ভার যন্ত্রনার উপশমে আছো
নবজাত প্রাণের উন্মেষে তুমি |
আছো মেঘের ক্ষীণ রুপালি রেখায়
ভীষণ মহামারীর প্রতিষেধকে তুমি,
ঘন আঁধার জ্বলে তোমার শিখায়
ভাঙা প্রত্যাশে নব সঞ্জীবন তুমি |
অনিমেশ আমি নিমেষের খোঁজে
গভীর আবেশে সিক্ত,
মুঠো আমার চির মুক্ত জেনো, বারেবার
করো আমায় রিক্ত |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৬.১১.২০২২
নীলাকাশ যেখানে নিত্য আত্মাহুতি দেয় তোমার উত্তাল বুকে
নিঃসীম সেই দিগন্তে হারিয়ে যাওয়ার পরমানন্দ পাইনি আজও,
অকাতর তবুও তোমার বুকে বার বার পাড়ি জমাই এই আশায়
কোনো এক গেরুয়া সূর্যাস্তের পড়ন্ত বিকেলে তোমায় সাক্ষী রেখে
দিগন্তে অন্তর্হিত হবে অস্তিত্ব আমার সবার অলক্ষে, অনায়াসে |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ০৩.১১.২০২২
বাহবা কুড়োনোর জন্য নয়, ছাদের কার্নিশে হেঁটেছি
তোমাকে আরেকটু কাছ থেকে দেখতে পাওয়ার লোভে,
কখনো দারুন রোদে, কখনো অবেলার জলে ভিজে
বারবার দেখেছি তোমায় মুগ্ধ বিস্ময়ে, কিভাবে কবে
কোন অছিলায়, জানলার ফ্রেমে ধরা সেই অপরূপ
রূপ বেশুমার, বেহিসাবি ব্যস্ততায় পান করেছি প্রানভরে,
কতশত পিচ্ছিল পথের শেষে, নিদারুন নীরব সংকল্পে,
ক্ষত বিক্ষত শরীরে পৌঁছে গিয়েছি সবার অগোচরে |
সময়ের ঘাতে বেইমান ঋতু নিয়ত বদলায়, আজ অসহায়
জানালার ফ্রেমে খুঁজি বারেবার, সেই অপরূপ ছবি, হায় |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ০৮.১১.২০২২
কোনো কোনো নিষ্প্রাণ অসহায় রাতে,
শূন্যতা ফুঁড়ে উঠে আসা আকুতিরা যখন
শিরদাঁড়া বেয়ে ওঠা-নামার ক্লান্তি ভুলে,
পাঁজরের এক কোনে জমে থাকা
মরচে পড়া বিষন্নতা খুঁটে খুচরো যন্ত্রণার মালা গাঁথে,
নিষ্প্রাণ স্থবির মন রাতের অগোচরে তখন
তোমার চিহ্ন কুড়োয় আলগোছে,
আলুথালু তোষকের ছিন্নভিন্ন কার্পাসে |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ৩১.১০.২০২২
দেখেছো দগ্ধ্যাতে আমায়,
করেছো উদযাপন আমার
আগুনে ঝলসানো অস্থি,
আমার অন্তর পোড়া ভস্ম বিনা
বিজয়ীর তিলক কাটতে
কোন ছাই দিয়ে, ভেবেছো কি ?
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২১.১০.২০২২
কখনো উদাস নির্জনতায়, কখনো বা ভীরু আনমনে
খুঁজে ফিরি কম্পিত এক ধূসর অবয়ব ক্ষনে ক্ষনে,
নিঃসঙ্গতার জোয়ার-ভাটায়, অগোছালো অন্য মনে
অচেনা মুখের ভিড়ে অথবা অন্তরের গহীন কোনে,
অস্ফূট সেই তুমি ছিলে, আছো নিশিদিন এই প্রাণে |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ০১.১১.২০২২
ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খুললেই দুর্গোৎসবের দারুন সব ছবি | ঝকঝকে, দৃষ্টিনন্দন, রুচিপূর্ণ, আনন্দদায়ক | আমার ছোটবেলার দূর্গা পুজোর স্মৃতি প্রধানত বারোয়ারি পুজোর বা ক্লাবের পুজোর | যদিও গুটিকয়েক সমৃদ্ধিশালী, সাবেকি, বর্ধিষ্ণু এবং বুনিয়াদি ধনী পরিবারের পুজো তাদের নিজস্ব ঠাকুর দালানেই হতো | অবশ্য সেরকম বাড়ির পুজো ছিল হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র | লক্ষ্মী পুজোটাই বরঞ্চ মধ্যবিত্ত্ব গৃহীর বাড়িতে ঘটা করে করার রেওয়াজ ছিল |
এখন কিন্তু প্রচুর (উচ্চ)মধ্যবিত্ত পরিবার বাড়িতেই রীতিমতো দুর্গাপুজোর আয়োজন করছেন | পাড়ার সরস্বতী আর শীতলা পুজোয় পারদর্শী পুরোহিত বাড়ির দূর্গা পুজো কতটা রীতিনীতি বা বিশুদ্ধ পদ্ধতি মেনে করতে পারছেন তা বলতে পারবোনা | তাতে অনাচার কতটা হচ্ছে বা আদৌ হচ্ছে কিনা তাও বলতে পারবো না | তবে গৃহী এবং গৃহিণীর নিষ্ঠা কিন্তু দেখার মতো এবং প্রভূত প্রশংসার যোগ্য | যাবতীয় তোড়জোড়, সাজগোজ, শোনা গয়না, ঢাক কাঁসর, ধুপ ধুনো, মন্ত্রপাঠ, লোকজন, চন্ডী স্তোত্র আর রবির গান থেকে শুরু করে উদ্দাম ধুনুচি নাচ আর আশা ভোঁসলের 'উরি উরি বাবা' - সব মিলিয়ে একটা মার্ কাটারি ব্যাপার | মধ্যবিত্ত বাড়ির পুজোর দৃশ্যগুলো যেন একতা কাপুরের পারিবারিক টেলিসিরিয়ালগুলির এক একটি সেটের চকচকে স্থিরচিত্র | আমার মনে হয় প্রধান তিনটি কারণে মধ্যবিত্ত্ব পরিবারগুলি এখন বাড়িতে দুগ্গোপূজোর আয়োজন করতে শুরু করেছেন:
১) পুণ্যি হয় সরাসরি এবং অর্থ ব্যয়ের সমানুপাতিক | অনেকের চাঁদার অর্থে আয়োজিত বারোয়ারি পুজোয় পুণ্যি ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে | বাড়ির পুজোয় সে হ্যাপা কম | গৃহী যেহেতু সব খরচ বহন করছেন, আশা করা যায় তার এবং তার পরিবারের পুণ্যির সম্ভাবনা সব চেয়ে বেশি এবং খরচের সমানুপাতিক |
২) সামাজিক পরিচিত বাড়ে এবং প্রতিষ্ঠা সুদৃঢ় হয় | ছোটবেলায় যখন আমাদের বাড়িতে বিদ্যুতের আলো এসে পৌঁছয় নি, তখন অমুক মহাশয়ের বাড়িতে একটি এম্বাসেডর বা ফিয়াট গাড়ি আছে শুনলেই ছুটতাম একটিবার ঐ অপূর্ব বাহন দেখতে পাওয়ার লোভে | এবং আমরা নিশ্চিত হতাম এই গাড়ির মালিক নির্ঘাত একজন কেষ্ট-বিষ্টু | আজকাল বোধয় কেষ্ট-বিষ্টুর তকমা পেতে গেলে বাড়িতে দুগ্গোৎসব আয়োজনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে |
