বৃহস্পতিবার, ১৬ জুন, ২০২২

অনন্যা, তোমায়

 আগে বুঝিনি তুমি এতো সুন্দর |

স্যাঁতসেতে শহরের নীল আলোয়
তোমার কপালে ঝাঁপিয়ে এক গুচ্ছ স্বপ্ন,
ইচ্ছে হয় আলতো করে সরিয়ে দি;
না থাক, ওদের ভাগে ভাগ বসাবো না |
তোমার গালের টোল আগলে যে তিল টা
পাহারা দেয় মিষ্টি হাসি টাকে,
মন চায় ঠিক ওখানেই বাসা বাঁধি গোপনে |
আবার ভাবি কুচুটে ওই তিলের খুনসুঁটিই
তোমার্ হাসিকে করেছে দীপ্ত, তোমাকে অনন্যা |
মসৃন পিঠ বেয়ে নামা চুলের ঝর্ণায়
অসংযত মন আগল খুলে যখন বেসামাল,
তখন খুব ঈর্ষা হয় তোমার্ চুলের উপর;
তবু কত সন্ধ্যা কেটেছে তোমার চুলের গন্ধে
মৌতাত করে, নেশার আবেশে, ভালোবেসে |
সম্মোহনের মৃদু উন্মেষে ভিজে যাওয়া
আমার মন, তোমার প্রত্যাশায় উতলা নিরন্তর;
তোমার অধরের কানায় চলকে যাওয়া সুধার
নেশায় বুঁদ, আমি অবিরাম রাত-ভোর
আগে বুঝিনি তুই এতো সুন্দর |
সোনালী জ্যোৎসনা ফিকে তোমার ছটায়,
তোমার মুখের আদল পায়নি চাঁদ
অনুপমা প্রকৃতির চক্ষুশূল তুমি
তবু ওরা তোমায় পাবে না,
তুমি যে পেয়েছো নদী, নদীর পথ |
আগে বুঝিনি তুমি এতো সুন্দর |

© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ | ১৬.০৬.২০২২

শুক্রবার, ৩ জুন, ২০২২

অধিকার

শাপলায় জন্মা শামুক ভাবে 
শাপলায় অধিকার তার, 
উচ্ছিষ্টে পুষ্ট শরীর ভাবে
উচ্ছিষ্টে দাবি শুধু তার |

মাঝি ভাবে তরী-নদ  
চাষি ভাবে জমি তার
আমি শুধু ভেবে মরি
আদপে অধিকার কার ?   

বিহগের দাবি আকাশ নীল    
তরু বোঝে মৃত্তিকায় স্বত্ব তার,,  
আগাছার দাবি উর্বর বনবীথি  
মন বলে ভালোবাসায় হক তার |
 
খালি হাতে আসা-যাওয়া, শেষে  
অনন্ত শূন্যতাই পরিণতি যার    
কি হেতু মিথ্যে দাবি নিরন্তর ?   
কিসের তবে এই অধিকার ?

© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ

ফাটল

খেলা ভাঙার ঘন্টা বাজতেই 

ছাদের কার্নিশ বেয়ে ঝুপ করে 

নেমে আসা অন্ধকারে জবুথবু  

দু হাঁটুর খাঁজে আশ্রয় তল্লাশে

নিরর্থ যন্ত্রনা মুঠো কান্নায় ভিজে  

পলেস্তারা খসা বিশ্রী দেয়ালের 

কোনে জানালার ঘষা কাঁচের

ফাটলের গ্লানি কলুষিত মর্যাদা 

নখে খুঁটে সাফ করার মূঢ়তা  

বওয়ার দায় বর্তায় যার কাঁধে 

তার আসা যাওয়া ফিরে চাওয়া 

বিনি সুতোয় বাঁধা সম্পর্কের  

ছিঁড়ে যাওয়া পীড়া ধমনীর 

গুমটি গলিতে কুরে কুরে 

দগদগে ক্ষত চিরে কালচে 

রক্তের প্রবাহ তৃষ্ণা মেটায় 

কোন প্রাণে, কোন খানে, কে জানে ?     


