আমার একটা পাহাড় কেনার খুব শখ,
সেই কবে থেকেই; একবার
আমার ভয়ঙ্কর আবদার, ছেলেবেলায়
কি জানি কি ভেবে, ছোটকাকা
মুচকি হেঁসে, গাল টিপে দিয়ে বললে, বেশ !
সে না হয় হবে খন, কিন্তু
অত বড় পাহাড়টাকে রাখবি কোথায়?
বললাম, কেন, কয়লা-ভাঙা ঘরের কোণে?
ঝাঁট দিয়ে, বিচুলি পেতে, ঠিক সাজিয়ে নেবো
পাহাড় ময়লা হবে না, কথা দিচ্ছি।
আচ্ছা শুনি, তোর কেমন পাহাড় চাই,
প্রশ্রয়ে যার পর নাই খুশি, বললাম
আমি বিড়াল ভয় পাই, আমার
পাহাড়ে যেন বিড়াল না থাকে একটাও;
বাঘ থাকুক, সাথে উঠোনের চড়ুইগুলোও।
দিদুন বলে পাহাড়ের গায়ে নাকি শ্যাওলা ধরে
আমাদের কলতলার ভিজে শ্যাওলার মতো,
তুলতুলে, কালচে সবুজ শ্যাওলা আমার খুব প্রিয়;
নারকেল মালা ঘষে যখন শ্যাওলা ওঠায় জ্যেঠি,
খুব কষ্ট হয়, আমার টিনের বাক্সে
কাঁচিয়ে-বাঁচিয়ে শ্যাওলা রাখি খানিক।
শ্যাওলা মোড়া পাহাড়ী ঝর্ণায়, আমার স্নান
যখন খুশি, বাবার চোখ রাঙানি
নেই, 'কি রে আর কতক্ষন জল ঘাটবি'?
পুবের বাগানটার মতো গিজগিজ, সবুজ
পাহাড়ের কোলে কানামাছি, ভোঁ ভোঁ।
রাতে নাকি চাঁদ নামে পাহাড়ে, সাথে
বেমানান কালো দাগগুলো, আমার মায়ের
গায়েও দেখেছি ওরকম দাগ, চুপচাপ।
আমার পাহাড় হবে সুন্দরী, ছোটোপিসির চাইতেও,
ইয়া বড় সূর্যের টিপ আর মেঘের নোলক পরে
আমাকে কোলে নেবে ছোটোপিসির মতো, আমি
পাহাড়ের গা ঘেঁষে উড়বো, ডানা ঝাপটিয়ে।
ছেলেরা নাকি পুতুল খেলেনা, সাজিয়ে রাখবো
রান্না বাটি, কাপড় চোপড়, পুতুলের ঘর, মন চাইলেই
ঝুলন সাজাবো পাহাড়ের কোনো খাঁজে।
কাঁড়ি কাঁড়ি বই থাকবে না, কঠিন প্রশ্ন, বেতের ভয়,
আমি পাহাড়ের গায়ের রোদ্দুর হবো।
আমার পাহাড় হেডস্যারের মত রুক্ষ হবে না,
পছন্দের সব ফুল গাছ সাজিয়ে, খুনসুটি দিনভর,
ফড়িং-মৌমাছিদের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা, সন্ধ্যে
নামতেই, সিঁদুর ল্যাপা মায়ের কপালের মতো আকাশ,
কিন্তু হটাৎ পেটে ব্যাথা হলে? তখন মা'কে কোথায় পাই ?
পাহাড়ে আমার একটা ফুচকাওয়ালা চাই, ঝর্ণার জলে
তেঁতুল গুলে, একটার বদলে ফাউ দেবে দুটো।
নক্ষত্রের চাঁদোয়া টাঙানো খোলা আকাশ, গুনে গুনে
একশো তারা শেষে, কপালে ঠান্ডা হাওয়ার হাত,
যেন মায়ের কোলের নিশ্চিন্তি, স্বপ্ন দেখবো সারা রাত।
ছেলেবেলায় পাহাড় দেখা হয়নি, বড়বেলার
পাহাড়গুলো ঠিক আমার পাহাড় নয়,
প্রতিবার ইতি উতি, হন্যে হয়ে খুঁজি, ছেলেবেলার
আমার সেই পাহাড়; জানি খুঁজে আমি পাবই, তাই
বেঁচে থাকুক আমার একটা পাহাড় কেনার শখ।
© ভাস্কর ভট্টাচার্য্য
শনিবার, ২৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২