৩) উৎসবের মোড়কে মোচ্ছব | আমরা তুখোড় আড্ডাবাজ, যাই বলুন না কেন | যখন হাত শূন্য ছিল তখন ক্লাবের পুজোতেই সময় করে, বয়োজ্যেষ্ঠদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর করা শাসন এড়িয়ে, মোচ্ছব চলতো অল্পস্বল্প | ভোর রাতে চোরের মতো বাড়ি ঢোকার আগে ভালো করে দেখে নেওয়া হতো বাবা-জ্যাঠারা শুয়ে পড়েছেন কিনা | এখন অর্থের অভাব কমেছে, কামাই-টামাই বেড়েছে | বাড়িতে একটা পুজো করে ফেলতে পারলেই ব্যাস - পুণ্যি-টুনি তো হবেই, লোকেও জানবে ধর্মের প্রতি আমার অগাধ দায়বদ্ধতা আর নিষ্ঠার কথা, আমার সামাজিক প্রতিষ্ঠা আর প্রতিপত্তির কথা | তার সাথে হপ্তাখানেকের বাঁধনহীন মোচ্ছব |
পাড়ায় পাড়ায় মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারগুলির বাড়িতে দুগ্গোপুজোর আয়োজনের কারন অন্য আরো কিছু হতেই পারে | আমার জানা নেই | বন্ধুদের গোচরে থাকলে জানাবেন | সমৃদ্ধ হবো |
আমি কিন্তু অসূয়াপূর্ন বা cynical হয়ে যাইনি | বিশ্বাস করুন দু-একটা পুজোতে আমিও সাদা পাঞ্জাবিতে ভালো সুগন্ধ মেখেই গিয়েছি | ঢাকের তালে ধুনুচি নৃত্যও করেছি সাধ্যমতো | সুন্দর কিছু দৃশ্য ও মানুষ ক্যামেরাবন্দিও করেছি | সব মিলিয়ে, মজাই পাচ্ছি | চলতে থাকুক | মধ্যবিত্ত বাঙালি গৃহস্তের বাড়ির দূর্গা পুজো যুগ যুগ জিয়ো |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | অষ্টমীর আড্ডা | ০৩.১০.২০২২
|| প্রতীক্ষা ||
রামধনুর নোলক পরে, সেই যে মেঘের ওড়না জড়ালে, তারপর
অগুনতি নিঃসঙ্গ নিশুতি পেরিয়ে বিষণ্ণ দরবারী কানাড়া
যখন সারেঙ্গীর তার ছুঁয়ে শেষ রাতে ললিতের সন্ধানে বেরোতো
বার বার, কতবার তারাদের ভিড়ে তন্ন তন্ন খুঁজেছি তোমায় |
যদি একবার অগোচরে খসে পড়ে অভিমানের ওড়না, ভোর রাতে
ঘুম ভেঙে চাঁদের আলোয় যদি করি স্নান, আলোর চন্দনে
সেজে ওঠা তোমার মুখ কাছ থেকে দেখবো একবার, প্রতিবার
তুমি দেবে অঞ্জলি, আমি শুধু দেখবো তোমায়, ফিরে এসো একবার |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ৩০.০৯.২০২২
|| আমার শহর, তোমার শহর ||
আমার শহর, তোমার শহর, প্রাণের শহর, একলা শহর,
আলোর শহর, অবাক শহর, বেবাক শহর, একলা শহর,
গানের শহর, টানের শহর, মানের শহর, একলা শহর,
রবির শহর, রাতের শহর, তারার শহর, একলার শহর,
পুজোর শহর, প্রেমের শহর, ক্ষোভের শহর, এই শহর,
আমার শহর, তোমার শহর, প্রাণের শহর, একলা শহর |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ৩০.০৯.২০২২
সাহস লাগে এক আকাশ লক্ষ তারা গুনতে ,
স্পর্ধা লাগে অন্ধকারে আলোর মালা বুনতে |
সাহস বিনে কিসের জোরে ঝড়ের সাথে লড়াই ?
স্পর্ধা বিনে কোন সাহসে ভালোবাসার বড়াই ?
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২১.০৯.২০২২
===============================================================
বদনাম তো সেদিনই হয়েছিলাম, প্রিয়
তোমার উঠোনে যেদিন পা রেখেছিলাম,
কখনো তোমাতে, কখনো তোমার ছায়ায়
বেঁচে থাকার খোরাক খুঁজেছিলাম |
ওপথ সরল নয়, সুদীর্ঘ, তা কি মানিনে ?
সমান্তরালের নৈরাশা, তা কি জানিনে ?
নৈরাশ্যের পথ্য একটাই, কেবল আশা
ভালোবাসার অজুহাত, শুধুই ভালোবাসা
বদনাম তো সেদিনই হয়েছিলাম, তোমার
বুকে যেদিন এক ফালি জমি খুঁজেছিলাম |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২৬.০৯.২০২২
অসুর | নামটি নিশ্চই শোনা ?
ফুলের আগুনেই কি বনানীর পূর্ণতা ? পুষ্পোদ্গম ক্ষিতিজই কি পরম পরিপূর্ণতার একমাত্র শর্ত ? যে বৃক্ষের ফুল মোটে আসেই না, বা সহজে আসতে চায়না, তাদের কি ? তাদের স্থান এবং মর্যাদা কি তলানির কাছাকাছি ?
জন্মালে মরতেই হবে | অমোঘ সত্য | জন্মানোর সার্থকতা কি শুধুই সহজাত দক্ষতার প্রকাশ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা, জগৎ ব্যাপি পরিচিতি আর খ্যাতি, অর্থনৈতিক শ্ৰীবৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ ? যাদের এই জনমে রবীন্দ্রনাথ, রবিশঙ্কর, মেঘনাথ সাহা বা তেন্ডুলকর হয়ে ওঠা হলো না ? যে নারী মা হয়ে উঠতে পারলেন না কিম্বা হতে চাইলেন না ? যে পুরুষ অমানুষিক পরিশ্রম আর নিরলস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিবারের কাছে আদর্শপুরুষ হয়ে উঠতে পারলেন না ? যে শিশু জীবনের যাঁতাকলে পিষেও সমাজের তৈরী কাঠামো ও মান অনুযায়ী নিজেকে প্রমান করতে সক্ষম হলো না ? তাদের জীবন কি অসম্পূর্ণ ? এই ধোঁয়াটে প্রশ্নের উত্তরও অস্পষ্ট, কুয়াশাবৃত |
সম্পূর্ণতার সংজ্ঞা আমার জানা নেই | তবে অসম্পূর্ণতার লাবণ্যও কিন্তু কম নয় | একটু ভালো করে ভেবে দেখলে, সাফল্যের তুলনায় যে অসফলতার মাধুর্য্য কোনো অংশে কম নয়, তা বেশ বোঝা যায় | কুমোরটুলিতে কাঠামোয় লেপ্টে থাকা মাটির পরিত্যক্ত প্রতিমা দেখেছেন ? কোনো মণ্ডন বা অলঙ্করণ ছাড়াই ? কোনো কারনে হয়তো সেই অসম্পূর্ণ মূর্তি প্রতিমায় রূপান্তরিত হয়নি | তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়নি | সেবা-আরাধনা-অর্চনা হয়নি | তবু সেই মূর্তি অপরূপা | আমার কাছে নৈসর্গিক এবং সম্পূর্ণ |
সবাই মিলে কি সেই অপরূপ অসম্পূর্ণতাকেও উদযাপন করা যায় না ?
