মঙ্গলবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২২

একতা কাপুর এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত্বের 'বাড়ির পুজো'

 ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খুললেই দুর্গোৎসবের দারুন সব ছবি | ঝকঝকে, দৃষ্টিনন্দন, রুচিপূর্ণ, আনন্দদায়ক | আমার ছোটবেলার দূর্গা পুজোর স্মৃতি প্রধানত বারোয়ারি পুজোর বা ক্লাবের পুজোর | যদিও গুটিকয়েক সমৃদ্ধিশালী, সাবেকি, বর্ধিষ্ণু এবং বুনিয়াদি ধনী পরিবারের পুজো তাদের নিজস্ব ঠাকুর দালানেই হতো | অবশ্য সেরকম বাড়ির পুজো ছিল হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র | লক্ষ্মী পুজোটাই বরঞ্চ মধ্যবিত্ত্ব গৃহীর বাড়িতে ঘটা করে করার রেওয়াজ ছিল | 

এখন কিন্তু প্রচুর (উচ্চ)মধ্যবিত্ত পরিবার বাড়িতেই রীতিমতো দুর্গাপুজোর আয়োজন করছেন | পাড়ার সরস্বতী আর শীতলা পুজোয় পারদর্শী পুরোহিত বাড়ির দূর্গা পুজো কতটা রীতিনীতি বা বিশুদ্ধ পদ্ধতি মেনে করতে পারছেন তা বলতে পারবোনা | তাতে অনাচার কতটা হচ্ছে বা আদৌ হচ্ছে কিনা তাও বলতে পারবো না | তবে গৃহী এবং গৃহিণীর নিষ্ঠা কিন্তু দেখার মতো এবং প্রভূত প্রশংসার যোগ্য | যাবতীয় তোড়জোড়, সাজগোজ, শোনা গয়না, ঢাক কাঁসর, ধুপ ধুনো, মন্ত্রপাঠ, লোকজন, চন্ডী স্তোত্র আর রবির গান থেকে শুরু করে উদ্দাম ধুনুচি নাচ আর আশা ভোঁসলের 'উরি উরি বাবা' - সব মিলিয়ে একটা মার্ কাটারি ব্যাপার | মধ্যবিত্ত বাড়ির পুজোর দৃশ্যগুলো যেন একতা কাপুরের পারিবারিক টেলিসিরিয়ালগুলির এক একটি সেটের চকচকে স্থিরচিত্র | আমার মনে হয় প্রধান তিনটি কারণে মধ্যবিত্ত্ব পরিবারগুলি এখন বাড়িতে দুগ্গোপূজোর আয়োজন করতে শুরু করেছেন: 

১) পুণ্যি হয় সরাসরি এবং অর্থ ব্যয়ের সমানুপাতিক | অনেকের চাঁদার অর্থে আয়োজিত বারোয়ারি পুজোয় পুণ্যি ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে | বাড়ির পুজোয় সে হ্যাপা কম | গৃহী যেহেতু সব খরচ বহন করছেন, আশা করা যায় তার এবং তার পরিবারের পুণ্যির সম্ভাবনা সব চেয়ে বেশি এবং খরচের সমানুপাতিক |

২) সামাজিক পরিচিত বাড়ে এবং প্রতিষ্ঠা সুদৃঢ় হয় | ছোটবেলায় যখন আমাদের বাড়িতে বিদ্যুতের আলো এসে পৌঁছয় নি, তখন অমুক মহাশয়ের বাড়িতে একটি এম্বাসেডর বা ফিয়াট গাড়ি আছে শুনলেই ছুটতাম একটিবার ঐ অপূর্ব বাহন দেখতে পাওয়ার লোভে | এবং আমরা নিশ্চিত হতাম এই গাড়ির মালিক নির্ঘাত একজন কেষ্ট-বিষ্টু | আজকাল বোধয় কেষ্ট-বিষ্টুর তকমা পেতে গেলে বাড়িতে দুগ্গোৎসব আয়োজনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে |   