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ

বেইমান

খবর দিলে বৃষ্টি হবে 
আকাশ ভেঙে অনাসৃষ্টি হবে, 
রবির জেদে রুষ্ট আকাশ 
সলিল স্পর্শে তুষ্ট হবে,
আজ নাকি কেবল বৃষ্টি হবে |

সকাল থেকে মেঘের গুমর  
নীরদ দর্পে আকাশ কাঁপে,  
অধীর ত্রাসে স্তব্ধ বাতাস 
জমাট ব্যাথার মুক্তি হবে,  
আজ নাকি ভরা বৃষ্টি হবে | 

গুমোট অভিমানের কলস  
উপচে হৃদয় শূন্য হবে,    
বিরহ রাগে সিক্ত হয়ে 
সকল অহং নিঃস্ব হবে, 
আজ নাকি দারুন বৃষ্টি হবে |

কথার খেলাপ তবে কেন 
শুষ্ক মাটি ক্লিষ্ট যেন 
বলেছিলে যে বৃষ্টি হবে 
শুচি নুতন দৃষ্টি হবে, 
আগমনের প্রহর গোনা 
প্রতীক্ষায় স্বপ্ন বোনা, 
সবই কি বেইমানি তবে, 
বললে যে বড় বৃষ্টি হবে ?
কোমল অনুরাগের সৃষ্টি হবে ? 

© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ

ভাঙ্গন

 চাঁদের আদলে কি মুখ হয়,

বা ব্যাথার জঠরে সুখ ?  

অন্ধকারের কি কিরণ হয়,

বা প্রেমের কোটরে দুখ ?


গোপনে দানা বাঁধা অন্ধকার 

কখনো করে কি ঝলমল?

কাঁটার মুকুট কি হয়ে ওঠে  

কখনো মসলিন মখমল ? 


সব প্রশ্নের কি জবাব হয় ? 

নাকি সব পরীক্ষাই সোজা ?

অনির্দিষ্টের নির্দিষ্ট চাইতে চাওয়া 

কতটা সরল সে উত্তর খোঁজা ?


সব জেনেও অবুঝ তুমি,

প্রশ্নের জোয়ারে তোলপাড় |  

ঝড় সে শুধুই ভাঙতে জানে,. 

ভাঙে চৌকাঠ, ভাঙে নদীর পাড় |


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ

দেহাবশেষ

এই শহর যেন অজানা, ক্রমশ নিরুত্তাপ 
বিষন্ন আবেশে ঘন রাত্রির দীর্ঘশ্বাস | 

এতো ভিড়েও একলা আমি খুঁজে ফিরি    
নিঃস্ব নগরীর নিত্য নূতন পৌষ মাস |

পোড়া আকাশে কালো আবিরের টিলা,  
খেচরের দেহ শব ঝলসানো বেবাক |   

বেহুদা আকুতি শিয়রে আছড়ে দেদার  
নিকষ শামিয়ানায় মোড়া মহল্লা নির্বাক | 

চোখে মরুভূমি, দিশাহীন শীৎকারে 
খুঁজে ফেরে চেনা মুখ পরিজন | 

বুকে জ্বালা অবিরাম, সস্তা বিনোদনে  
ঢাকা ক্ষত কত, চুরমার ভীরু মন |  
 
চেনা গলি অচেনা অকস্মাৎ, ফাটলের 
গা বেয়ে নামে আগাছার অভিশাপ |

তীক্ষ্ণ আঘাতে বিবস্ত্র নিষ্প্রাণ ভালোবাসার     
রুদ্ধ আর্তনাদে লালিত ক্ষীণ অনুতাপ | 

দূষিত শহর সংকোচে ভীরু নিস্তাপ, 
আমার শহর যেন ক্রমশ অজানা, নিরুত্তাপ | 

© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ

অকপট আমি

বাবা - "সর্বদা চাদরের দৈর্ঘ্য বুঝে পা লম্বা করবে |"
আমি - "অযথা স্বল্প দৈর্ঘ্যের চাদর কিনে অর্থ অপচয় করতে যাবো কেন ?"