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৭.০৯.২০২২
শেষ যেবার রাত ভোর বিবস্ত্র করে
জন্ম চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করেছিলে,
প্রতিবাদ করতেই, মানুষ চেনার
এটাই নাকি সাচ্চা উপায়, বলেছিলে |
অন্ধকারের আলোয়, থুতনির খাঁজে
বাদামি তিলটাকে দেখে বলেছিলে,
অনুরত পুরুষের অমন তিল অশালীন
নির্ঘাত বেহায়া চরিত্রহীন ভেবেছিলে |
আমি যে তোমার যোগ্য, প্রমান হোক
হয়ত তাই মনে মনে চেয়েছিলে,
তাই বোধ হয় রাত ভোর বিবস্ত্র করে
জন্ম চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করেছিলে |
ভোরের আলো ভাঙতেই স্যাঁতসেঁতে
চোখের আকুতি লুকোতে চেয়েছিলে,
জানি ভালোবেসেছিলে অজান্তেই, তাই
অমন করে জন্ম চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করেছিলে |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৫.০৯.২০২২
লোকাল ট্রেন - কত শত স্বপ্নের উড়ান |
লোকাল ট্রেন - কঠিন ইস্পাতের সর্পিল দুটি সমান্তরাল রেখা বেয়ে গ্রামাঞ্চল আর মফস্সলের হাজার হাজার মানুষদের তাদের স্বপ্নের খোঁজে শহরের বুকে প্রতিদিন পৌঁছে যাওয়ার মোহিনী রথ |
লোকাল ট্রেন - কত শত অনুপম, অতুল ঘটনার সাক্ষী | কত শত অপূর্ব বন্ধুত্ব, সাহচর্য, প্রেম, ভালোবাসা, অনুকম্পা, অংশীদারিত্বের সাক্ষী | কত শত কুৎসিত কলহ, বিবাদ, বিচ্ছেদ, বিরহ, বিভেদের সাক্ষী | কত অক্লান্ত ঘাম ঝরানো শ্রম, কত দুর্ভাগ্যজনক রক্তক্ষয়ের সাক্ষী এই লোকাল ট্রেন |
লোকাল ট্রেন - কত অব্যক্ত অনুভব | কত না বলা কথা, কত কখনো না হওয়া আলাপ | নিখাত ভীরু আবেগ | সযত্নে লুকিয়ে রাখা কত চাহনি | না দেখা চোখের জল | কত অজানা মিনতি | অকালে মুছে যাওয়া হাসি | কত কাতর আবেদন, নীরব অভিমান | কত সাফল্য, ব্যর্থতা | কত নবীন সম্ভাবনার জন্ম | কত সম্ভাবনার করুন পরিণতি |
লোকাল ট্রেন - আঁকা বাঁকা অয়ন বেয়ে নিরলস ধেয়ে চলা এক অটল অঙ্গীকারের নাম 'লোকাল ট্রেন' |
অনেকদিন পর কর্ম সূত্রে আজ লোকাল ট্রেনে চড়ার সুযোগ নিলাম | স্মরণবেদনা, পুরোনো স্মৃতি হাতড়ানোর আকুলতা, নাকি নির্ভেজাল ভালো লাগা - কোন অনুভূতিটা মুখ্য ভাবে ছুয়েঁ গেলো বোঝার চেষ্টা করেও ঠাওর করতে পারলাম না | থাক, ওটা না হয় নাই বা বুঝলাম | লোকাল ট্রেনের সাথে আমার রোমান্স যে এখনো শেষ হয়ে যায় নি সেই উপলব্ধিটাই আসল |
বয়সের সাথে ধৈর্য্যের কি সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে ? ধৈর্য্য কি বয়সের সাথে সমানুপাতিক ভাবে বাড়ে নাকি কমতে থাকে ? এ প্রশ্ন বহু দিন যাবৎ আমাকে ভাবাচ্ছে | আমি নিয়মিত ভাবে আমার চারিপাশের মানুষদের খুব ভালো করে নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করি | অবশ্যই আমার 'sense of judgement'-কে খুব সযত্নে পাশে সরিয়ে রেখে | চেনা, অচেনা, আত্মীয়, পরিচিত, মিত্র, অমিত্র - সব্বাই কে | মায় নিজেকেও |
জার্নাল (দিনপত্রিকা বা ডায়েরি) লেখার একটা অভ্যাস ছোটবেলায় তৈরী করে দিয়েছিলেন ইস্কুলের ইউরোপীয় পাদ্রীরা | সেই ডায়েরি আমার সব চেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছিল জীবনের প্রায় শুরুর দিকটায় | ছোট পরিবারের একমাত্র সন্তানদের যা হয় আর কি | তার একটা নামও রেখেছিলাম - নীল (এই নাম রাখার কারণ কি ছিল, সেটা মনে পড়ছেনা, তবে এক্কেবারে প্রথম থেকেই ওই নামটি আমার বেশ পছন্দের) | শুরুতে অবশ্য সেরকম হওয়ার কথা ছিলনা | একান্নবর্তী পরিবারেই জন্ম | জীবনের প্রথম দশ বছর হৈ হৈ করে কেটে গিয়েছিলো | বাড়ি তো নয়, যেন হরেকরকম মানুষ, তাদের বিচিত্র সব কীর্তি কলাপ আর নতুন নতুন আশ্চর্য্যের হাট | একাকিত্ব শব্দ টি তখনও রৈ রৈ করে আমার জীবনে প্রবেশ করেনি | দশ বছর বয়স অবধি সীমাহীন ফূর্তি | অর্ধেক ডিম্ সিদ্ধ জুটলেও হাসছি আবার বড়দাদু (জ্যাঠার বাবা) কান মুলে দিলেও হাসছি | ছোটকাকা নতুন লাটাই কিনে আনলেও হাসছি আবার পুকুরের পাড়ে পড়ে গিয়ে হাঁটুর চামড়া হাঁ হয়ে গেলেও হাসছি | বন্ধুর ব্যাঙ্গেও হাসছি আবার ফুলদা'র রগড়েও হাসছি | যাই হোক, ওই অপার আনন্দ, ওই অপরিসীম তৃপ্তি বোধহয় নিয়তির গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠলো | ব্যাস, কেল্লা ফতে | দে ব্যাটাচ্ছেলেকে শায়েস্তা করে | ছিটকে গেলাম | এবার একটুকরো ছোট্ট পরিবার | বাবা, মা, আমি আর শূন্যতা | সেই যন্ত্রণার ব্যাখ্যা এই স্বল্প পরিসরে করা সম্ভব নয় | মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও হয়তো কম কষ্ট পেতাম | প্রথমবার আমার অভিধানে প্রবেশ ঘটলো একটি নতুন বাংলা শব্দের - একাকিত্ব !