৩) উৎসবের মোড়কে মোচ্ছব | আমরা তুখোড় আড্ডাবাজ, যাই বলুন না কেন | যখন হাত শূন্য ছিল তখন ক্লাবের পুজোতেই সময় করে, বয়োজ্যেষ্ঠদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর করা শাসন এড়িয়ে, মোচ্ছব চলতো অল্পস্বল্প | ভোর রাতে চোরের মতো বাড়ি ঢোকার আগে ভালো করে দেখে নেওয়া হতো বাবা-জ্যাঠারা  শুয়ে পড়েছেন কিনা | এখন অর্থের অভাব কমেছে, কামাই-টামাই বেড়েছে | বাড়িতে একটা পুজো করে ফেলতে পারলেই ব্যাস - পুণ্যি-টুনি তো হবেই, লোকেও জানবে ধর্মের প্রতি আমার অগাধ দায়বদ্ধতা আর নিষ্ঠার কথা, আমার সামাজিক প্রতিষ্ঠা আর প্রতিপত্তির কথা | তার সাথে হপ্তাখানেকের বাঁধনহীন মোচ্ছব | 

পাড়ায় পাড়ায় মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারগুলির বাড়িতে দুগ্গোপুজোর আয়োজনের কারন অন্য আরো কিছু হতেই পারে | আমার জানা নেই | বন্ধুদের গোচরে থাকলে জানাবেন | সমৃদ্ধ হবো |                 

আমি কিন্তু অসূয়াপূর্ন বা cynical হয়ে যাইনি | বিশ্বাস করুন দু-একটা পুজোতে আমিও সাদা পাঞ্জাবিতে ভালো সুগন্ধ মেখেই গিয়েছি | ঢাকের তালে ধুনুচি নৃত্যও করেছি সাধ্যমতো | সুন্দর কিছু দৃশ্য ও মানুষ ক্যামেরাবন্দিও করেছি | সব মিলিয়ে, মজাই পাচ্ছি | চলতে থাকুক | মধ্যবিত্ত বাঙালি গৃহস্তের বাড়ির দূর্গা পুজো যুগ যুগ জিয়ো |    