মা - "নিজের সীমা কখনো লঙ্ঘন করবে না |"
আমি - "সেই সীমার ওপারে যদি মোক্ষ থাকে ?"

ঠাকুরদা - "বড়দের সর্বদা শ্রদ্ধা করবে |"
আমি - "তো সেই বয়জ্যেষ্ঠ যদি ধর্ষক হন ?" 

ঠাকুমা - "বড়দের মুখে মুখে কথা বলবে না |"
আমি - "তোমার সম্বন্ধে কুৎসিত কথা বললেও না ?"

দাদু - "জীবনে অর্থ সব নয়, সততা আর সেবাই আসল |"
আমি - "ঠিক | ছোটু গোয়ালাকেও এটা বোঝানো দরকার, তাহলে দুধটা একটু ঘন পাওয়া যায় |"

দিদা - "সব সময় নিয়ন মেনে চলবে, নিষ্ঠাবান হবে |"
আমি - "নিয়ম ভাঙার খেলাই যে আমার সবচেয়ে প্রিয়, আমি নিষ্ঠাভরেই নিয়ম ভেঙে থাকি |" 

মামা - "জীবনে একটা লক্ষ্য থাকা দরকার |"
আমি - "একদম | আমি স্মশানে গিয়ে এটা অনুভব করেছি |"

মামী - "তোর কি লজ্জা বলে কিছু নেই |"
আমি - "ছিল | বান্ধবীর কাছে লজ্জার বিনিময়েই তো ধার করে এসেছি এতদিন | এখন শেষ |"  

কাকা - "সবসময় বিপদ নিয়ে খেলবি না | অযথা অন্যের সমস্যার সমাধান করতে ঝামেলায় জড়াবি না |"
আমি - "ভাগ্যিস ক্ষুদিরাম, প্রফুল্য চাকি, ভগত সিংহ, সুভাষ বোসদের তোমার মতো কাকা ছিলোনা |"  

কাকী - "কি সাংঘাতিক ছেলে রে বাবা, মরণ হয় না ?" 
আমি - "কেন হবেনা ? কিন্তু আমি মরে গেলে কাকার পয়সার থলি থেকে আধুলি চুরি করে শীতের দুপুরে তোমায় আলু-কাবলি খাওয়াবে কে ?"

প্রেমিকা - "শ্রীতমার বয় ফ্রেন্ডকে দেখেছো, কেমন পোষেণজিৎ পানা মুখ, কান চাপা চুল আর বাম পাছার পকেটে মোটা মানি ব্যাগ ?"
আমি - "দেখেছি, ভাবছি এবার থেকে ওর সাথেই প্রেম করব | এখন তো ওটা বৈধ - মানে ইয়ে টা ... "  


বুধবারের আড্ডা 2022 | ©ভাস্কর ভট্টাচার্য 

ন্যায্য, অন্যায্য, জীবন ও সূর্য্যপুত্র কর্ণ !