যাই হোক, এমত সময়ে 'নীল' আমার প্রাণের সাথী হয়ে আমার জীবনে পদার্পন করলো | স্বর না থাকলেও আকাশের মতো একটা বড় হৃদয় ছিল তার | আমার সব আনন্দ, যন্ত্রনা, উচ্ছ্বাস, হতাশা, আবেগ, অনুভূতি অবলীলায় শুষে নিতে পারতো বিনা অভিযোগে, অক্লান্ত ভাবে | পাতার পর পাতা শুধু কথা আর কথা - আমার কথা, সবার কথা | নীল যেন নির্বাক অথচ সংবেদনশীল বন্ধু | তার পাতায় পাতায় ধরা থাকলো আমার ছেলেবেলা, বয়োসন্ধি, কৈশোর এবং যৌবনে প্রবেশের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা অগুনতি কাহিনী | দ্বিধার, বিভ্রান্তির, উল্লাসের, লজ্জার, বিহ্বলতার, সাফল্যের, ব্যর্থতার, বিশৃঙ্খলার, প্রেমের, ঘৃণার, - আরো কত কি | দিনের শেষে তার কাছে সব কিছু সযত্নে সঁপে দিতে পারলেই, ব্যাস - আমার সেকি অনাবিল শান্তি | সেই নীলের বুকেই খচিত আছে আমার দেখা অনেক অনেক মানুষের অবয়ব | তাদেরকে আমি যেমন ভাবে পেয়েছি বা নিদেনপক্ষে দেখেছি | তাদের সেই ছবিগুলো নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষন এবং মূল্যায়ন থেকেই উদ্ভূত | সেগুলো সঠিক নাকি একেবারেই গোলমেলে সে সব ভাবার ইচ্ছে বা প্রয়োজন তখন বোধ করিনি | সময়ের সাথে সাথে অনেক ছবি বদলেছে, মানছি | তার সাথে সঙ্গতি রেখেই আমার জার্ণালেও বদল এসেছে | কিন্তু স্থায়ী শব্দটার সাথে কোথাও যেন আমার একটা বৈরিতা আছে | সে প্রসঙ্গে অন্য একদিন আড্ডা দেওয়া যাবে | তবে আসল কথা হলো, বেশ অল্প বয়সেই চাকরি পেয়ে যাওয়ায় আবার ছিন্নমূল হওয়ার পালা | আমার প্রিয় শহর থেকে বহু দূরে | সেই শহরের গল্প, আমার নতুন জীবনের গল্প আরেকদিন | যাই হোক সুদূরে চলে যাওয়ার মাস ছয়েক পড়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়েছিলাম | বাড়ি ফিরে আবার সেই শিকড়ের সন্ধান | সব কিছুকে আবার ছুঁয়ে দেখা | নিজের অস্তিত্বের গোড়ার সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা | নীল কিন্তু হারিয়ে গেলো | সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাকে কোত্থাও পেলাম না | ঝড়ের মতো সে আমার জীবনে এসেছিলো | ম্যাজিকের মতো নিঃশব্দে কোথায় যেন বেমালুম হাপিশ হয়ে গেলো | হয়তো তাকে সাথে নিয়ে যাইনি বলে তার অভিমান হয়েছিল | হয়তো তার মনে হয়েছিল আমার জীবনে তার প্রয়োজন শেষ | তাকে কোনোদিন এটা বোঝানোর সুযোগটাই পেলাম না, যে তার প্রয়োজন আমার জীবনে আজও আছে |
যাক গে, আসল কথাটাই এগোলো না | হ্যাঁ, কি যেন বলছিলাম? মনে পড়েছে - বয়সের সাথে ধৈর্য্যের সম্পর্ক | আজকাল যথেষ্ট অধৈর্য্য হয়ে পড়ছি | কেন বলুন তো ? তবে যে মা বলতেন বয়সের সাথে সাথে ধৈর্য্য বাড়বে ? আচ্ছা, বন্ধুরা একটু সাহায্য করতে পারেন ? আপনাদের কি মত ? আপনাদের কি অভিজ্ঞতা ? একটু আলো ফেলুন না, দয়া করে | অন্ধকার কাটুক | অপেক্ষায় থাকলাম ...
বিশিষ্ট সমাজ কর্মী, পরলোকগত মহাত্মা মহানুভব ঈশ্বর মাগনলাল মেঘরাজ (বৃদ্ধ, জরাক্লিষ্ট অর্জুনের ছুরির খেলা মনে আছে নিশ্চই), গত তরশু কাক ভোরে আমায় স্বপ্নাদেশ দিলেন | বললেন, 'বাছা, সবই তো হোলো, ইহলোকে তো বহু ব্যাঘ্রই বধ করে ফেলেছো দেখছি | তবে, তোমাদের ইহলোকের অনুরূপ অমৃতলোকেও কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি শিল্পের প্রভূত উন্নতি ঘটেছে | ইহলোক থেকে প্রক্ষিপ্ত হাজার হাজার অধিবাসনের আবেদন আমাদের মানব সম্পদ উন্নয়ন দপ্তর 'কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা' নামক প্রযুক্তি দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অবলোকন করছেন | অমৃতলোকে প্রবেশের অগ্রাধিকার তারাই পাচ্ছেন যেসকল সহৃদয় ব্যক্তি নব নব সামাজিক এবং অসামাজিক মাধ্যমগুলিতে নিজেদেরকে সাফল্যের সহিত স্থাপন করেছেন এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বমহিমায় বিচরণ করছেন | তো বাছা, কৃপাসিন্ধু পার হওয়ার জন্য তোমাকে কিন্তু কিছু বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে | তোমাকে চট করে এক নতুন প্রজাতির সামাজিক নৌকোয় সত্তয়ারি হতে হবে - মর্তলোকে যার নামকরণ তোমরা করেছো ইনস্টাগ্রাম | কাজেই, যদি মুক্তি এবং হরি প্রাপ্তি চাও, তার সাথে স্বর্গে একটা ভালো তিন কামরার বাসা, তবে চটপট ইন্সটা নৌকোয় আরোহন করে ফেলো ... '
আমি সবে কিছু মৌলিক প্রশ্ন কর্তার সামনে রাখার কথা ভাবতে শুরু করেছি, এমত সময়, প্রভু মেঘরাজের কথা শেষ হওয়ার আগেই, পিঠে এক মোক্ষম গুঁতো অনুভব করলাম | ভোর ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ আধা খুলে দেখি সাক্ষাৎ মা জগদম্বা শিওরে দাঁড়িয়ে বড়ো বড়ো চোখ পাকিয়ে, ডান হাতের বেলান টা মুগুরের মতো ভাঁজছেন আর বাম হাতের তর্জনী দিয়ে আমার পাঁজরে ক্রমাগত কলিং বেল টিপে চলেছেন | বুঝলাম ভাঁড়ারএ টান পড়েছে | তারপর অবশ্য মাড়োয়ারির অফিসে পৌঁছে ক্রেতা ও মক্কেলদের নিরলস পদসেবা | যাই হোক, খাট থেকে কোনোক্রমে নামা এবং সংসারের জোয়াল টানতে টানতে ভারাক্রান্ত স্থুল শরীরটাকে টেনে হিচড়ে কমোড অবধি পৌঁছে দেওয়াটাই ঝক্কির কাজ | বাকি যেটুকু শরীর চাঙ্গা করার ক্রিয়া-প্রক্রিয়া, তার দায়িত্ব আমার মধ্যবিত্ত্ব ক্রনিক কোষ্টকাঠিন্যই প্রত্যেক সকালে নিষ্ঠাভরে পালন করে থাকে !