© ভাস্কর ভট্টাচার্য | অষ্টমীর আড্ডা | ০৩.১০.২০২২

রবিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২২

পরিচয়

বারুইপুর পৌঁছতে বেলা হবে | অনেকটা পথ | সকাল সকাল বেরোতে পারলেই ভালো | বাবাকে রেখে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যাবে | সন্ধেবেলা আবার একটা ইনভিটেশন আছে জন্মদিনের | ছেলের স্কুলের বন্ধুর বাবার পঁচাত্তরতম জন্মদিন | একটা ভালো গিফট কিনতে হবে, সাথে একটা রজনীগন্ধার বোকে আর রসময়ের কাঁচাগোল্লা | ভদ্রলোক নাকি রজনীগন্ধা আর কাঁচাগোল্লা খুব পছন্দ করেন | সকাল থেকেই তাড়া লাগাচ্ছি, কিন্তু বাবার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই | উনি ওনার দুলকি চালেই চলেছেন | আজ যেন আরো শ্লথ | উফ্ফ, এতো বিরক্তি লাগে যে কি বলবো |
কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছি | আমি ড: পবিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভারতবর্ষের একজন স্বনামধন্য পালিওন্টোলজিস্ট | জীবাশ্ম বা ফসিল্স নিয়েই আমার কাজ | আমার স্ত্রী রক্তিমা, উত্তর কলকাতার একটি সরকারি কলেজের রসায়ন ডিপার্টমেন্টের বিভাগীয় প্রধান | আমাদের একটিই সন্তান | নামি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ক্লাস ফাইভের ছাত্র | আজ পর্যন্ত কখনো দ্বিতীয় হয়নি রিজু | রণদীপ ওর পোশাকি নাম | আমাদের বিশ্বাস জীবনে ও অনেক বড়ো হবে | ও অবশ্য ওর ঠাকুরদার সবচেয়ে প্রিয় | রিজুরও 'দাদাই' অন্ত প্রাণ | আমরা জানতাম ও নিশ্চিত একটু আধটু কষ্ট পাবে | তবে গত এক সপ্তাহ ধরে ও যে এতটা চুপসে যাবে, সেটা আমরা একেবারেই অনুমান করতে পারিনি | নানা ভাবে চেষ্টা করে গেছি ওর মনমরা ভাবটাকে কাটানোর | কিন্তু কিছুতেও কিছু হয়নি | আজ থেকে যে ওর দাদাইয়ের কাছে আর গল্প শুনতে শুনতে ঘুমাতে যেতে পারবেনা বা ইস্কুলের বন্ধুদের সাথে ঝগড়ার যাবতীয় বিবরণ ভাগ করে নিতে পারবেনা সেটা বুঝতে পেরেছে | আজে ওর দাদাই ওর থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে | বৃদ্ধাশ্রমের নামটা কিন্তু আমার বাবা নিজেই সাজেস্ট করেছিলেন |
একদিন ইনস্টিটিউট থেকে আমি বাড়ি ফেরার পর আমাকে ডেকে নিজেই বলেছিলেন, "শোন বাবু, বয়সের সাথে সাথে মানুষের অনেক সমস্যা হয় | তোরা মারাত্মক ব্যস্ত | তোদের অনেক কাজ | আমি কোনো কাজের নই | আমি তোদের সাথে থাকলে তোদের সমস্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক | আমি সেটা বুঝতে পারছি গত কিছু বছর | দাদুভাইও এবার সিক্সএ উঠবে | পড়াশোনার চাপ বাড়ছে | আমার জন্য হয়তো ওর অনেকটা সময় অপচয় হচ্ছে | তারপর দ্যাখ আগামী দিনে ওর পড়াশোনার খরচও বাড়বে | আমার ওষুধ-পথ্যের খরচও দিন দিন বেড়েই চলেছে | তোরাই বা পেরে উঠবি কেন ? তার চেয়ে বরং আমি একটা আবাসিক আশ্রমে গিয়ে থাকি | সবার সুযোগ সুবিধা মতো দেখা হবে | কাজের মানুষরা কাজে মন দিতে পারবে আর আমি আমার অকাজগুলোতে | সমবয়সীদের সাথে থাকবো, মন্দ লাগবেনা | তোদের কথা খুব বেশি মনে পড়লে, আমি বরঞ্চ তোদের সুবিধা মতো তোদের সাথে ফোনে কথা বলে নেবোখন | সরকার যেটুকু পেনশন দেয়, আমার বেশ চলে যাবে, বুঝলি ? আর তো ব্যাস কয়েকটা দিন |
