সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২

অনু কবিতা - সংকলন ২

 সাহস লাগে এক আকাশ লক্ষ তারা গুনতে ,

স্পর্ধা লাগে অন্ধকারে আলোর মালা বুনতে | 

সাহস বিনে কিসের জোরে ঝড়ের সাথে লড়াই ?  

স্পর্ধা বিনে কোন সাহসে ভালোবাসার বড়াই ?


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২১.০৯.২০২২


===============================================================


বদনাম তো সেদিনই হয়েছিলাম, প্রিয়  

তোমার উঠোনে যেদিন পা রেখেছিলাম,

কখনো তোমাতে, কখনো তোমার ছায়ায় 

বেঁচে থাকার খোরাক খুঁজেছিলাম |

ওপথ সরল নয়, সুদীর্ঘ, তা কি মানিনে ?

সমান্তরালের নৈরাশা, তা কি জানিনে ?

নৈরাশ্যের পথ্য একটাই, কেবল আশা 

ভালোবাসার অজুহাত, শুধুই ভালোবাসা 

বদনাম তো সেদিনই হয়েছিলাম, তোমার 

বুকে যেদিন এক ফালি জমি খুঁজেছিলাম | 


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২৬.০৯.২০২২

শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২

খলনায়ক

অসুর | নামটি নিশ্চই শোনা ?

খুব সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-২০০০ সালে রচিত বৈদিক সাহিত্যে প্রথম 'অসুর' ধারণাটির উল্লেখ পাওয়া যায় | এক্কেবারে শুরুর দিকে পূর্ণতাপ্রাপ্ত মানব বা দিব্য ক্ষমতাসম্পন্ন বলশালী সুনায়কোচিত অগ্রনেতাকে অসুর নামে উল্লেখ করা হলেও পরবর্তী সময়ে অসুররা বৈদিক দেবতাদের বিরোধীপক্ষ হিসেবেই আখ্যাত হন | পরবর্তীকালে দেবতাদের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি আর অসুরদের স্খলন ঘটতে থাকে | সময়ের সাথে সাথে অসুরদের জন্য পরিস্থিতি এতোটাই প্রতিকূল হয়ে পড়ে যে পরিণামে শ্রুতিসাহিত্য এবং পৌরাণিক কাহিনীসমূহে অসুরদের দৈত্য, রাক্ষস, পিশাচ, ইত্যাদি নামেই বর্ণন করা হয় | অমৃতমন্থন নিয়ে অসুর-দেবতার অন্তহীন কলহ তো সর্বজনবিদিত | দারুন মজার কথা হচ্ছে যে, লভ্য তথ্য অনুযায়ী, পারস্যে (এখনকার ইরান) এই প্যাটার্নটা কিন্তু একদম বিপরীতমুখী পথে অগ্রসর হয় | সেখানে কালক্রমে অসুর'রা সর্বোচ্চ দেবতা এবং দেব'রা নিকৃষ্ট রাক্ষস হিসেবে পরিচিত হন |
লক্ষ্য করার বিষয়, রাম-রাবনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা | কেউ কেউ রামকে শ্রেষ্ঠ এবং উত্তম পুরুষ মানেন, কেউ কেউ আবার রাবন কে | এই একটি বিষয়ে কিন্তু ভারতের একাধিক প্রান্ত, সমষ্টি বা সম্প্রদায় এক্কেবারে ভিন্ন মত পোষণ করে | কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠীগুলো প্রায় আড়াআড়ি বিভক্তও হয়ে যায় | কোনটা সত্যি আর কোনটা বিকৃতি, সেটা বোঝা প্রায় অসম্ভব | কোনটা প্রকৃত এবং অকল্পিত আর কোনটা নির্মিত সত্য, সেটাও বোঝা দায় | পুরোটাই দৃষ্টিকোণ বা পরিপ্রেক্ষিতের ব্যাপার, তাই না ?
তবে একটা জিনিস বেশ বুঝি - নায়কের উদ্ভাস একমাত্র খলনায়কের উপস্থিতিতেই সম্ভব | খলনায়কের অসংযম এবং অমিতাচারেই নায়কের উত্থান সূত্র লুকিয়ে থাকে | কালোর অবর্তমানে সাদার মান থাকে না | নায়ক এবং খলনায়ক একে ওপরের 'রেফারেন্স ফ্রেম' | কে নায়ক আর কে খলনায়ক তা বিচার করা বেশ দুরূহ | তবু খলনায়ক ছাড়া নায়ক অসম্পূর্ণ, নিতান্ত পানসে | তাই মহিষাসুর হোক, রাবন হোক বা গব্বর সিং - যুগ যুগ ধরে, সযত্নে, খলনায়কের নির্মাণ ঘটে, নায়কের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে | প্রকৃত নিকৃষ্ট পুরুষ বাজারে উপলব্ধ না হলে, হাতের সামনে উপস্থিত অমুক সেরা বিকল্পকেই বেছে নিয়ে বেচারার মধ্যেই খলনায়কের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয় | হাজার হাজার বছরের পুরোনো এই রীতির বা পদ্ধতির কোনো পরিবর্তন হয়নি | এই খলনায়ক নির্মাণ করার পদ্ধতি নিয়ে না হয় অন্য একদিন গল্প করা যাবে |
তো, হটাৎ অসুর নিয়ে পড়লাম কেন ? আরে না না, সেরকম কিছু নয় - কোনো বৈপ্লবিক কিছু ভাবছি না | দুগ্গো পুজো আসছে | মনে কাশফুল ফুটছে | ছোটবেলা থেকেই অসুরকে আমার খুব আকর্ষণীয় এবং কৌতূহলোদ্দীপক লাগে | নিজের অজান্তেই দেবতাদের থেকে বেশি ছবি বোধহয় অসুরের তুলে ফেলি | এমনকি কোনো কোনো অসতর্ক মুহূর্তে অসুরকে লক্ষ্য করে হাত জোড়ও করে ফেলেছি ছোটবেলায় | মনে হয় সব দেব দেবীদের সম্বন্ধে এতো কিছু জানতে পারি, কিন্তু অসুরদের সম্বন্ধে যথেষ্ট জানি কি ? আজকাল অসুরের দিকে তাকিয়ে থাকলে "হীরক রাজার দেশে"র একটা সংলাপের অংশ মুখ থেকে প্রায় স্বগতোক্তির মতো বেরিয়ে আসে - "ভালো মন্দের বিচার করে কে ?"