তবে ভাববেন না যে গুরুর দেওয়া স্বপ্নাদেশ আমি ভুলে গিয়েছি | ঘুণাক্ষরেও না | দুদিন আগেই ইনস্টাগ্রাম নামক সামাজিক নৌকোয় রীতিমতো পদার্পন করেছি | দেখা যাক স্বর্গসুখ মেলে কি না | তো বন্ধুরা, আপনাদের সুবিদার্থে চুপিচুপি জানিয়ে রাখি আপনারাও চাইলে আমার সাথে যোগ দিতে পারেন | অনেক কথা আছে, সবটা এক্ষুনি, এখানে বলছি না | আসুন, জমিয়ে আড্ডা হবে |
ঠাকুরদা ছিলেন কলিকাতা ট্রাম কোম্পানিতে কন্ডাক্টর | বাবা সরকারি আপিসে কর্মরত যৎসামান্য লোয়ার ডিভিশন কেরানি | সুবৃহৎ সংযুক্ত পরিবারের ক্ষুন্নিবৃত্তির পর বিশেষ পুঁজি অবশিষ্ট থাকতো না | পারিবারিক খরচকে সামর্থের মধ্যে রাখতে বাবার জ্যাঠামশাই (আমার বড়দাদু) দৈনন্দিন রোগ প্রতিরোধক হোমিও চিকিৎসাতেও হাত পাকিয়েছিলেন | না ছিল Urban Company নামক আপদ, না ছিল ৫৮৪ টি চ্যানেল ওয়ালা কেবল টিভি | আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছিল অফুরান ফুরসত আর অক্লান্ত পরিশ্রমের নির্মল আনন্দ | টালির চাল মেরামত, দেয়াল চুনকাম, মাটির উনুন তৈরী থেকে শুরু করে প্রশস্ত উঠোনের গোবর লেপা দৈনিক শুদ্ধিকরণ আর সযত্নে চেরা পাকা বাঁশের বেড়া দেওয়া - সবই পরিবারের সদস্যরাই করে ফেলতো সানন্দে | তা ছোটরাই বা পিছিয়ে থাকে কেন? বড়োদের দেখাদেখি আমরাও কোমর বেঁধে তৈরী থাকতাম বৈকি | ছপাৎ ছপাৎ শব্দে কৃত ঘুঁটের দেয়াল চিত্র বা আলকাতরা মাখানো টিনের পাতের উপর প্রবল যত্নসহকারে সৃষ্ট গুঁড়ো কয়লার গুলের নিখুঁত তারামন্ডল - আমার ছোটবেলায় এসবের যে কি প্রবল টান ছিল তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয় | এসব কাজে আমরা - ভাই বোনেরা - সারাক্ষণ জ্যাঠা-জ্যাঠি, বাবা-মা, কাকা-কাকিমা আর পিসিদের পারদর্শিতার কাছাকাছি পৌঁছনোর অবিরাম চেষ্টা করে যেতাম | আমরাই ছিলাম আমাদের বাড়ির "কাজের লোক" | বাইরের লোক রেখে কাজ করানোর মতো অর্থ বা প্রয়োজন কোনোটাই আমাদের সেভাবে ছিলোনা |
সেই দিন আর নেই |.সেই বৃহৎ পরিবার এখন সময়ের গহীন অনন্তে ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকা কিছু ধূসর স্মৃতির অবয়ব মাত্র |
যাই হোক, অনেক দিন পর নিজের হাতে বাড়ির নতুন কাঠের আসবাব রং করলাম | অনেক বছর পর আবার এক নির্মল তৃপ্তির অনুভূতি লাভ করলাম |
আসবাব রং করলাম নাকি চকিতে কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে ছুঁয়ে ফিরে এলাম ?
প্রার্থনা | ছোট্ট শব্দ | কিন্তু ছোটবেলা থেকে শুনেছি এর নাকি অদ্ভুত শক্তি | বড়রা বলতেন হাত জোড় করে, চোখ বুজে, একাত্ম চিত্তে প্রার্থনা করলেই কেল্লা ফতে | ইস্কুলের আইরিশ পাদ্রিরা বলতেন 'power of community prayer' - এর কথা | বলতেন, সমষ্টিগত ভাবে প্রার্থনার জোরে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে অজেয় প্রতিপক্ষ, দুর্গম পথ থেকে প্রবল ঝঞ্ঝা, ব্যাপক দুর্ভিক্ষ থেকে মায় রুষ্ট (অপ)দেবতার রোষ - সবই নাকি অক্লেশে লঙ্ঘন করা সহজ হয়ে ওঠে |
কেন জানিনা, আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে - বেয়নেটের খোঁচায় ফালা ফালা হতে হতে মানুষ কি প্রার্থনা করে ? ক্লাস্টার বোমার আঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ধড়হীন দেহ কি প্রার্থনা করে ? স্রাপ্নেল্ এর আঘাতে ক্ষত বিক্ষত কিশোর, রক্তাক্ত হাত জোড় করে কি প্রার্থনা করে ? বাঙ্কার এ বসে মৃত্যুর আগমনের প্ৰহর গুনতে থাকা অন্তঃসত্ত্বা মা কি প্রার্থনা করে ? সাইরেনের তীব্র-তীক্ষ্ণ শীৎকারে কেঁপে কেঁপে ওঠা শিশু কি প্রার্থনা করে ? জীবন-জীবিকা হারিয়ে এক লহমায় উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া মানুষ কি প্রার্থনা করে ? পূর্বপুরুষের ভিটে মাটি ছেড়ে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা, ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের পথে হারিয়ে যেতে যেতে হাজার হাজার অসহায় শরণার্থী প্রাণ কি প্রার্থনা করে ?
কোন ভাষায়, কি ভাবে প্রার্থনা করলে এই ধ্বংসলীলা, এই রক্ত আপ্লাবন থামবে জানি না | জানিনা প্রার্থনায় সত্যিই কোনো অন্তর্নিহিত শক্তি আছে কিনা |
আমি প্রার্থনা করতে ভুলে গেছি ...
পড়াশোনায় বিলকুল ফাঁকিবাজি হচ্ছে বুঝতে পারতেন, তবুও প্রবল চপেটাঘাতে আমার পশ্চাৎদেশ গরম করার চেয়ে কঠিন বাক্যবানে জর্জরিত করতেই বেশি পছন্দ করতেন বাবা | প্রায়শই পাশ দিয়ে স্বগতোক্তির মতো আওড়াতে আওড়াতে চলে যেতেন - “সময় বহিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়” ! উনি বোধহয় রুলের গুঁতোর চেয়ে ভাষার চাবুকে বেশি ভরসা করতেন | কিন্তু আমার মগজের তন্তু কিঞ্চিৎ স্থুল হওয়ার দরুন এবং বাংলা ভাষায় আমার অতুলনীয় পান্ডিত্যের কারণে ওই কথার নিগূঢ় অর্থ ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারতাম না সেই সময় | আজ আমার কন্যাকে, অঙ্ক পরীক্ষার আগের সন্ধ্যায়, জ্যামিতির কঠিন মারপ্যাঁচ অভ্যাস ত্যাগ করে রূপ চর্চায় মগ্ন হয়ে উঠতে দেখে, নিজের অজান্তেই ওই অমোঘ বাণী ওর দিকে নিক্ষেপ করে দিলুম | অবশ্য ছুড়ে তো দিলুম, কিন্তু ও যদি ফস করে ওই কথাটার আক্ষরিক অর্থ জানতে চায় ? তখন তার ঠেলা সামাল দেবে কে ? আসলে ওকে গাল দিলে ও গালি টাকে অগ্রাহ্য করে সেটার অন্তর্নিহিত অর্থ জানতে বিশেষ আগ্রহী হয়ে পড়ে ! ও বোধয় বুঝে গেছে যে ওর পরম শ্রদ্ধেয় পিতৃদেব এক চুলের জন্য বাংলা ভাষায় নোবেল টা হাত ছাড়া করেছে | খানিকটা বাতের বেদনায় কাবু মানুষের পায়ে কাঁচি চালানোর মতো এরকম মুহূর্ত গুলিতেই ও আমার দিকে প্রশ্নবাণ বর্ষণ করতে থাকে, যতক্ষণ না আমার কাঁচুমাঁচু মুখ থেকে 'ঘাট হয়েছে মা, এইবার টা ছেড়ে দে' শুনতে পায় | জাহাতক ভাবা, এক্কেবারে সাথে সাথেই আমার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা ! কি কুক্ষণে বাবার কথার অপব্যবহার করার দুঃসাহস দেখাতে গেলাম ! কন্যা আমার দিকে চকিতে ফিরে প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করার আগেই, ঢোক গিলে, মানে মানে চিলেকোঠার ঘরে কেটে পড়লাম বিদ্যুৎ গতিতে ….