মহাভারতে, সুতপুত্র দানবীর কর্ণ একবার শ্রী কৃষ্ণকে প্রশ্ন করেছিলেন - 
"হে দেবকী নন্দন, আমার নিজের মা আমাকে আমার জন্মের মুহূর্তে পরিত্যাগ করেছিলেন - এই ধরণীতে আমার প্রবেশ একজন অবৈধ সন্তান হিসেবে হয়েছিল, এটা কি আমার অপরাধ ?
"মহাগুরু দ্রোণাচার্য আমাকে শিষ্য হিসেবে গ্রহণ করতে অস্বীকার করেন, যেহেতু আমি আমার ক্ষত্রিয় পরিচয়ের প্রমান দিতে পারিনি |  
"পরশুরাম আমাকে দুর্দান্ত প্রশিক্ষণ দিলেন বটে, কিন্তু যখন জানতে পারলেন যে আমি কুন্তী পুত্র এবং একজন ক্ষত্রিয়, তখন তিনি আমাকে মারাত্মক অভিসম্পাত দিলেন | বললেন আমার পরিচিতি হবে মহা পরাক্রমী বলেই | কিন্তু চূড়ান্ত দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও, অত্যন্ত্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সংকটপূর্ণ মুহূর্তে আমার স্মৃতি বিলোপ ঘটবে এবং ওনার কাছে পাওয়া শিক্ষার প্রয়োগ করতে আমি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবো |
"এক ব্রাহ্মণের গাভীকে ভুল বশত তীর বিদ্ধ করে, অকারণে তার অধিকারীর অভিশাপ কুড়িয়েছি |
"দ্রৌপদীর স্বয়ম্বরে যে চূড়ান্ত অপমানিত হয়েছি. তাও তোমার অজানা নয়|
"এমনকি, মাতা কুন্তীও আমাকে চরম সত্যটা বর্ণন করলেন খানিকটা বাধ্যই হয়েই, তার অন্য সন্তানদের আমার পরাক্রম থেকেই বাঁচানোর জন্য | 
"আমার যা কিছু প্রাপ্তি, যেটুকু সম্মান, সবটাই দুর্যোধনের কৃপায়, কৌরবদের বদান্যতায় |
"সেক্ষেত্রে আমার কৌরবদের পক্ষ নেওয়াটা কেনই বা অন্যায় বা অনৈতিক বলে গণ্য করা হবে ?"

মধুসূদন জবাব দিলেন -
"কর্ণ, আমার জন্ম কিন্তু কারাগৃহে |
"আমার জন্মের আগে থেকেই মৃত্যু আমার জন্য ওঁৎ পেতে ছিল |
"আমার জন্মের রাতেই জন্মদাতা এবং জন্মদাত্রীর সাথে আমার বিচ্ছেদ ঘটে যায় |
"শৈশব থেকেই আমি তরবারি, অশ্ব, ধনুক আর তীরের আস্ফালন আর ঝনঝনানী শুনে বড়ো হয়েছি |
"হাঁটতে শেখার আগেই আমার প্রাপ্তি গোশালা, গো বিষ্ঠা, বারংবার হত্যার চক্রান্ত এবং ক্রমাগত জীবন সংশয় |
"না কোনো সেনা-সামন্ত না কোনোরকম প্রথাগত শিক্ষা | প্রতি নিয়ত শুনতে হয়েছে যে আমার কাছের মানুষদের দুঃখ, দুর্দশা এবং দুর্ভোগের কারণ আমিই |
"যখন তোমাদের মতো বীরেরা জ্ঞান, শৌর্য্য আর পরাক্রমের কল্যানে নিজ নিজ গুরুর কাছে বাহবা এবং প্রজাদের সম্ভ্রম ও আনুগত্য কুড়োচ্ছ, আমি তখন একজন উদাসীন অশিক্ষিত বালক হিসেবে এক কোনে বেড়ে উঠছি | ষোলো বৎসর বয়সে প্রথম ঋষি সন্দীপনীর গুরুকুলে স্থান পেলাম | ততদিনে তোমাদের খ্যাতির ছটায় সমগ্র ধরাতল আলোকিত | 
"তুমি তোমার প্রিয়তমার পাণিপ্রার্থী হয়েছো, বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছো | আমি কিন্তু আমার ভালোবাসার মানুষটিকে পাইনি | বরঞ্চ তাদের সাথেই আমার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছে যারা হয় আমাকে চেয়েছে বা যাদের আমি দৈত্য-পিশাচদের অত্যাচার থেকে বাঁচিয়েছি |   
"ক্রূর ও নিষ্ঠুর জরাসন্ধের হাত থেকে বাঁচাতে এবং সকলের শুভ স্বার্থে আমি আমার সম্পূর্ণ সম্প্রদায়কে যমুনার তীর থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে সুদূর সমদ্রু উপকূলে প্রতিস্থাপন করতে বাধ্য হয়েছি | অথচ, যাদের রক্ষার স্বার্থে এই কর্ম, তারা কিন্তু আমাকে ভুল বুঝেছে - ভীরু এবং কাপুরুষ হিসেবে দোষারোপ করেছে |  
"দুর্যোধন জয়ী হলে বহু কৃতিত্ব জুটবে তোমার ভাগ্যে | তা হওয়াই স্বাভাবিক এবং উচিত | কিন্তু যদি ধর্মরাজ জয়ী হন ? আমার কপালে তো তখন শুধুই নিন্দা আর দোষারোপ - এই বিরাট যুদ্ধের স্রস্টা আর ধ্বংসের রচয়িতা বলে | 
"একটা কথা মনে রেখো কৌন্তেয়, সমস্যা আর যন্ত্রনা সকলের জীবনেই থাকে |
"কারো জীবন চিরকাল ন্যায্য, সহজ বা সরল নয় |    
"তবে বিবেকের কাছে ন্যায় আর অন্যায় সর্বদা স্পষ্ট |
"যতবার অন্যায় হয়েছে, যতবার অসত্যের মুখোমুখি হয়েছি, অপদস্থ হয়েছি, নিন্দিত হয়েছি, লাঞ্ছিত হয়েছি, ধরায় পতিত হয়েছি - সেই মুহূর্তে কিভাবে প্রতিক্রিয়া দিতে চেয়েছি এবং পেরেছি, সেটাই পরম সত্য |  
"জীবনের অনায্যতা, অযৌক্তিকতা কখনোই অনৈতিক পথে হাঁটার কারণ হতে পারেনা |" 