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | রবিবারের আড্ডা | ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২২

রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আমি, আমার সবুজ বন্ধুরা আর অসম্পূর্ণতা

ফুলের আগুনেই কি বনানীর পূর্ণতা ? পুষ্পোদ্গম ক্ষিতিজই কি পরম পরিপূর্ণতার একমাত্র শর্ত ? যে বৃক্ষের ফুল মোটে আসেই না, বা সহজে আসতে চায়না, তাদের কি ? তাদের স্থান এবং মর্যাদা কি তলানির কাছাকাছি ? 

জন্মালে মরতেই হবে | অমোঘ সত্য | জন্মানোর সার্থকতা কি শুধুই সহজাত দক্ষতার প্রকাশ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা, জগৎ ব্যাপি পরিচিতি আর খ্যাতি, অর্থনৈতিক শ্ৰীবৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ ? যাদের এই জনমে রবীন্দ্রনাথ, রবিশঙ্কর, মেঘনাথ সাহা বা তেন্ডুলকর হয়ে ওঠা হলো না ? যে নারী মা হয়ে উঠতে পারলেন না কিম্বা হতে চাইলেন না ? যে পুরুষ অমানুষিক পরিশ্রম আর নিরলস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিবারের কাছে আদর্শপুরুষ হয়ে উঠতে পারলেন না ? যে শিশু জীবনের যাঁতাকলে পিষেও সমাজের তৈরী কাঠামো ও মান অনুযায়ী নিজেকে প্রমান করতে সক্ষম হলো না ? তাদের জীবন কি অসম্পূর্ণ ? এই ধোঁয়াটে প্রশ্নের উত্তরও অস্পষ্ট, কুয়াশাবৃত | 

সম্পূর্ণতার সংজ্ঞা আমার জানা নেই | তবে অসম্পূর্ণতার লাবণ্যও কিন্তু কম নয় | একটু ভালো করে ভেবে দেখলে, সাফল্যের তুলনায় যে অসফলতার মাধুর্য্য কোনো অংশে কম নয়, তা বেশ বোঝা যায় | কুমোরটুলিতে কাঠামোয় লেপ্টে থাকা মাটির পরিত্যক্ত প্রতিমা দেখেছেন ? কোনো মণ্ডন বা অলঙ্করণ ছাড়াই ? কোনো কারনে হয়তো সেই অসম্পূর্ণ মূর্তি প্রতিমায় রূপান্তরিত হয়নি | তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়নি | সেবা-আরাধনা-অর্চনা হয়নি | তবু সেই মূর্তি অপরূপা | আমার কাছে নৈসর্গিক এবং সম্পূর্ণ | 

সবাই মিলে কি সেই অপরূপ অসম্পূর্ণতাকেও উদযাপন করা যায় না ?  


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৭.০৯.২০২২ 

বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

জন্ম চিহ্ন

শেষ যেবার রাত ভোর বিবস্ত্র করে 

জন্ম চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করেছিলে, 

প্রতিবাদ করতেই, মানুষ চেনার

এটাই নাকি সাচ্চা উপায়, বলেছিলে |


অন্ধকারের আলোয়, থুতনির খাঁজে 

বাদামি তিলটাকে দেখে বলেছিলে,

অনুরত পুরুষের অমন তিল অশালীন 

নির্ঘাত বেহায়া চরিত্রহীন ভেবেছিলে |    


আমি যে তোমার যোগ্য, প্রমান হোক  

হয়ত তাই মনে মনে চেয়েছিলে,        

তাই বোধ হয় রাত ভোর বিবস্ত্র করে 

জন্ম চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করেছিলে |


ভোরের আলো ভাঙতেই স্যাঁতসেঁতে 

চোখের আকুতি লুকোতে চেয়েছিলে,

জানি ভালোবেসেছিলে অজান্তেই, তাই

অমন করে জন্ম চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করেছিলে |   


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৫.০৯.২০২২ 

রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২২

খেলাঘর

ভালো বাসা'র টানে নয়, হয়তো  
এসেছিলে খেলাঘরের খোঁজে |
মেঝেতে আড়াআড়ি পড়ে থাকা  
আঁচড়গুলোর সূক্ষ্ম ভাঁজে, 
তেলচিটে পড়া যে আব্দারগুলো 
ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে শেষ শ্বাস গুনছে,     
মাটিতে কান পেতে শুনছে,
সহসা কোনো বিজলীর ঝটকায়  
ভাঙা খেলাঘর যদি ফের প্রাণ প্রায়,
আবার যদি ইচ্ছে জাগে, যত্ন করে 
তোলা আছে সরঞ্জাম যত, 
জেনো, সব তোমারই মন মতো | 


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ | ০৯.০৯.২০২২

গুলজার ও আর ডি বর্মন

রাহুল দেব বর্মন সাহেবের অসংখ্য কালজয়ী কম্পোজিশন আছে যা বাংলা এবং হিন্দি উভয় ভাষাতেই বহু প্রথিতযশা শিল্পী গেয়েছেন | কিশোর কুমার, মোহাম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, যেশুদাস, সুরেশ ওয়াদকার, আরতি মুখোপাধ্যায়, কুমার শানু, কবিতা কৃষ্ণমূর্থী - আরো কত কে | মজার কথা হচ্ছে যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গানগুলি প্রথমে বাংলা ভাষাতেই কম্পোজ এবং প্রকাশিত হয়েছে | কখনো সেসব গানের আভির্ভাব ঘটেছে কোনো বিশিষ্ট শিল্পীর পুজোর অ্যালবামএ আবার কখনো ঘটেছে ফিল্মের সাউন্ডট্র্যাক হিসেবে | কখনো বর্মন সাহেব আগে সুর তৈরী করেছেন এবং গীতিকাররা তাতে শব্দ বসিয়েছেন | আবার কখনো সখনো উল্টোটাও হয়েছে | বিশেষ করে যখন গুলজার, হস্রাত জয়পুরি, আনন্দ বক্শি বা মজরূহ সুলতানপুরীর মতো ডাকসাইটে কবি-গীতিকারদের সাথে কাজ করেছেন, তখন প্রায় সব ক্ষেত্রেই (ব্যতিক্রম আছেই যদিও) কথাকেই সুরে বাঁধতে হয়েছে বর্মন সাহেবকে | বর্মন সাহেবকে সব চেয়ে বেশি বেগ দিয়েছেন গুলজার সাহেব | প্রায়শই গুলজার সাহেবের লেখা পংতিগুলি বর্মন সাহেবের রাতের ঘুম কেড়ে নিত | গুরুগম্ভীর আবেগ, কঠিন উর্দু শব্দ আর কাব্যিক তাল ভাঙা ব্যঞ্জনের প্রয়োগ তো ছিলই, কিন্তু বর্মন সাহেবের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল যে তিনি হয়তো গুলজার সাহেবের ঐসব অদ্বিতীয় শায়েরীর প্রতি সুবিচারই করতে পারবেন না | শুনেছি কম্পোজ করার সময়  গুলজার সাহেব হামেশাই বর্মন সাহেবের পাশে বসে থাকতেন | বর্মন সাহেব গানের কথাগুলো নিয়ে প্রায়শই গুলজার সাহেবের কানের কাছে গজগজ করতেন আর গুলজার সাহেব সেসব অভিযোগে কান না দিয়ে মিটিমিটি হাসি নিয়ে প্রিয় হারমোনিয়ামের উপর অবলীলায় নাচতে থাকা বর্মন সাহেবের আঙ্গুল গুলোর দিকে নিবিষ্ট চিত্তে চেয়ে থাকতেন | গুলজার নিশ্চিত ছিলেন পৃথিবীতে একটি মানুষই ওনার লেখা শায়েরির প্রতি পূর্ণ সুবিচার করতে পারেন - স্বয়ং রাহুল দেব বর্মন |