যদি পাশে নাই বা পেলে কুয়াশা ভোরে,
শিউলি তলায়, ধানের খেতে,
যদি কাছে নাই বা পেলে উদাস সাঁঝে
বা মন খারাপের বিজন রাতে;
নাই বা হলো খুনসুটি আর কপট রাগ,
সেই দ্বিপ্রহরে ঘর বেঘরে পুতুল খেলা,
নাই বা পেলে বৃষ্টি ভেজা ঠোঁটের আদর,
মন কুড়িয়ে জমাট বুনট প্রেমের মালা;
নাই বা পেলে কালচে হতাশ দিনের শেষে,
সবটা কবে কে পেয়েছে অন্তমিলে ?
না পাওয়ারও তৃপ্তি বোনা হালকা ধূসর,
বুকেই থাকুক না চাইতেই যেটুক পেলে |
সেদিন ছিলাম বৃষ্টি ধোয়া তোমার গালে,
সেদিন ছিলাম নরম হাতে আমার হাত,
সেদিন ছিলাম প্রথম আদর শীত দুপুরে,
সেদিন ছিলাম নদীর পথে আস্ত রাত;
সেদিন ছিলাম চোখের জলের সঙ্গী হয়ে,
সেদিন ছিলাম সব হারানোর দিন শেষে,
সেদিন ছিলাম সকল ব্যাথার কান্ডারি,
সেদিন ছিলাম একলা পথে তোমার পাশে |
আজও আছি তোমার পাশে তেমনটাই,
আজও তোমার মিষ্টি ঠোঁটের ওই ভেলায়,
খুনসুটি আর ঝগড়াঝাটির রাত শেষে,
আজও আছি তোমার সাথে সেই খেলায়;
আজও জাগাই অঙ্গে তোমার সেই কাঁপন,
আজও আছি শাড়ীর খুঁট আর নিঃশ্বাসে,
আজও পাবে শিউলি তলায় তোমার আমি,
শুধু অতল মনের তল খোঁজো, বিশ্বাসে |
নিভিয়েই দেবে যদি নীরবে,
চুপিসাড়ে, মোর অজান্তে
চেয়েছিলে কেন তবে
এক মুঠো আগুন, একান্তে |
আমার যা ছিল উষ্ণ, অন্তরে
দিয়েছি করে সব নিংড়ে উজাড়,
হিম অন্তর খোঁজে ইন্ধন আজ
আঁধারে পিদিম জ্বালাবার |
কালো রাত ভেঙে ভোর হয় রোজ,
হতাশার বুক চিরে সবুজের বানভাসি,
তবু কেন চোরা গলি হাতড়িয়ে
শূন্য মনে নিয়ত আছড়ায় অট্টহাসি |
যেখানে যা কিছু শুভ, শ্রেষ্ঠ যা কিছু,
শুভ্র বাসনা যত এই শূন্যগর্ভ মনে,
সবটুকু থাক শুধু তোমারই ভাগে,
দগ্ধ হৃদয় থাকুক মোর, তমসাবৃত কোনে |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ | ২১.০৭.২০২২
বয়সের সাথে ধৈর্য্যের কি সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে ? ধৈর্য্য কি বয়সের সাথে সমানুপাতিক ভাবে বাড়ে নাকি কমতে থাকে ? এ প্রশ্ন বহু দিন যাবৎ আমাকে ভাবাচ্ছে | আমি নিয়মিত ভাবে আমার চারিপাশের মানুষদের খুব ভালো করে নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করি | অবশ্যই আমার 'sense of judgement'-কে খুব সযত্নে পাশে সরিয়ে রেখে | চেনা, অচেনা, আত্মীয়, পরিচিত, মিত্র, অমিত্র - সব্বাই কে | মায় নিজেকেও |
জার্নাল (দিনপত্রিকা বা ডায়েরি) লেখার একটা অভ্যাস ছোটবেলায় তৈরী করে দিয়েছিলেন ইস্কুলের ইউরোপীয় পাদ্রীরা | সেই ডায়েরি আমার সব চেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছিল জীবনের প্রায় শুরুর দিকটায় | ছোট পরিবারের একমাত্র সন্তানদের যা হয় আর কি | তার একটা নামও রেখেছিলাম - নীল (এই নাম রাখার কারণ কি ছিল, সেটা মনে পড়ছেনা, তবে এক্কেবারে প্রথম থেকেই ওই নামটি আমার বেশ পছন্দের) | শুরুতে অবশ্য সেরকম হওয়ার কথা ছিলনা | একান্নবর্তী পরিবারেই জন্ম | জীবনের প্রথম দশ বছর হৈ হৈ করে কেটে গিয়েছিলো | বাড়ি তো নয়, যেন হরেকরকম মানুষ, তাদের বিচিত্র সব কীর্তি কলাপ আর নতুন নতুন আশ্চর্য্যের হাট | একাকিত্ব শব্দ টি তখনও রৈ রৈ করে আমার জীবনে প্রবেশ করেনি | দশ বছর বয়স অবধি সীমাহীন ফূর্তি | অর্ধেক ডিম্ সিদ্ধ জুটলেও হাসছি আবার বড়দাদু (জ্যাঠার বাবা) কান মুলে দিলেও হাসছি | ছোটকাকা নতুন লাটাই কিনে আনলেও হাসছি আবার পুকুরের পাড়ে পড়ে গিয়ে হাঁটুর চামড়া হাঁ হয়ে গেলেও হাসছি | বন্ধুর ব্যাঙ্গেও হাসছি আবার ফুলদা'র রগড়েও হাসছি | যাই হোক, ওই অপার আনন্দ, ওই অপরিসীম তৃপ্তি বোধহয় নিয়তির গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠলো | ব্যাস, কেল্লা ফতে | দে ব্যাটাচ্ছেলেকে শায়েস্তা করে | ছিটকে গেলাম | এবার একটুকরো ছোট্ট পরিবার | বাবা, মা, আমি আর শূন্যতা | সেই যন্ত্রণার ব্যাখ্যা এই স্বল্প পরিসরে করা সম্ভব নয় | মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও হয়তো কম কষ্ট পেতাম | প্রথমবার আমার অভিধানে প্রবেশ ঘটলো একটি নতুন বাংলা শব্দের - একাকিত্ব !