প্রতীক্ষা | বারুইপুরের এই আশ্রমটির বেশ নাম আছে | আমার ইনস্টিটিউটএর সিনিয়র কলিগ ধুর্জটিদা সার্টিফাই করলেন | ওনার এক দুঃসম্পর্কের মামাও ওখানেই আছেন গত আট বছর | প্রশস্ত, নিরাপদ এবং সব আধুনিক সুবিধাযুক্ত | সব চেয়ে মজাদার কথা হচ্ছে যে আশ্রমটিতে দুটি পাশাপাশি ভবনে দু ধরনের আবাসিকদের থাকার ব্যবস্থা আছে - একটিতে থাকেন বয়জ্যেষ্ঠরা অপরটিতে অনাথ শিশুরা | পরিচালক এবং ব্যবস্থাপক একই মানুষ | ড: অরিন্দম দাসগুপ্ত এখন একজন অশীতিপর বৃদ্ধ | শুনেছি কৃতি ছাত্র ছিলেন | বছর চল্লিশ আগে ফিলাডেলফিয়ার একটি বিখ্যাত ফার্মা রিসার্চ কোম্পানির দামি চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে শুরু করেছিলেন এই আবাসনটি | শুরুতে কিছু অনাথ শিশুদের ঠাঁই দিয়েছিলেন | বছর দশ পরে সুযোগ করে দিয়েছিলেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরও | বাবারই পছন্দ অরিন্দম বাবুর জায়গাটা | একদিকে ভালোই হলো - খারাপ হলে অন্তত তার দায়িত্ব আমার উপর বর্তাবে না |
আশ্রমে পৌঁছতেই, বাবার জিনিসপত্র নামিয়ে নেওয়া হলো | আর এয়ার-কন্ডিশনড অফিস ঘরে আমাদের বসার ব্যবস্থা হলো, প্রাথমিক কিছু প্রক্রিয়া এবং সইসাবুদ খতম করার জন্য | দেয়াল ঘড়িতে তখন দেড়টা বাজতে মিনিট দুয়েক বাকি | মনে মনে ভাবছি তাড়াতাড়ি কাজটা চুকলে বাঁচি, এমন সময় ম্যানেজার এসে জানালেন অরিন্দম বাবু মালিদের সাথে একটু কথা সেরেই আসছেন | আশ্রমের বাগানের ক্ষতি না করে কি ভাবে এবারের দূর্গা পুজোটা আরেকটু বড়ো করে করা যায়, তারই প্ল্যানিং চলছে | কফি খেতে খেতে চেয়ারে আরেকটু আরাম করে যখন বসছি, খেয়াল করলাম বাবা উঠে পড়েছেন | রিজুর কাঁধে হাত রেখে বললেন, "চলো দাদুভাই, একটু বাগানটা দেখে আসি" | বাবার এই চঞ্চলতাটা, আর সব ব্যাপারে ওভার কনফিডেন্সটাই মেনে নিতে পারিনা | কি দরকার একটা অচেনা জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর | আর তো কয়েকটা মুহূর্ত, শান্ত হয়ে বসে থাকতে সমস্যা কোথায়, কে জানে | যাক, ভাবলাম নাতির সাথে আবার কবে দেখা হবে তার ঠিক নেই | যাক দুজনে একসাথে একটু সময় কাটাক |
দেখতে দেখতে প্রায় দশ মিনিট কেটে গেলো | দেরি হয়ে যাচ্ছে | একটু চিন্তাও হচ্ছে | রুবিও (আমার স্ত্রী রক্তিমার ডাক নাম) বললো, "যাও একটু দেখো | বয়সের সাথে সাথে মানুষ কেন যে এরকম আক্কেলহীন হয়ে যায় কে জানে"| যে পথে বাবা আর রিজু গিয়েছিলো সেইদিকে এগিয়ে গেলাম | অন্দরের দরজা পার করে, লম্বা বারান্দা পেরোতেই, একটা বড়ো কাঠের দরজার ওপারে কয়েকধাপ নিচু সিঁড়ি নেমে মিশে গেছে একটা বেশ প্রশস্থ শুড়কির রাস্তায় | বোঝাই যায় রাস্তাটা বেশ বড়ো একটি বাগানে গিয়ে শেষ হয়েছে | চারিদিক গাঢ় সবুজ, অনেক ছোট বড়ো গাছগাছালির দৌলতে | ছেলের নাম ধরে ডাকতে যাবো, এমন সময় হটাৎই দূরে নজরে পড়লো বাগানটার অপর প্রান্তে দুটো দৃশ্যের দিকে | একটিতে রিজু অনেকগুলো বাচ্চা কাচ্চার সাথে মাটিতে বসেই কি সব যেন খেলছে | আর বাবা পাশেই একটা আম গাছের ছায়ায় হাত পা নাড়িয়ে আরেকজন সৌম্যদর্শন বৃদ্ধের সাথে খোশগল্প করছেন | দুজনের মুখের হাঁসি দেখে মনে হলো নিশ্চই খুব মজার কোনো কথা নিয়ে আলোচনা চলছে | এতো স্বল্প সময়েও বাবা এখানে বন্ধুত্ব পাতিয়ে নিয়েছেন দেখছি | হাত এ প্রচুর অবকাশ থাকলে যা হয়, আর কি | আমি কাছে যেতেই, বাবা আমাদের দুজনকে একে ওপরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, "ইনিই অরিন্দমবাবু | আর ও'ই পবিত্র"| আমি নমস্কার করেই বাবার দিকে ফিরে বললাম, "তোমার কি কান্ডজ্ঞান নেই, বলো তো ? আমাদের তাড়াতাড়ি ফেরা দরকার, কতবার বলেছি তোমাকে"| দুজনেই একটু অপ্রস্তুত হলেন, বুঝতে পারলাম | আসলে সব বৃদ্ধরই একই সমস্যা - অন্যের সময়ের মূল্য দিতে জানেন না |