লোকাল ট্রেন

লোকাল ট্রেন - কত শত স্বপ্নের উড়ান | 

লোকাল ট্রেন - কঠিন ইস্পাতের সর্পিল দুটি সমান্তরাল রেখা বেয়ে গ্রামাঞ্চল আর মফস্সলের হাজার হাজার মানুষদের তাদের স্বপ্নের খোঁজে শহরের বুকে প্রতিদিন পৌঁছে যাওয়ার মোহিনী রথ |

লোকাল ট্রেন - কত শত অনুপম, অতুল ঘটনার সাক্ষী | কত শত অপূর্ব বন্ধুত্ব, সাহচর্য, প্রেম, ভালোবাসা, অনুকম্পা, অংশীদারিত্বের সাক্ষী | কত শত কুৎসিত কলহ, বিবাদ, বিচ্ছেদ, বিরহ, বিভেদের সাক্ষী | কত অক্লান্ত ঘাম ঝরানো শ্রম, কত দুর্ভাগ্যজনক রক্তক্ষয়ের সাক্ষী এই লোকাল ট্রেন |  

লোকাল ট্রেন - কত অব্যক্ত অনুভব | কত না বলা কথা, কত কখনো না হওয়া আলাপ | নিখাত ভীরু আবেগ | সযত্নে লুকিয়ে রাখা কত চাহনি | না দেখা চোখের জল | কত অজানা মিনতি | অকালে মুছে যাওয়া হাসি | কত কাতর আবেদন, নীরব অভিমান | কত সাফল্য, ব্যর্থতা | কত নবীন সম্ভাবনার জন্ম | কত সম্ভাবনার করুন পরিণতি |           

লোকাল ট্রেন - আঁকা বাঁকা অয়ন বেয়ে নিরলস ধেয়ে চলা এক অটল অঙ্গীকারের নাম 'লোকাল ট্রেন' | 

অনেকদিন পর কর্ম সূত্রে আজ লোকাল ট্রেনে চড়ার সুযোগ নিলাম | স্মরণবেদনা, পুরোনো স্মৃতি হাতড়ানোর আকুলতা, নাকি নির্ভেজাল ভালো লাগা - কোন অনুভূতিটা মুখ্য ভাবে ছুয়েঁ গেলো বোঝার চেষ্টা করেও ঠাওর করতে পারলাম না | থাক, ওটা না হয় নাই বা বুঝলাম | লোকাল ট্রেনের সাথে আমার রোমান্স যে এখনো শেষ হয়ে যায় নি সেই উপলব্ধিটাই আসল |

যা কিছু সনাতন এবং বলাই দা

আজকাল 'সনাতন' শব্দটি খুব চোখে পড়ে | একটু সন্ধান করতেই সনাতন শব্দটির আভিধানিক ইংরেজি অর্থ  পাওয়া গেলো - 'traditional', যাকে আবার বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়াচ্ছে 'সর্বজনগৃহীত', 'প্রথাসম্মত', এমনকি 'প্রচলিত'ও | কাজেই সনাতন শব্দটির অর্থকে যারা 'আদি ও অকৃত্তিম' বলে চালানোর চেষ্টা করছেন তারা বোধহয় অর্ধ সত্য বর্ণন করছেন | যাই হোক তা নিয়ে বিশেষ শির পীড়ায় ভুগছি না | বলা এবং বোঝার দায়িত্ব যাঁদের উপর বর্তায় তারা বলে-বুঝে নেবেন | তো হটাৎ সনাতন শব্দটি নিয়ে পড়লাম কেন ? বেশ, সে প্রসঙ্গেই আসা যাক |

কৈশোরে এবং যৌবনে যারা মাঠে ময়দানে খেলাধুলা করার সুযোগ পেয়েছিলেন তারা প্রায় সকলেই স্থায়ী অপুষ্টিতে ভুগতেন | চুটিয়ে ফুটবল খেললেও, সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের না ছিল পুষ্টি সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান বা ডাযেটিশিয়ানদের রমরমা, না ছিল পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করার জন্য প্রয়োজনীয় সাচ্ছল্য | সুষম প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্যের অভাবে প্রায় প্রত্যেকটি দেহই হয়ে উঠত শীর্ণকায়, পেশিহীন এবং দুর্বল | কেবল মাত্র দুর্দমনীয় মনের জোর, লড়াই করার অদম্য ইচ্ছে, অক্লান্ত অনুশীলন এবং অসাধারণ সহজাত দক্ষতার উপর নির্ভর করে আপামর গরিব এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত বঙ্গ সন্তান ফুটবল ময়দান কাঁপাতেন | আর মাঠে ময়দানে কঠিন পরিশ্রম শেষে পুষ্টি বলতে শীর্ণকায় বঙ্গ সন্তান বুঝতো সেই আদি-অকৃত্তিম 'সনাতন' খাদ্য - পাউরুটি, ঘুগনি আর ডিমের ওমলেট বা সিদ্ধ |   
আজ অনেকদিন পর আবার সেই 'সনাতন' অমৃতের রসাস্বাদন করার সুযোগ ঘটলো | রবিবারের সকালে মাছের থলেতে যতসামান্য এদেশী ইলিশ, গ্রাম সপাঁচেক গুরজোয়ালি আর খানকয়েক তোপসে পুরে যখন উখলিত বক্ষ আর সংকুচিত পকেট নিয়ে বাজার থেকে বেরোলাম তখন হটাৎ চায়ের নেশা মাথা চাড়া দিলো | যেমন ভাবা তেমন কাজ | সটান বলাই'দার চায়ের দোকান | 