যাই হোক, এমত সময়ে 'নীল' আমার প্রাণের সাথী হয়ে আমার জীবনে পদার্পন করলো | স্বর না থাকলেও আকাশের মতো একটা বড় হৃদয় ছিল তার | আমার সব আনন্দ, যন্ত্রনা, উচ্ছ্বাস, হতাশা, আবেগ, অনুভূতি অবলীলায় শুষে নিতে পারতো বিনা অভিযোগে, অক্লান্ত ভাবে | পাতার পর পাতা শুধু কথা আর কথা - আমার কথা, সবার কথা | নীল যেন নির্বাক অথচ সংবেদনশীল বন্ধু | তার পাতায় পাতায় ধরা থাকলো আমার ছেলেবেলা, বয়োসন্ধি, কৈশোর এবং যৌবনে প্রবেশের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা অগুনতি কাহিনী | দ্বিধার, বিভ্রান্তির, উল্লাসের, লজ্জার, বিহ্বলতার, সাফল্যের, ব্যর্থতার, বিশৃঙ্খলার, প্রেমের, ঘৃণার, - আরো কত কি | দিনের শেষে তার কাছে সব কিছু সযত্নে সঁপে দিতে পারলেই, ব্যাস - আমার সেকি অনাবিল শান্তি | সেই নীলের বুকেই খচিত আছে আমার দেখা অনেক অনেক মানুষের অবয়ব | তাদেরকে আমি যেমন ভাবে পেয়েছি বা নিদেনপক্ষে দেখেছি | তাদের সেই ছবিগুলো নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষন এবং মূল্যায়ন থেকেই উদ্ভূত | সেগুলো সঠিক নাকি একেবারেই গোলমেলে সে সব ভাবার ইচ্ছে বা প্রয়োজন তখন বোধ করিনি | সময়ের সাথে সাথে অনেক ছবি বদলেছে, মানছি | তার সাথে সঙ্গতি রেখেই আমার জার্ণালেও বদল এসেছে | কিন্তু স্থায়ী শব্দটার সাথে কোথাও যেন আমার একটা বৈরিতা আছে | সে প্রসঙ্গে অন্য একদিন আড্ডা দেওয়া যাবে | তবে আসল কথা হলো, বেশ অল্প বয়সেই চাকরি পেয়ে যাওয়ায় আবার ছিন্নমূল হওয়ার পালা | আমার প্রিয় শহর থেকে বহু দূরে | সেই শহরের গল্প, আমার নতুন জীবনের গল্প আরেকদিন | যাই হোক সুদূরে চলে যাওয়ার মাস ছয়েক পড়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়েছিলাম | বাড়ি ফিরে আবার সেই শিকড়ের সন্ধান | সব কিছুকে আবার ছুঁয়ে দেখা | নিজের অস্তিত্বের গোড়ার সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা | নীল কিন্তু হারিয়ে গেলো | সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাকে কোত্থাও পেলাম না | ঝড়ের মতো সে আমার জীবনে এসেছিলো | ম্যাজিকের মতো নিঃশব্দে কোথায় যেন বেমালুম হাপিশ হয়ে গেলো | হয়তো তাকে সাথে নিয়ে যাইনি বলে তার অভিমান হয়েছিল | হয়তো তার মনে হয়েছিল আমার জীবনে তার প্রয়োজন শেষ | তাকে কোনোদিন এটা বোঝানোর সুযোগটাই পেলাম না, যে তার প্রয়োজন আমার জীবনে আজও আছে |
যাক গে, আসল কথাটাই এগোলো না | হ্যাঁ, কি যেন বলছিলাম? মনে পড়েছে - বয়সের সাথে ধৈর্য্যের সম্পর্ক | আজকাল যথেষ্ট অধৈর্য্য হয়ে পড়ছি | কেন বলুন তো ? তবে যে মা বলতেন বয়সের সাথে সাথে ধৈর্য্য বাড়বে ? আচ্ছা, বন্ধুরা একটু সাহায্য করতে পারেন ? আপনাদের কি মত ? আপনাদের কি অভিজ্ঞতা ? একটু আলো ফেলুন না, দয়া করে | অন্ধকার কাটুক | অপেক্ষায় থাকলাম ...
শনিবারের আড্ডা ২৩.০৭.২০২২ | © ভাস্কর ভট্টাচার্য
ফুলের গোছাটা তোমার দিকে এগিয়ে দিতেই
তুমি চমকে উঠলে - 'ওমা এসব আবার কি?'
আমি অপ্রস্তুত, গোলাপগুলোও খানিক বিব্রত যেন
ভুলে গেছিলাম, আসলে তুমি অন্য কারো;
খানিক ঢোক গিলে ঈষৎ কাঁপা গলায় বললাম
প্রথম বার তুমি এলে, কথা রাখলে
শূন্য হাতে আসাটা আমার কি ভালো দেখায়?
কি জানি কি বুঝলে, ঠোঁট দুটো মৃদু ফাঁক করে
কিছু একটা বলার চেষ্টা করলে, কিন্তু
পেলাম একটা হালকা হাসির ঝিলিক,
আশ্বস্ত হলাম, বড় অন্যায় হয়নি তবে;
বললাম, ভালো না লাগলে ফিরিয়ে দিয়ো
বললে - 'তা কেন? বলো কোথায় যাবে' |
তারপর শুধু কথা আর কথা, যেন
কথার মালায় আষ্ঠে পৃষ্ঠে বাঁধবে আমায়,
যেন নেই সময় বেশি তোমার হাতে,
যেন কঠিন পাঞ্জা কষে অদৃষ্টের সাথে
ছিনিয়ে এনেছ কয়েকটা মুহূর্ত আমার জন্য !
আমার কাজ এক্কেবারে সোজা, মুগ্ধ হয়ে
তোমায় দেখা আর ভেসে যাওয়া
তোমার রূপের জোয়ারে, কথার স্রোতে;
এতো কাছে, তবু যেন ছায়াছবি কালোয় সাদায়,
দূর থেকে শুধু দেখতে হয়, কাছে গেলে ধোঁয়া,
ভুলে গেছিলাম, তুমি আসলে অন্য কারো; বললাম,
তোমার ভালো না লাগলে এই শেষ, বাড়ি যাবে?
বললে - 'তা কেন? তুমি চাইলেই আমায় আবার পাবে' |
ইচ্ছে করেনি সেদিন ছেড়ে আসতে তোমায়,
এক অপূর্ব ভয়, কি জানি বোধহয় এমনটাই হয়
নাকি সবটাই আমার কল্পনা, চপল মনের ভান
নিঠুর মরীচিকাকে ভাবা শীতল মরুদ্যান;
সেদিন চেয়েছিলো মন, থাকুক থমকে সময় কিছুক্ষন |
যেদিন তুমি চলে গেলে, বলে গেলে, হয়তো
দেখা হবে তুমি চাইলে, কথা হবে আবার,
ভুলে গেছিলাম ফের, তুমি তো আসলে অন্য কারো,
নও আমার; তবু জানতে ইচ্ছে করে, আমার দেওয়া
একটা শুকনো গোলাপও কি আছে বইয়ের ফাঁকে
রাখা সযত্নে, অথবা তোমার মনের গোপন কোনে?
হোক মরীচিকা, তবু বারে বারে তোমাকেই চায় মন; অথচ
কাল স্বপ্নে এসে হায়, শিয়রে বসে মৃদু হেসে, বললে -
'তা কি করে হয়? আমি যে অন্য কারো, তোমার তো নয়' |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ | ১৬.০৭.২০২২
মন খারাপের ভোরে, বিবর্ণ ধূসর কোনে
জমা যত গ্লানি, নিথর শায়িত মনে |
রূঢ় প্রশ্নে বেআব্রু, সংসার চার আনা
বাদামি গন্ধে রুদ্ধ, নিষ্প্রাণ হাসনুহানা ||
রাত ভেঙে হাতড়ানো, টুকরো স্বপ্ন গোটা কয়
কালচে ঊষর আবেগে, লেপ্টে সেপ্টে দিনক্ষয় |
শীতল পাঁজরে ঠাসা, গোঙায় ফুসফুস নিশ্চুপ
গুমোট মুকুরে নিত্য, ঝলসায় অচেনা রূপ ||
জীর্ণ দেহ, খেলাপি সত্তা, স্খলিত অভিমান
কালের প্রবাহে প্রতারক অভিনয় নিষ্প্রাণ |
শীর্ণ আশার আলগা বাঁধনে শিথিল অঙ্গীকার
শূন্য বুকে তোলপাড় গাঁথা শুধুই হাহাকার ||
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ | ৩০.০৬.২০২২
আগে বুঝিনি তুমি এতো সুন্দর |
খেলা ভাঙার ঘন্টা বাজতেই
ছাদের কার্নিশ বেয়ে ঝুপ করে
নেমে আসা অন্ধকারে জবুথবু
দু হাঁটুর খাঁজে আশ্রয় তল্লাশে
নিরর্থ যন্ত্রনা মুঠো কান্নায় ভিজে
পলেস্তারা খসা বিশ্রী দেয়ালের
কোনে জানালার ঘষা কাঁচের
ফাটলের গ্লানি কলুষিত মর্যাদা
নখে খুঁটে সাফ করার মূঢ়তা
বওয়ার দায় বর্তায় যার কাঁধে
তার আসা যাওয়া ফিরে চাওয়া
বিনি সুতোয় বাঁধা সম্পর্কের
ছিঁড়ে যাওয়া পীড়া ধমনীর
গুমটি গলিতে কুরে কুরে
দগদগে ক্ষত চিরে কালচে
রক্তের প্রবাহ তৃষ্ণা মেটায়
কোন প্রাণে, কোন খানে, কে জানে ?