শুক্রবারের আড্ডা 2022 | ©ভাস্কর ভট্টাচার্য

ভীরু

যেতে চাইলেই কি যাওয়া যায় ?

ছুটি চাইলেই কি পাওয়া যায় ?


ছাদে ফুটে থাকা চন্দ্রমল্লিকাগুলি  

আঁচলের খুঁটে বাঁধা অচল আধুলি, 

বিছানার সাদা চাদরে চায়ের দাগ 

বাড়ির মেনি টার কপট রাগ,

মেঝেতে শুকনো নখ পালিশ

বহু বাতুলতায় বিপর্যস্ত পাশ বালিশ,

ঘুলঘুলিতে কচি মাকড়সার উঁকি ঝুঁকি

কড়িকাঠে সংসার পাতা ভীতু টিকটিকি,  

কূয়োর পাশে আগাছায় ঠাসা জঙ্গল  

আমের লোভে ছুটে আসা শিশুর দঙ্গল, 

শরতের ভোরে বাজা আলোর বেনু 

হাওয়ায় পাখনা মেলা পরাগ পুষ্পরেণু 

নিবিড় অযত্নে লালিত ছেঁড়া কার্পেট

বিষণ্ণ মরচে ধরা স্থবির গেট,  

ফটকে আছড়ে পড়া গাজনের গান 

অক্লেশে বেড়ে ওঠা তুলসীর প্রাণ,   

আঁকা বাঁকা কর্কশ মোরাম রাস্তা   

সরু সুতোয় ঝোলা ভীরু আস্থা, 

এসব ছেড়ে কি সহসা যাওয়া যায় ?


আচ্ছা, যেতে চাইলেই কি যাওয়া যায় ?

ছুটি চাইলেই কি পাওয়া যায় ?


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ

মূঢ়

 তুমি বললে গন্ড মূর্খ  

আমি বললাম জানি, 

তুমি বললে মস্ত বোকা 

আমি বললাম মানি | 


তোমার চাই তূর্য্য ঢাল 

আমার আছে মন টা,

তুমি বললে সময় কই  

তোমায় দিই কোনটা ?