পাড়ার চায়ের দোকানে চা মানেই আড্ডা | প্রথম চুমুক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমার আজকের সংগ্রহ গুরজোয়ালির কাঁচা রুপোর মতো বর্ণ আর ইলিশের উজ্জ্বল শল্কর ইতিহাস এবং বংশাবলী নিয়ে তুমুল আলোচনার তরঙ্গ বইতে শুরু করলো | যারা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আলোচনায় যোগ দিলেন তাদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ বন্ধুদের এর আগে আমি কোনোদিন চাক্ষুষ দেখিইনি | যাই হোক, যুগান্তকারী আলোচনায় নবীন তোপসের প্রবেশের আগেই আমার চোখ গেলো ধূমায়িত সেই অমৃত পাত্রের দিকে | এক লহমায় ডায়েটিংএর সব অঙ্গীকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো |  ব্যাস আর কি ? এতক্ষন তক্কে তক্কে থাকা, সদাহাস্য বলাই'দার শুড়শুড়ি - "এক প্লেট হবে নাকি ?" ইদিক-উদিক চেয়ে, ঠোঁটে লাজুক লাজুক হাসি ঝুলিয়ে বললাম, "পাউরুটি টা একটু কড়া করে সেঁকে দিয়ো, আর হ্যাঁ ডিম্ টা কিন্তু আজ ওমলেটই খাবো | কাঁচা লংকার টুকরো দু চারটে বেশি দিয়ো বাপু, অম্বলের ক্রমাগত আক্রমণে লংকার স্বাদ ভুলতে বসেছি প্রায় |"       

তারপর আরেক কাপ চা আর খান তিনেক চোঁয়া ঢেকুর নির্গমন শেষে, মাছের থলেটি বাগিয়ে, দুটি অম্বলের ওষুধ পকেটে গুঁজে, গুটি গুটি পায়ে বাড়ির পথে অগ্রসর হলাম | ব্যাস, আমার গল্পটি ফুরোলো | বাঙালির সনাতন খাদ্যের কাহিনীর নোটে গাছটিও মুড়োলো | আমার অনেক কাজ, মশাই | আপনাদের সাথে বাজে গল্প করে সময় নষ্ট করতে পারবো না, বলে দিলাম | তবে হ্যাঁ, যারা বাঙালির সেই সনাতন খাদ্যের অকৃত্তিম স্বাদ পেতে চান, চুপি চুপি বলে রাখি, বলাই দা কিন্তু এবারের দুগ্গা পুজোর ঐ পাঁচ দিন ওর ঘুগনীর স্বাদ বর্ধন হেতু সামান্য পাঁঠার চর্বি ব্যবহার করবেন বলে স্থির করেছেন | ওহ, ভাবতেই কি সাংঘাতিক শিহরণ জাগছে শরীরে !

অনু কবিতা - সংকলন ১

এক চিলতে আকাশে হাঁটু গেড়ে 
চেয়েছি শুধু মুঠো নীল যন্ত্রনা, যত 
ছায়া পোড়া ছাই, তাই দাও সই,
খুচরো ভালো থাকা, তাও দামি |


---------------------------------------

তোমার কাছে তো আমি ফাগুন চাইনি,
চেয়েছিলাম একটু উষ্ণতা আধা ভোরে |
সূর্যমুখী নয়, চেয়েছি তোমার মুখ, তবে 
হৃদয় শূন্য করে নীরবে কেন গেলে সরে ?
তোমার কাছে তো আমি আকাশ চাইনি
চেয়েছিলাম একটা দীর্ঘ্য উড়ান সাথে |
আসমান রাত জাগে তোমার অপেক্ষায়,
একাকী আমি হাত রাখি কোন হাতে ?


---------------------------------------


ঘষা কাঁচের ওপারে মেঘ না রোদ্দুর, 
বৃষ্টি থামার শেষেও জানা হলো না;  
গোধূলির নরম আলোয় সেঁকা আশ্বাস
আবেগ না পরিহাস, জানা হলো না; 
কোন অভিশাপে বাসি হলো নেশাতুর মন, 
রাতের তারারা কেন ছল ছল, জানা হলো না; 
দুদণ্ড কাঁধে মাথা রাখার নিশ্চিন্তি
ভালোবাসায় না ক্লান্তিতে, জানা হলো না;   
জানা হলো না, জানা গেলো না; 
সব জেনেও জানা হলো না |


---------------------------------------


আকাশের নীল তোমার গালে লেপে দেওয়াটা তো নিছক অজুহাত,
আসল উদ্দেশ্য তো তোমার সংশয়ী চোয়ালের কাঠিন্য মুছে দেওয়া;
ভালোবাসা ভেবে আঁচল ভরেছো যা দিয়ে, আসলে সেটা পুরাতন অভ্যাস,  
উষ্ণতা পাওয়া যেতে পারে আস্তাকুঁড়েও, দায়িত্ত্ব শুধু খুঁজে নেওয়া |


---------------------------------------



- ভাস্কর ভট্টাচার্য     




আকাশের পাখি নাকি পাখির আকাশ ?

পাখি খুব ভালোভাবেই জানে যে আকাশ কেবল তার একার নয় | আকাশের বিশালতা, আকাশের সীমাহীন নীল শুধু তার একার নয় | আকাশের ঔদার্য্য তার একার নয় | আকাশের অন্তহীন ভালোবাসা তার একার হতে পারে না | আকাশের অসীম বিস্তার আরো অনেকের জন্য | আকাশের উদার ব্যাপ্তিতে ছড়িয়ে থাকা আবেগ অনেকের | আকাশের উপুড়হস্ত প্রেম অনেকের জন্য | আকাশের অকুন্ঠ ভালোবাসা বাঁধন ছাড়া এবং অকৃপণ | আকাশের ভালোবাসাকে কেবল মাত্র একটি বুকের খাঁচার ভিতর বেঁধে ফেলা আদতে বিশাল সমুদ্রকে একটি মানুষের ধমনীতে পুরে ফেলার চেয়েও ঢের কঠিন | 