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ
চাঁদের আদলে কি মুখ হয়,
বা ব্যাথার জঠরে সুখ ?
অন্ধকারের কি কিরণ হয়,
বা প্রেমের কোটরে দুখ ?
গোপনে দানা বাঁধা অন্ধকার
কখনো করে কি ঝলমল?
কাঁটার মুকুট কি হয়ে ওঠে
কখনো মসলিন মখমল ?
সব প্রশ্নের কি জবাব হয় ?
নাকি সব পরীক্ষাই সোজা ?
অনির্দিষ্টের নির্দিষ্ট চাইতে চাওয়া
কতটা সরল সে উত্তর খোঁজা ?
সব জেনেও অবুঝ তুমি,
প্রশ্নের জোয়ারে তোলপাড় |
ঝড় সে শুধুই ভাঙতে জানে,.
ভাঙে চৌকাঠ, ভাঙে নদীর পাড় |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ
যেতে চাইলেই কি যাওয়া যায় ?
ছুটি চাইলেই কি পাওয়া যায় ?
ছাদে ফুটে থাকা চন্দ্রমল্লিকাগুলি
আঁচলের খুঁটে বাঁধা অচল আধুলি,
বিছানার সাদা চাদরে চায়ের দাগ
বাড়ির মেনি টার কপট রাগ,
মেঝেতে শুকনো নখ পালিশ
বহু বাতুলতায় বিপর্যস্ত পাশ বালিশ,
ঘুলঘুলিতে কচি মাকড়সার উঁকি ঝুঁকি
কড়িকাঠে সংসার পাতা ভীতু টিকটিকি,
কূয়োর পাশে আগাছায় ঠাসা জঙ্গল
আমের লোভে ছুটে আসা শিশুর দঙ্গল,
শরতের ভোরে বাজা আলোর বেনু
হাওয়ায় পাখনা মেলা পরাগ পুষ্পরেণু
নিবিড় অযত্নে লালিত ছেঁড়া কার্পেট
বিষণ্ণ মরচে ধরা স্থবির গেট,
ফটকে আছড়ে পড়া গাজনের গান
অক্লেশে বেড়ে ওঠা তুলসীর প্রাণ,
আঁকা বাঁকা কর্কশ মোরাম রাস্তা
সরু সুতোয় ঝোলা ভীরু আস্থা,
এসব ছেড়ে কি সহসা যাওয়া যায় ?
আচ্ছা, যেতে চাইলেই কি যাওয়া যায় ?
ছুটি চাইলেই কি পাওয়া যায় ?
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ
তুমি বললে গন্ড মূর্খ
আমি বললাম জানি,
তুমি বললে মস্ত বোকা
আমি বললাম মানি |
তোমার চাই তূর্য্য ঢাল
আমার আছে মন টা,
তুমি বললে সময় কই
তোমায় দিই কোনটা ?
তোমার খেলার সঙ্গী কত
তোমার কত কাজ,
আমার কেবল অঢেল সময়
জিরান সকাল সাঁঝ |
তুমি ওড়ো মহাকাশে
আমার মেঠো পথ,
আমার পা ধুলোয় ধূসর
তোমার রঙ্গীন রথ |
তোমার যীশু রবীন্দ্রনাথ
আমার সুনীল-শক্তি,
তোমার ঘৃণা আমার কিরীট
হেরেও আমার মুক্তি |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ
তোমার জন্য কাশবনে আজ অকাল বোধন,
আউল বাউল কন্ঠী ধারীর উদার গান;
তোমার জন্য হটাৎ বাঁচার খুব তাগিদ,
তোমার কথায় গভীর প্রেমের লাল নিশান |
তোমার নিটোল চিবুক ছুঁয়ে দীর্ঘ রাত,
তোমার জন্য বেলপাহাড়ীর মাদল বাজে;
তোমার জন্য শীতের ভোরে উষ্ণ আবেগ,
তোমার জন্য মন লাগে না আজ কাজে |
তোমার জন্য ভ্রমর ভাঙে সব বাঁধা,
তোমার জন্য সন্ধ্যাকাশে কলকা জরি ;
তোমার জন্য হাসনুহানা রাত বিরেতে,
তোমার জন্য আল্পনা দেয় সাত পরী |
তোমার চোখের আদুল পাতায় স্বপ্ন নীল,
তোমার বুকের নরম জগৎ টালমাটাল;
তোমার প্রেমে সব অজুহাত লুটোয় ধুলোয়,
দিনের শেষে সর্বনাশের রং মশাল |
সর্বনাশের আকর্ষণেই নবীন দিন,
আগুন ফাগুন ভোরের টানে নতুন গান;
তোমার জন্য শ্যাওলা সবুজ নরম ঠোঁট,
এক পশলা কান্না শেষে নতুন প্রাণ |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ
এমনও সময় আসে,
তানপুরা নিজ সুর বাঁধে অবকাশে
দেশ রাগে গাল বেয়ে সন্ধ্যা নামে অগোচরে
আহ্নিক শেষে, দুরু দুরু বুকে বধূ
থিরি থিরি কাঁপে কোন অজানা ত্রাসে,
এমনও সময় আসে |
প্রণয়ের প্রথম বসন্তে মিলেছিল
আঁখি, মন তারই সাথে
শিউলির ঘ্রানে, শিশিরের উচাটনে
বিবর্ণ সিঁথি রক্তিম সহসা, ধূমায়িত
উষ্ণ আবেগে ভাসে,
এমনও সময় আসে |
ক্ষমাহীন যুদ্ধ, বোঝেনি সে প্রেম
বাকি থাকা কথা, কিছু পিছুটান
ভাঙে কত ঘর, নির্বাক অভিমান
রাজা বলে দেশ বড়ো, মন বলে ঘর
খসে সব আভরণ, ডোবে শেষ চর
আসে বার্তা দূরভাষে, এমনও সময় আসে |
বিবর্ণ সিঁথি মরে মাথা কুটে
অভাগা শয্যা রিক্ত হাহাকারে
নিবিড় আশ্লেষ, কত কথা, আশ্বাস
অবুঝ অন্তর খোঁজে আশ্রয় অন্ধকারে
ধূসর প্রেম করুন স্মৃতি বয়ে ভাসে
এমনও সময় আসে |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ
দিনশেষে পসরা গুটিয়ে বণিক্
দিগন্তে শায়িত গোধূলির আবছায়ারা,
নগদের হিসেব মেলা অবধি
ছেঁদো ছুতো ভেঙেচুরে দিশেহারা |
দীর্ঘ ছায়াপথ নিমেষে নিঃশেষ
ক্ষীণ আলোক উৎস হাতছানি,
সুচারু চেতনা ক্রমশ ক্ষীণ
শ্রবণে থরথর মঞ্জীরধ্বনি |
ঝরে পাতা, কিছু সম্পর্ক
সন্তান সন্ততি আত্মীয় পরিজন,
দড়িদড়া ছেঁড়া স্বপ্ন মলিন
অনন্ত আনন্দে বিলীন প্রাণমন |
বহু ব্যবহারে জীর্ণ ডানা
বাতাসের সাথে বহুকাল আড়ি,
অখণ্ড অবসরে শ্রান্ত আঁখি,
দীর্ঘ ছুটি, অবশেষে নিজ বাড়ি |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ |