ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খুললেই দুর্গোৎসবের দারুন সব ছবি | ঝকঝকে, দৃষ্টিনন্দন, রুচিপূর্ণ, আনন্দদায়ক | আমার ছোটবেলার দূর্গা পুজোর স্মৃতি প্রধানত বারোয়ারি পুজোর বা ক্লাবের পুজোর | যদিও গুটিকয়েক সমৃদ্ধিশালী, সাবেকি, বর্ধিষ্ণু এবং বুনিয়াদি ধনী পরিবারের পুজো তাদের নিজস্ব ঠাকুর দালানেই হতো | অবশ্য সেরকম বাড়ির পুজো ছিল হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র | লক্ষ্মী পুজোটাই বরঞ্চ মধ্যবিত্ত্ব গৃহীর বাড়িতে ঘটা করে করার রেওয়াজ ছিল |
এখন কিন্তু প্রচুর (উচ্চ)মধ্যবিত্ত পরিবার বাড়িতেই রীতিমতো দুর্গাপুজোর আয়োজন করছেন | পাড়ার সরস্বতী আর শীতলা পুজোয় পারদর্শী পুরোহিত বাড়ির দূর্গা পুজো কতটা রীতিনীতি বা বিশুদ্ধ পদ্ধতি মেনে করতে পারছেন তা বলতে পারবোনা | তাতে অনাচার কতটা হচ্ছে বা আদৌ হচ্ছে কিনা তাও বলতে পারবো না | তবে গৃহী এবং গৃহিণীর নিষ্ঠা কিন্তু দেখার মতো এবং প্রভূত প্রশংসার যোগ্য | যাবতীয় তোড়জোড়, সাজগোজ, শোনা গয়না, ঢাক কাঁসর, ধুপ ধুনো, মন্ত্রপাঠ, লোকজন, চন্ডী স্তোত্র আর রবির গান থেকে শুরু করে উদ্দাম ধুনুচি নাচ আর আশা ভোঁসলের 'উরি উরি বাবা' - সব মিলিয়ে একটা মার্ কাটারি ব্যাপার | মধ্যবিত্ত বাড়ির পুজোর দৃশ্যগুলো যেন একতা কাপুরের পারিবারিক টেলিসিরিয়ালগুলির এক একটি সেটের চকচকে স্থিরচিত্র | আমার মনে হয় প্রধান তিনটি কারণে মধ্যবিত্ত্ব পরিবারগুলি এখন বাড়িতে দুগ্গোপূজোর আয়োজন করতে শুরু করেছেন:
১) পুণ্যি হয় সরাসরি এবং অর্থ ব্যয়ের সমানুপাতিক | অনেকের চাঁদার অর্থে আয়োজিত বারোয়ারি পুজোয় পুণ্যি ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে | বাড়ির পুজোয় সে হ্যাপা কম | গৃহী যেহেতু সব খরচ বহন করছেন, আশা করা যায় তার এবং তার পরিবারের পুণ্যির সম্ভাবনা সব চেয়ে বেশি এবং খরচের সমানুপাতিক |
২) সামাজিক পরিচিত বাড়ে এবং প্রতিষ্ঠা সুদৃঢ় হয় | ছোটবেলায় যখন আমাদের বাড়িতে বিদ্যুতের আলো এসে পৌঁছয় নি, তখন অমুক মহাশয়ের বাড়িতে একটি এম্বাসেডর বা ফিয়াট গাড়ি আছে শুনলেই ছুটতাম একটিবার ঐ অপূর্ব বাহন দেখতে পাওয়ার লোভে | এবং আমরা নিশ্চিত হতাম এই গাড়ির মালিক নির্ঘাত একজন কেষ্ট-বিষ্টু | আজকাল বোধয় কেষ্ট-বিষ্টুর তকমা পেতে গেলে বাড়িতে দুগ্গোৎসব আয়োজনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে |
৩) উৎসবের মোড়কে মোচ্ছব | আমরা তুখোড় আড্ডাবাজ, যাই বলুন না কেন | যখন হাত শূন্য ছিল তখন ক্লাবের পুজোতেই সময় করে, বয়োজ্যেষ্ঠদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর করা শাসন এড়িয়ে, মোচ্ছব চলতো অল্পস্বল্প | ভোর রাতে চোরের মতো বাড়ি ঢোকার আগে ভালো করে দেখে নেওয়া হতো বাবা-জ্যাঠারা শুয়ে পড়েছেন কিনা | এখন অর্থের অভাব কমেছে, কামাই-টামাই বেড়েছে | বাড়িতে একটা পুজো করে ফেলতে পারলেই ব্যাস - পুণ্যি-টুনি তো হবেই, লোকেও জানবে ধর্মের প্রতি আমার অগাধ দায়বদ্ধতা আর নিষ্ঠার কথা, আমার সামাজিক প্রতিষ্ঠা আর প্রতিপত্তির কথা | তার সাথে হপ্তাখানেকের বাঁধনহীন মোচ্ছব |
পাড়ায় পাড়ায় মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারগুলির বাড়িতে দুগ্গোপুজোর আয়োজনের কারন অন্য আরো কিছু হতেই পারে | আমার জানা নেই | বন্ধুদের গোচরে থাকলে জানাবেন | সমৃদ্ধ হবো |
আমি কিন্তু অসূয়াপূর্ন বা cynical হয়ে যাইনি | বিশ্বাস করুন দু-একটা পুজোতে আমিও সাদা পাঞ্জাবিতে ভালো সুগন্ধ মেখেই গিয়েছি | ঢাকের তালে ধুনুচি নৃত্যও করেছি সাধ্যমতো | সুন্দর কিছু দৃশ্য ও মানুষ ক্যামেরাবন্দিও করেছি | সব মিলিয়ে, মজাই পাচ্ছি | চলতে থাকুক | মধ্যবিত্ত বাঙালি গৃহস্তের বাড়ির দূর্গা পুজো যুগ যুগ জিয়ো |
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | অষ্টমীর আড্ডা | ০৩.১০.২০২২
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
অসংখ্য ধন্যবাদ বন্ধু | আপনার ভালোবাসা আর পৃষ্ঠপোষকতা আমার উর্জা, আমার প্রধান পাথেয় | পাশে থাকুন, এই প্রার্থনা রইলো | অনেক ভালোবাসা থাকলো, আপনার জন্য | নমস্কার |