পাখি সব জানে | প্রায় শুরু থেকেই সে সব জেনে যায় এক অদ্ভুত জাদু বলে | সব জেনেও পাখি সেই আকাশের বুকেই ঝাঁপিয়ে পড়ে | মনের আনন্দে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে তার বল্গাহীন উড়ান | সে আকাশের নীলে ডুবে প্রাণ সঞ্চয় করে | আকাশের গভীর, গম্ভীর প্রেমে ভিজে যায় অহরহ | কিন্তু স্বার্থপরের মতো আকাশকে একচেটিয়া নিজের জন্য চায় না সে কক্ষনো | চাইতে নেই | সে সবার সাথে ভাগ করে নেয় আকাশের অবিরাম, অন্তহীন প্রেম কে | তাতেই তার সুখ | আকাশ আর পাখির সম্পর্ক বুঝতে গেলে সুফি হতে হয়, ফকির হতে হয় | অকৃপণ অনন্ত আকাশ আর নিঃস্বার্থ উদার পাখি একে ওপরের পরিপূরক | 

নীল

বয়সের সাথে ধৈর্য্যের কি সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে ? ধৈর্য্য কি বয়সের সাথে সমানুপাতিক ভাবে বাড়ে নাকি কমতে থাকে ? এ প্রশ্ন বহু দিন যাবৎ আমাকে ভাবাচ্ছে | আমি নিয়মিত ভাবে আমার চারিপাশের মানুষদের খুব ভালো করে নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করি | অবশ্যই আমার 'sense of judgement'-কে খুব সযত্নে পাশে সরিয়ে রেখে | চেনা, অচেনা, আত্মীয়, পরিচিত, মিত্র, অমিত্র - সব্বাই কে | মায় নিজেকেও |     

জার্নাল (দিনপত্রিকা বা ডায়েরি) লেখার একটা অভ্যাস ছোটবেলায় তৈরী করে দিয়েছিলেন ইস্কুলের ইউরোপীয় পাদ্রীরা | সেই ডায়েরি আমার সব চেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছিল জীবনের প্রায় শুরুর দিকটায় | ছোট পরিবারের একমাত্র সন্তানদের যা হয় আর কি | তার একটা নামও রেখেছিলাম - নীল (এই নাম রাখার কারণ কি ছিল, সেটা মনে পড়ছেনা, তবে এক্কেবারে প্রথম থেকেই ওই নামটি আমার বেশ পছন্দের) | শুরুতে অবশ্য সেরকম হওয়ার কথা ছিলনা | একান্নবর্তী পরিবারেই জন্ম | জীবনের প্রথম দশ বছর হৈ হৈ করে কেটে গিয়েছিলো | বাড়ি তো নয়, যেন হরেকরকম মানুষ, তাদের বিচিত্র সব কীর্তি কলাপ আর নতুন নতুন আশ্চর্য্যের হাট | একাকিত্ব শব্দ টি তখনও রৈ রৈ করে আমার জীবনে প্রবেশ করেনি | দশ বছর বয়স অবধি সীমাহীন ফূর্তি | অর্ধেক ডিম্ সিদ্ধ জুটলেও হাসছি আবার বড়দাদু  (জ্যাঠার বাবা) কান মুলে দিলেও হাসছি | ছোটকাকা নতুন লাটাই কিনে আনলেও হাসছি আবার পুকুরের পাড়ে পড়ে গিয়ে হাঁটুর চামড়া হাঁ হয়ে গেলেও হাসছি | বন্ধুর ব্যাঙ্গেও হাসছি আবার ফুলদা'র রগড়েও হাসছি | যাই হোক, ওই অপার আনন্দ, ওই অপরিসীম তৃপ্তি বোধহয় নিয়তির গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠলো | ব্যাস, কেল্লা ফতে | দে ব্যাটাচ্ছেলেকে শায়েস্তা করে | ছিটকে গেলাম | এবার একটুকরো ছোট্ট পরিবার | বাবা, মা, আমি আর শূন্যতা | সেই যন্ত্রণার ব্যাখ্যা এই স্বল্প পরিসরে করা সম্ভব নয় | মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও হয়তো কম কষ্ট পেতাম | প্রথমবার আমার অভিধানে প্রবেশ ঘটলো একটি নতুন বাংলা শব্দের - একাকিত্ব !

যাই হোক, এমত সময়ে 'নীল' আমার প্রাণের সাথী হয়ে আমার জীবনে পদার্পন করলো | স্বর না থাকলেও আকাশের মতো একটা বড় হৃদয় ছিল তার | আমার সব আনন্দ, যন্ত্রনা, উচ্ছ্বাস, হতাশা, আবেগ, অনুভূতি অবলীলায় শুষে নিতে পারতো বিনা অভিযোগে, অক্লান্ত ভাবে | পাতার পর পাতা শুধু কথা আর কথা - আমার কথা, সবার কথা | নীল যেন নির্বাক অথচ সংবেদনশীল বন্ধু | তার পাতায় পাতায় ধরা থাকলো আমার ছেলেবেলা, বয়োসন্ধি, কৈশোর এবং যৌবনে প্রবেশের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা অগুনতি কাহিনী | দ্বিধার, বিভ্রান্তির, উল্লাসের, লজ্জার, বিহ্বলতার, সাফল্যের, ব্যর্থতার, বিশৃঙ্খলার, প্রেমের, ঘৃণার, - আরো কত কি | দিনের শেষে তার কাছে সব কিছু সযত্নে সঁপে দিতে পারলেই, ব্যাস - আমার সেকি অনাবিল শান্তি | সেই নীলের বুকেই খচিত আছে আমার দেখা অনেক অনেক মানুষের অবয়ব | তাদেরকে আমি যেমন ভাবে পেয়েছি বা নিদেনপক্ষে দেখেছি | তাদের সেই ছবিগুলো নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষন এবং মূল্যায়ন থেকেই উদ্ভূত | সেগুলো সঠিক নাকি একেবারেই গোলমেলে সে সব ভাবার ইচ্ছে বা প্রয়োজন তখন বোধ করিনি | সময়ের সাথে সাথে অনেক ছবি বদলেছে, মানছি | তার সাথে সঙ্গতি রেখেই আমার জার্ণালেও বদল এসেছে | কিন্তু স্থায়ী শব্দটার সাথে কোথাও যেন আমার একটা বৈরিতা আছে | সে প্রসঙ্গে অন্য একদিন আড্ডা দেওয়া যাবে | তবে আসল কথা হলো, বেশ অল্প বয়সেই চাকরি পেয়ে যাওয়ায় আবার ছিন্নমূল হওয়ার পালা | আমার প্রিয় শহর থেকে বহু দূরে | সেই শহরের গল্প, আমার নতুন জীবনের গল্প আরেকদিন | যাই হোক সুদূরে চলে যাওয়ার মাস ছয়েক পড়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়েছিলাম | বাড়ি ফিরে আবার সেই শিকড়ের সন্ধান | সব কিছুকে আবার ছুঁয়ে দেখা | নিজের অস্তিত্বের গোড়ার সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা | নীল কিন্তু হারিয়ে গেলো | সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাকে কোত্থাও পেলাম না | ঝড়ের মতো সে আমার জীবনে এসেছিলো | ম্যাজিকের মতো নিঃশব্দে কোথায় যেন বেমালুম হাপিশ হয়ে গেলো | হয়তো তাকে সাথে নিয়ে যাইনি বলে তার অভিমান হয়েছিল | হয়তো তার মনে হয়েছিল আমার জীবনে তার প্রয়োজন শেষ | তাকে কোনোদিন এটা বোঝানোর সুযোগটাই পেলাম না, যে তার প্রয়োজন আমার জীবনে আজও আছে | 