সব প্রক্রিয়া সারতে সারতে আরো ঘন্টা খানেক লেগে গেলো | বাবার ঘরটা বেশ সুন্দর, খোলামেলা | বছর পঁয়ষট্টির আরেক বৃদ্ধ বাবার রুমমেট | বেরিয়ে আসার সময় বাবা আর রিজু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদলো | আমি কোনোদিন বাবাকে কাঁদতে দেখিনি | একটু অদ্ভুত লাগলো | রিজুকে শান্ত করতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হবে বুঝতেই পারছি | যাই হোক, যার শেষ ভালো তার সব ভালো | রুবিও দেখলাম অনেক বছর পর বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো | আমিও ইতস্তত করতে করতে প্রণামটা করেই ফেললাম | এবার যাওয়ার পালা | অরিন্দম বাবুকে বলে রাখলাম প্রয়োজন পড়লেই ফোন করবেন আর একটু সময় দেবেন, অনেকটা দূর থেকে আসতে হবে তো, তাই | বাবার কিছু পয়সাকড়ি লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করতেই মানা করে বললেন, "তোরা ভালো থাকিস, সাবধানে থাকিস, দাদুভাইকে ভালো করে মানুষ করিস, তাহলেই হবে | আমি এদিকটা সামলে নেবো |" বেশি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করার এই সমস্যা - জায়গা বিশেষে বাবা নাটকীয় না হয়ে পারবেনই না | যাক গে, ঝামেলা চুকিয়ে সবাই গাড়িতে ওঠার জন্য এগিয়ে গেলাম | রিজুকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলতে হলো | কিন্তু অনেক্ষন ধরে মাথায় ঘুরতে থাকা একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আরেকবার আমি গাড়ি থেকে নামলাম | বাবা ততক্ষনে ভিতরে চলে গিয়েছেন | হয়তো রিজুর আচরণ আর কান্না ওনাকে বিহ্বল করে দিচ্ছিলো | অরিন্দম বাবু কিন্তু ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন, অপলক দৃষ্টিতে আমাদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে | যেন আমরা এক একজন অপরাধী এবং ওনার করুনার পাত্র | আমার ওনার তাকানোটা একদম ভালো লাগছে না | আমি ওনার দিকে এগিয়ে গেলাম | আরেকবার নমস্কার করার ভঙ্গিতে বললাম, অরিন্দম বাবু আমাকে খারাপ ভাববেন না, পরিস্থিতির চাপে পড়েই অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাই না? "সে তো বটেই", সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে উনিও প্রতিনমস্কার করলেন | আমি সুযোগ বুঝে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা আমার বাবা কোথা থেকে আপনাদের এই প্রতিষ্ঠানতার কথা জেনেছেন বলতে পারেন ? উনি কিন্তু আমাদের কিছুই বলেন নি | আজ দেখলাম, বাবা আর আপনি বাগানে আড্ডায় মশগুল, যেন অনেকদিনের পরিচয় | ব্যাপারটা কি বলুন তো | অরিন্দম বাবু চোখের পাতা না ফেলে বেশ খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে আছেন দেখে বললাম, ক্ষমা করবেন প্রশ্নটা করা বোধয় আমার উচিত হয়নি | আচ্ছা চলি | অরিন্দম বাবু যেন মুহূর্তে সম্বিৎ ফিরে পেলেন | মৃদু হেসে বললেন, "না না, কোনো অনুচিত প্রশ্ন করেন নি | আপনি সন্তান, আপনার জানার অধিকার আছে | হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন | আপনার বাবার সাথে আমার অনেক দিনের চেনা জানা | প্রথম পরিচয় প্রায় আটতিরিশ বছর আগে, যেদিন আপনার বাবা, আপনার মাকে সঙ্গে করে প্রথমবার আমার আশ্রমে এসেছিলেন | সেদিনের সেই নিঃসন্তান দম্পতি আমার কাছে এসেছিলেন একটি অনাথ শিশুকে দত্তক নিতে | আবাসিকদের মধ্যে সবচেয়ে চুপচাপ, চাপা গায়ের রং আর ছোট্টোখাট্টো, প্রায় বিষন্ন একটি শিশুকে পাগলের মতো আদর করতে করতে দুজনে মিলে বাড়ি নিয়ে গেছিলেন | তারপরও যোগাযোগ ছিল | বহুবার কথা হয়েছে | ওনারাও অনেকবার এখানে এসেছেন | সাধ্যমতো আমাদের সহায়তা করেছেন | অনেক আবেগ, ত্যাগ আর স্নেহর সংমিশ্রনে সন্তান মানুষ করেছেন শুনেছিলাম | অনেক ভেবেচিন্তে দত্তক নেওয়া সন্তানের নাম রেখেছিলে 'পবিত্র' | আজ আপনার সাথে আমার পরিচয় হলো, পবিত্রবাবু | ভালো থাকবেন" |


