মহাভারতে, সুতপুত্র দানবীর কর্ণ একবার শ্রী কৃষ্ণকে প্রশ্ন করেছিলেন -
"হে দেবকী নন্দন, আমার নিজের মা আমাকে আমার জন্মের মুহূর্তে পরিত্যাগ করেছিলেন - এই ধরণীতে আমার প্রবেশ একজন অবৈধ সন্তান হিসেবে হয়েছিল, এটা কি আমার অপরাধ ?
"মহাগুরু দ্রোণাচার্য আমাকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন, যেহেতু আমি আমার ক্ষত্রিয় পরিচয়ের প্রমান দিতে পারিনি |
"পরশুরাম আমাকে দুর্দান্ত প্রশিক্ষণ দিলেন বটে, কিন্তু যখন জানতে পারলেন যে আমি কুন্তী পুত্র এবং একজন ক্ষত্রিয়, তখন তিনি আমাকে মারাত্মক অভিসম্পাত দিলেন | বললেন আমার পরিচিতি হবে মহা পরাক্রমী বলেই | কিন্তু চূড়ান্ত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও, অত্যন্ত্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সংকটপূর্ণ মুহূর্তে আমার স্মৃতি বিলোপ ঘটবে এবং ওনার কাছে পাওয়া শিক্ষার প্রয়োগ করতে আমি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবো |
"এক ব্রাহ্মণের গাভীকে ভুল বশত তীর বিদ্ধ করে, অকারণে তার অধিকারীর অভিশাপ কুড়িয়েছি |
"দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে যে চূড়ান্ত অপমানিত হয়েছি. তাও তোমার অজানা নয়|
"এমনকি, মাতা কুন্তীও আমাকে চরম সত্যটা বর্ণন করলেন খানিকটা বাধ্যই হয়েই, তার অন্য সন্তানদের আমার পরাক্রম থেকেই বাঁচানোর জন্য |
"আমার যা কিছু প্রাপ্তি, যেটুকু সম্মান, সবটাই দুর্যোধনের কৃপায়, কৌরবদের বদান্যতায় |
"সেক্ষেত্রে আমার কৌরবদের পক্ষ নেওয়াটা কেনই বা অন্যায় বা অনৈতিক বলে গণ্য করা হবে ?"
মধুসূদন জবাব দিলেন -
"কর্ণ, আমার জন্ম কিন্তু কারাগৃহে |
"আমার জন্মের আগে থেকেই মৃত্যু আমার জন্য ওঁৎ পেতে ছিল |
"আমার জন্মের রাতেই জন্মদাতা এবং জন্মদাত্রীর সাথে আমার বিচ্ছেদ ঘটে যায় |
"শৈশব থেকেই আমি তরবারি, অশ্ব, ধনুক আর তীরের আস্ফালন আর ঝনঝনানী শুনে বড়ো হয়েছি |
"হাঁটতে শেখার আগেই আমার প্রাপ্তি গোশালা, গো বিষ্ঠা, বারংবার হত্যার চক্রান্ত এবং ক্রমাগত জীবন সংশয় |
"না কোনো সেনা-সামন্ত না কোনোরকম প্রথাগত শিক্ষা | প্রতি নিয়ত শুনতে হয়েছে যে আমার কাছের মানুষদের দুঃখ, দুর্দশা এবং দুর্ভোগের কারণ আমিই |
"যখন তোমাদের মতো বীরেরা জ্ঞান, শৌর্য্য আর পরাক্রমের কল্যানে নিজ নিজ গুরুর কাছে বাহবা এবং প্রজাদের সম্ভ্রম ও আনুগত্য কুড়োচ্ছ, আমি তখন একজন উদাসীন অশিক্ষিত বালক হিসেবে এক কোনে বেড়ে উঠছি | ষোলো বৎসর বয়সে প্রথম ঋষি সন্দীপনীর গুরুকুলে স্থান পেলাম | ততদিনে তোমাদের খ্যাতির ছটায় সমগ্র ধরাতল আলোকিত |
"তুমি তোমার প্রিয়তমার পাণিপ্রার্থী হয়েছো, বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছো | আমি কিন্তু আমার ভালোবাসার মানুষটিকে পাইনি | বরঞ্চ তাদের সাথেই আমার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে যারা হয় আমাকে চেয়েছে বা যাদের আমি দৈত্য-পিশাচদের অত্যাচার থেকে বাঁচিয়েছি |
"ক্রূর ও নিষ্ঠুর জরাসন্ধের হাত থেকে বাঁচাতে এবং সকলের শুভ স্বার্থে আমি আমার সম্পূর্ণ সম্প্রদায়কে যমুনার তীর থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে সুদূর সমদ্রু উপকূলে প্রতিস্থাপন করতে বাধ্য হয়েছি | অথচ, যাদের রক্ষার স্বার্থে এই কর্ম, তারা কিন্তু আমাকে ভুল বুঝেছে - ভীরু এবং কাপুরুষ হিসেবে দোষারোপ করেছে |
"দুর্যোধন জয়ী হলে বহু কৃতিত্ব জুটবে তোমার ভাগ্যে | তা হওয়াই স্বাভাবিক এবং উচিত | কিন্তু যদি ধর্মরাজ জয়ী হন ? আমার কপালে তো তখন শুধুই নিন্দা আর দোষারোপ - এই বিরাট যুদ্ধের স্রস্টা আর ধ্বংসের রচয়িতা বলে |
"একটা কথা মনে রেখো কৌন্তেয়, সমস্যা আর যন্ত্রনা সকলের জীবনেই থাকে |
"কারো জীবন চিরকাল ন্যায্য, সহজ বা সরল নয় |
"তবে বিবেকের কাছে ন্যায় আর অন্যায় সর্বদা স্পষ্ট |
"যতবার অন্যায় হয়েছে, যতবার অসত্যের মুখোমুখি হয়েছি, অপদস্থ হয়েছি, নিন্দিত হয়েছি, লাঞ্ছিত হয়েছি, ধরায় পতিত হয়েছি - সেই মুহূর্তে কিভাবে প্রতিক্রিয়া দিতে চেয়েছি এবং পেরেছি, সেটাই পরম সত্য |
"জীবনের অনায্যতা, অযৌক্তিকতা কখনোই অনৈতিক পথে হাঁটার কারণ হতে পারেনা |"
শুক্রবারের আড্ডা 2022 | ©ভাস্কর ভট্টাচার্য
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
অসংখ্য ধন্যবাদ বন্ধু | আপনার ভালোবাসা আর পৃষ্ঠপোষকতা আমার উর্জা, আমার প্রধান পাথেয় | পাশে থাকুন, এই প্রার্থনা রইলো | অনেক ভালোবাসা থাকলো, আপনার জন্য | নমস্কার |