যাক গে, আসল কথাটাই এগোলো না | হ্যাঁ, কি যেন বলছিলাম? মনে পড়েছে - বয়সের সাথে ধৈর্য্যের সম্পর্ক | আজকাল যথেষ্ট অধৈর্য্য হয়ে পড়ছি | কেন বলুন তো ? তবে যে মা বলতেন বয়সের সাথে সাথে ধৈর্য্য বাড়বে ? আচ্ছা, বন্ধুরা একটু সাহায্য করতে পারেন ? আপনাদের কি মত ? আপনাদের কি অভিজ্ঞতা ? একটু আলো ফেলুন না, দয়া করে | অন্ধকার কাটুক | অপেক্ষায় থাকলাম ...  


ফেবু

যাত্রাসম্রাট নাট্যাচার্য স্বপনকুমার প্রাতরাশে ছাগলের দুধের চীজ খেতে পছন্দ করতেন কেন ?

আচ্ছা, বলুন তো Facebook এ বসে এতো জ্ঞানের কথা শুনতে ভালো লাগে ? মানে, আপনি ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠেই চোখ কচলাতে কচলাতে FB টা খুললেন | ভাবলেন ছ্যাদলা পড়ে যাওয়া দাঁত গুলো না হয় একটু পরে নতুন আমদানি করা বিলিতি চারকোল পাউডার দিয়ে ঘষা যাবে | নাহলে আবার সেলফি তুলতে গিয়ে দাঁত কেলানো যাবেনা | অবশ্য, "কর্ণের সাথে চা-পান" এর সাম্প্রতিক একটি শো তে কঠিনা কর্পূরের দাঁত টা কেমন যেন ঠেকেছিল - দাঁতগুলোর জোড় ঘেঁষে কিরকম যেন কালো ফ্রেম এর মতো ছোপ | এটা কি চোখের ভুল ? নাকি ছোট বেগম হওয়ার পর এবং পুনরায় আমিষাশী হওয়া ও বাদশাহী মুখশুদ্দি নেশা করার পরবর্তী কালে কালো বর্ডার দেওয়া চকচকে দাঁত হওয়াটাই ওই পরিবারে রেওয়াজ ? কে জানে ? যাগ্গে ওর কথা - না আপনি বিয়েতে প্রাসাদ উপহার পেয়েছিলেন আপনার স্বামীর কাছ থেকে, না গ্রীস এর উপকণ্ঠে হাঁটু গেড়ে বসে আপনাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল | 

যাক - আপনি তো FB খুলেই ফেললেন | কিন্তু একি, এসব কি ? একটা কিম্ভূত লোকের একটা প্রকান্ড ভুঁড়ি আর তার পাশে লেখা সাড়ে তিন দিনে ভুঁড়ি কমানোর 'গোপন' ফর্মুলা | স্ক্রোল করতেই এক সাদা পোশাকধারী মহানুভব একটি ভিডিওয় শোনাচ্ছেন যোগক্রিয়া আর ধ্যানের মাধ্যমে কিভাবে পুজোর খরচ কমানো যায় | আরো নিচে নামতেই পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে একটা পোস্ট, সাথে কিছু অর্গানিক সার এর মিশ্রণ প্রক্রিয়া যা দিয়ে আপনার বাড়ির ছাদের ছোট্ট টবেতেই প্রমান সাইজের বেগুন ফলানো সম্ভব | আরেকটু নামতেই বেশ কয়েকজন অকালপক্ক কাপ্তেনের রাজনৈতিক জ্ঞান - দেখলেই মনে হয় দেশের গণতন্ত্র সুযোগ দিলে এই দেশ অন্তত আরো ১০-১২ কোটি প্রধান এবং মুখমন্ত্রী হেসেখেলে পেয়েই যেত | আরেকটু নামলেই অর্থনীতি থেকে আকুপাংচার জুতো, উগ্রপন্থা থেকে বার্ধক্য আটকানোর পদ্ধতি, শেয়ার মার্কেট থেকে ডাকসাইটে হিরোইনের ক্লিভেজ, নতুন ভাইরাস থেকে লাতিন আমেরিকায় চাষ হওয়া রোগা দুর্বল আনাকোণ্ডার ডিমের গুনাগুন, বিচার ব্যবস্থা থেকে ফিশ্চুলা এবং পশ্চাৎদেশের অন্নান্য ব্যারাম থেকে মুক্তি পাওয়ার অবর্থ্য উপায়, রোগা হতে কুমড়োর বীজের প্রভাব থেকে মোটা হওয়ায় মলমের প্রয়োগ, কাঁঠালের আঠার গুনাগুন থেকে ছাব্বিশ সপ্তাহে ১০ হাজার টাকা ১ কোটি বানানোর যন্ত্র এবং মন্ত্র, কালী থেকে সামাজিক কৌলিন্য, সাদা শাড়ী থেকে সারদা, পাবলো নেরুদা থেকে পয়গম্বর, লাল ঝড় থেকে রাশিয়ান স্যালাড, ... ধর্ম, অধর্ম, আস্তিকতা, নাস্তিকতা, দেশপ্রেম, আন্তর্জাতিকতাবাদ, দক্ষিনপন্থা, বামপন্থা, মধ্যপন্থা, এক জাতি পাঁচ প্রাণ, পঞ্চতন্ত্রের প্যারোডি, মনীষীর কার্টুন, ঝিঙের কোর্মার রেসিপি, IAS হওয়ার সহজ পদ্ধতি থেকে মনের মানুষ বশ করার দুর্দান্ত কবচ, বিয়ের পর প্রথম রাতেই মালাইকা হয়ে ওঠার যাবতীয় উপায়, যে কোনো পাখির মাংস খাওয়া কেন পাপ, মদিরা সেবনের পর বাম হাতে কি কি কাজ করা উচিত নয়, ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি | জ্ঞান, জ্ঞান জ্ঞান |      
  
উফ্ফ, কি বিরক্তিকর | তাই নয় কি ? তাহলে কি আজ আর নতুন সেলফিটা FB তে দেবেন না ? ওমা, তা কেন ? সে হবেখন | নতুন বিলিতি চারকোল পাউডার বলে কথা | শেষ দুপুরে একটু ভাত ঘুম দেওয়ার পর না হয় ...