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | রবিবারের ছোটগপ্পো | ০২.১০.২০২২

রবিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২২

অনু কবিতা - সংকলন ৩

|| প্রতীক্ষা || 


রামধনুর নোলক পরে, সেই যে মেঘের ওড়না জড়ালে, তারপর 

অগুনতি নিঃসঙ্গ নিশুতি পেরিয়ে বিষণ্ণ দরবারী কানাড়া

যখন সারেঙ্গীর তার ছুঁয়ে শেষ রাতে ললিতের সন্ধানে বেরোতো    

বার বার, কতবার তারাদের ভিড়ে তন্ন তন্ন খুঁজেছি তোমায় |

যদি একবার অগোচরে খসে পড়ে অভিমানের ওড়না, ভোর রাতে 

ঘুম ভেঙে চাঁদের আলোয় যদি করি স্নান, আলোর চন্দনে 

সেজে ওঠা তোমার মুখ কাছ থেকে দেখবো একবার, প্রতিবার 

তুমি দেবে অঞ্জলি, আমি শুধু দেখবো তোমায়, ফিরে এসো একবার |      

        

© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ৩০.০৯.২০২২

   

  


|| আমার শহর, তোমার শহর ||

            

আমার শহর, তোমার শহর, প্রাণের শহর, একলা শহর,

আলোর শহর, অবাক শহর, বেবাক শহর, একলা শহর,

গানের শহর, টানের শহর, মানের শহর, একলা শহর, 

রবির শহর, রাতের শহর, তারার শহর, একলার শহর, 

পুজোর শহর, প্রেমের শহর, ক্ষোভের শহর, এই শহর,

আমার শহর, তোমার শহর, প্রাণের শহর, একলা শহর |


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ৩০.০৯.২০২২