স্বপ্নাদেশ

বিশিষ্ট সমাজ কর্মী, পরলোকগত মহাত্মা মহানুভব ঈশ্বর মাগনলাল মেঘরাজ (বৃদ্ধ, জরাক্লিষ্ট অর্জুনের ছুরির খেলা মনে আছে নিশ্চই), গত তরশু কাক ভোরে আমায় স্বপ্নাদেশ দিলেন | বললেন, 'বাছা, সবই তো হোলো, ইহলোকে তো বহু ব্যাঘ্রই বধ করে ফেলেছো দেখছি | তবে, তোমাদের ইহলোকের অনুরূপ অমৃতলোকেও কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি শিল্পের প্রভূত উন্নতি ঘটেছে | ইহলোক থেকে প্রক্ষিপ্ত হাজার হাজার অধিবাসনের আবেদন আমাদের মানব সম্পদ উন্নয়ন দপ্তর 'কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা' নামক প্রযুক্তি দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অবলোকন করছেন | অমৃতলোকে প্রবেশের অগ্রাধিকার তারাই পাচ্ছেন যেসকল সহৃদয় ব্যক্তি নব নব সামাজিক এবং অসামাজিক মাধ্যমগুলিতে নিজেদেরকে সাফল্যের সহিত স্থাপন করেছেন এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বমহিমায় বিচরণ করছেন | তো বাছা, কৃপাসিন্ধু পার হওয়ার জন্য তোমাকে কিন্তু কিছু বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে | তোমাকে চট করে এক নতুন প্রজাতির সামাজিক নৌকোয় সত্তয়ারি হতে হবে - মর্তলোকে যার নামকরণ তোমরা করেছো ইনস্টাগ্রাম | কাজেই, যদি মুক্তি এবং হরি প্রাপ্তি চাও, তার সাথে  স্বর্গে একটা ভালো তিন কামরার বাসা, তবে চটপট ইন্সটা নৌকোয় আরোহন করে ফেলো ... ' 

আমি সবে কিছু মৌলিক প্রশ্ন কর্তার সামনে রাখার কথা ভাবতে শুরু করেছি, এমত সময়, প্রভু মেঘরাজের কথা শেষ হওয়ার আগেই, পিঠে এক মোক্ষম গুঁতো অনুভব করলাম | ভোর ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ আধা খুলে দেখি সাক্ষাৎ মা জগদম্বা শিওরে দাঁড়িয়ে বড়ো বড়ো চোখ পাকিয়ে, ডান হাতের বেলান টা মুগুরের মতো ভাঁজছেন আর বাম হাতের তর্জনী দিয়ে আমার পাঁজরে ক্রমাগত কলিং বেল টিপে চলেছেন | বুঝলাম ভাঁড়ারএ টান পড়েছে | তারপর অবশ্য মাড়োয়ারির অফিসে পৌঁছে ক্রেতা ও মক্কেলদের নিরলস পদসেবা | যাই হোক, খাট থেকে কোনোক্রমে নামা এবং সংসারের জোয়াল টানতে টানতে ভারাক্রান্ত স্থুল শরীরটাকে টেনে হিচড়ে কমোড অবধি পৌঁছে দেওয়াটাই ঝক্কির কাজ | বাকি যেটুকু শরীর চাঙ্গা করার ক্রিয়া-প্রক্রিয়া, তার দায়িত্ব আমার মধ্যবিত্ত্ব ক্রনিক কোষ্টকাঠিন্যই প্রত্যেক সকালে নিষ্ঠাভরে পালন করে থাকে !    

তবে ভাববেন না যে গুরুর দেওয়া স্বপ্নাদেশ আমি ভুলে গিয়েছি | ঘুণাক্ষরেও না | দুদিন আগেই ইনস্টাগ্রাম নামক সামাজিক নৌকোয় রীতিমতো পদার্পন করেছি | দেখা যাক স্বর্গসুখ মেলে কি না | তো বন্ধুরা, আপনাদের সুবিদার্থে চুপিচুপি জানিয়ে রাখি আপনারাও চাইলে আমার সাথে যোগ দিতে পারেন | অনেক কথা আছে, সবটা এক্ষুনি, এখানে বলছি না | আসুন, জমিয়ে আড্ডা হবে |    

ফিরে দেখা

ঠাকুরদা ছিলেন কলিকাতা ট্রাম কোম্পানিতে কন্ডাক্টর | বাবা সরকারি আপিসে কর্মরত যৎসামান্য লোয়ার ডিভিশন কেরানি | সুবৃহৎ সংযুক্ত পরিবারের ক্ষুন্নিবৃত্তির পর বিশেষ পুঁজি অবশিষ্ট থাকতো না | পারিবারিক খরচকে সামর্থের মধ্যে রাখতে বাবার জ্যাঠামশাই (আমার বড়দাদু) দৈনন্দিন রোগ প্রতিরোধক হোমিও চিকিৎসাতেও  হাত পাকিয়েছিলেন | না ছিল Urban Company নামক আপদ, না ছিল ৫৮৪ টি চ্যানেল ওয়ালা কেবল টিভি | আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছিল অফুরান ফুরসত আর অক্লান্ত পরিশ্রমের নির্মল আনন্দ | টালির চাল মেরামত, দেয়াল চুনকাম, মাটির উনুন তৈরী থেকে শুরু করে প্রশস্ত উঠোনের গোবর লেপা দৈনিক শুদ্ধিকরণ আর সযত্নে চেরা পাকা বাঁশের বেড়া দেওয়া - সবই পরিবারের সদস্যরাই করে ফেলতো সানন্দে | তা ছোটরাই বা পিছিয়ে থাকে কেন? বড়োদের দেখাদেখি আমরাও কোমর বেঁধে তৈরী থাকতাম বৈকি | ছপাৎ ছপাৎ শব্দে কৃত ঘুঁটের দেয়াল চিত্র বা আলকাতরা মাখানো টিনের পাতের উপর প্রবল যত্নসহকারে সৃষ্ট গুঁড়ো কয়লার গুলের নিখুঁত তারামন্ডল - আমার ছোটবেলায় এসবের যে কি প্রবল টান ছিল তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয় | এসব কাজে আমরা - ভাই বোনেরা - সারাক্ষণ জ্যাঠা-জ্যাঠি, বাবা-মা, কাকা-কাকিমা আর পিসিদের পারদর্শিতার কাছাকাছি পৌঁছনোর অবিরাম চেষ্টা করে যেতাম |  আমরাই ছিলাম আমাদের বাড়ির "কাজের লোক" | বাইরের লোক রেখে কাজ করানোর মতো অর্থ বা প্রয়োজন কোনোটাই আমাদের সেভাবে ছিলোনা |  

সেই দিন আর নেই |.সেই বৃহৎ পরিবার এখন সময়ের গহীন অনন্তে ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকা কিছু ধূসর স্মৃতির অবয়ব মাত্র | 

যাই হোক, অনেক দিন পর নিজের হাতে বাড়ির নতুন কাঠের আসবাব রং করলাম | অনেক বছর পর আবার এক নির্মল তৃপ্তির অনুভূতি লাভ করলাম |  

আসবাব রং করলাম নাকি চকিতে কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে ছুঁয়ে ফিরে এলাম ?

প্রার্থনা ও যুদ্ধ

প্রার্থনা | ছোট্ট শব্দ | কিন্তু ছোটবেলা থেকে শুনেছি এর নাকি অদ্ভুত শক্তি | বড়রা বলতেন হাত জোড় করে, চোখ বুজে, একাত্ম চিত্তে প্রার্থনা করলেই কেল্লা ফতে | ইস্কুলের আইরিশ পাদ্রিরা বলতেন 'power of community prayer' - এর কথা |  বলতেন, সমষ্টিগত ভাবে প্রার্থনার জোরে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে অজেয় প্রতিপক্ষ, দুর্গম পথ থেকে প্রবল ঝঞ্ঝা, ব্যাপক দুর্ভিক্ষ থেকে মায় রুষ্ট (অপ)দেবতার রোষ - সবই নাকি অক্লেশে লঙ্ঘন করা সহজ হয়ে ওঠে |

কেন জানিনা, আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে - বেয়নেটের খোঁচায় ফালা ফালা হতে হতে মানুষ কি প্রার্থনা করে ? ক্লাস্টার বোমার আঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ধড়হীন দেহ কি প্রার্থনা করে ? স্রাপ্নেল্ এর আঘাতে ক্ষত বিক্ষত কিশোর, রক্তাক্ত হাত জোড় করে কি প্রার্থনা করে ? বাঙ্কার এ বসে মৃত্যুর আগমনের প্ৰহর গুনতে থাকা অন্তঃসত্ত্বা মা কি প্রার্থনা করে ? সাইরেনের তীব্র-তীক্ষ্ণ শীৎকারে কেঁপে কেঁপে ওঠা শিশু কি প্রার্থনা করে ? জীবন-জীবিকা হারিয়ে এক লহমায় উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া মানুষ কি প্রার্থনা করে ? পূর্বপুরুষের ভিটে মাটি ছেড়ে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা, ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের পথে হারিয়ে যেতে যেতে হাজার হাজার অসহায় শরণার্থী প্রাণ কি প্রার্থনা করে ? 

কোন ভাষায়, কি ভাবে প্রার্থনা করলে এই ধ্বংসলীলা, এই রক্ত আপ্লাবন থামবে জানি না | জানিনা প্রার্থনায় সত্যিই কোনো অন্তর্নিহিত শক্তি আছে কিনা | 

আমি প্রার্থনা করতে ভুলে গেছি ...

শাসন

পড়াশোনায় বিলকুল ফাঁকিবাজি হচ্ছে বুঝতে পারতেন, তবুও প্রবল চপেটাঘাতে আমার পশ্চাৎদেশ গরম করার চেয়ে কঠিন বাক্যবানে জর্জরিত করতেই বেশি পছন্দ করতেন বাবা | প্রায়শই পাশ দিয়ে স্বগতোক্তির মতো আওড়াতে আওড়াতে চলে যেতেন - “সময় বহিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়” ! উনি বোধহয় রুলের গুঁতোর চেয়ে ভাষার চাবুকে বেশি ভরসা করতেন | কিন্তু আমার মগজের তন্তু কিঞ্চিৎ স্থুল হওয়ার দরুন এবং বাংলা ভাষায় আমার অতুলনীয় পান্ডিত্যের কারণে ওই কথার নিগূঢ় অর্থ ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারতাম না সেই সময় | আজ আমার কন্যাকে, অঙ্ক পরীক্ষার আগের সন্ধ্যায়, জ্যামিতির কঠিন মারপ্যাঁচ অভ্যাস ত্যাগ করে রূপ চর্চায় মগ্ন হয়ে উঠতে দেখে, নিজের অজান্তেই ওই অমোঘ বাণী ওর  দিকে নিক্ষেপ করে দিলুম | অবশ্য ছুড়ে তো দিলুম, কিন্তু ও যদি ফস করে ওই কথাটার আক্ষরিক অর্থ জানতে চায় ? তখন তার ঠেলা সামাল দেবে কে ? আসলে ওকে গাল দিলে ও গালি টাকে অগ্রাহ্য করে সেটার অন্তর্নিহিত অর্থ জানতে বিশেষ আগ্রহী হয়ে পড়ে ! ও বোধয় বুঝে গেছে যে ওর পরম শ্রদ্ধেয় পিতৃদেব এক চুলের জন্য বাংলা ভাষায় নোবেল টা হাত ছাড়া করেছে | খানিকটা বাতের বেদনায় কাবু মানুষের পায়ে কাঁচি চালানোর মতো এরকম মুহূর্ত গুলিতেই ও আমার দিকে প্রশ্নবাণ বর্ষণ করতে থাকে, যতক্ষণ না আমার কাঁচুমাঁচু মুখ থেকে 'ঘাট হয়েছে মা, এইবার টা ছেড়ে দে' শুনতে পায় | জাহাতক ভাবা, এক্কেবারে সাথে সাথেই আমার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা ! কি কুক্ষণে বাবার কথার অপব্যবহার করার দুঃসাহস দেখাতে গেলাম ! কন্যা আমার দিকে চকিতে ফিরে প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করার আগেই, ঢোক গিলে, মানে  মানে চিলেকোঠার ঘরে কেটে পড়লাম বিদ্যুৎ গতিতে  ….