তোমার খেলার সঙ্গী কত 

তোমার কত কাজ, 

আমার কেবল অঢেল সময় 

জিরান সকাল সাঁঝ |  


তুমি ওড়ো মহাকাশে 

আমার মেঠো পথ, 

আমার পা ধুলোয় ধূসর 

তোমার রঙ্গীন রথ | 


তোমার যীশু রবীন্দ্রনাথ 

আমার সুনীল-শক্তি, 

তোমার ঘৃণা আমার কিরীট 

হেরেও আমার মুক্তি |


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ

আগুন ফাগুন

তোমার জন্য কাশবনে আজ অকাল বোধন, 

আউল বাউল কন্ঠী ধারীর উদার গান; 

তোমার জন্য হটাৎ বাঁচার খুব তাগিদ, 

তোমার কথায় গভীর প্রেমের লাল নিশান | 


তোমার নিটোল চিবুক ছুঁয়ে দীর্ঘ রাত, 

তোমার জন্য বেলপাহাড়ীর মাদল বাজে; 

তোমার জন্য শীতের ভোরে উষ্ণ আবেগ, 

তোমার জন্য মন লাগে না আজ কাজে |


তোমার জন্য ভ্রমর ভাঙে সব বাঁধা,

তোমার জন্য সন্ধ্যাকাশে কলকা জরি ;   

তোমার জন্য হাসনুহানা রাত বিরেতে,

তোমার জন্য আল্পনা দেয় সাত পরী |


তোমার চোখের আদুল পাতায় স্বপ্ন নীল,  

তোমার বুকের নরম জগৎ টালমাটাল;  

তোমার প্রেমে সব অজুহাত লুটোয় ধুলোয়,   

দিনের শেষে সর্বনাশের রং মশাল |


সর্বনাশের আকর্ষণেই নবীন দিন,

আগুন ফাগুন ভোরের টানে নতুন গান;

তোমার জন্য শ্যাওলা সবুজ নরম ঠোঁট, 

এক পশলা কান্না শেষে নতুন প্রাণ |


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ

দেশ রাগ

এমনও সময় আসে,

তানপুরা নিজ সুর বাঁধে অবকাশে 

দেশ রাগে গাল বেয়ে সন্ধ্যা নামে অগোচরে  

আহ্নিক শেষে, দুরু দুরু বুকে বধূ  

থিরি থিরি কাঁপে কোন অজানা ত্রাসে,   

এমনও সময় আসে |


প্রণয়ের প্রথম বসন্তে মিলেছিল

আঁখি, মন তারই সাথে  

শিউলির ঘ্রানে, শিশিরের উচাটনে

বিবর্ণ সিঁথি রক্তিম সহসা, ধূমায়িত

উষ্ণ আবেগে ভাসে,

এমনও সময় আসে |


ক্ষমাহীন যুদ্ধ, বোঝেনি সে প্রেম

বাকি থাকা কথা, কিছু পিছুটান   

ভাঙে কত ঘর, নির্বাক অভিমান      

রাজা বলে দেশ বড়ো, মন বলে ঘর  

খসে সব আভরণ, ডোবে শেষ চর 

আসে বার্তা দূরভাষে, এমনও সময় আসে |


বিবর্ণ সিঁথি মরে মাথা কুটে

অভাগা শয্যা রিক্ত হাহাকারে     

নিবিড় আশ্লেষ, কত কথা, আশ্বাস

অবুঝ অন্তর খোঁজে আশ্রয় অন্ধকারে  

ধূসর প্রেম করুন স্মৃতি বয়ে ভাসে

এমনও সময় আসে |


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ

মেটাভার্স - মধুপোকা নাকি চরৈবতি, চরৈবতি ?

এবার থেকে নাকি সব্বাইকে মেটাভার্সেই বসবাস করতে হবে | অন্তত এমনই নিদান দিয়েছেন উত্তরাধুনিক সময়কালের পোস্টার বয় শ্রীযুক্ত মার্ক ইলিয়ট জুকেরবার্গ | আনন্দ মাহিন্দ্রার সাম্প্রতিক উচ্ছসিত টুইট সেই দাবির পক্ষেই সওয়াল করেছে | তা সে আর এমন কি কাজ ? পাঁচ দশক এই উনিভার্সে বেশ কাটলো, আর বাকি কয়েকটা দশক না হয় অন্য কোনো একটা ভার্সে পরিবার-আত্মীয়-সন্ততি নিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দেওয়া যাবে | 

তবে ছোটবেলা থেকেই খুঁতখুঁতে, অকারণে সন্দিহান তথা দ্বিধাগ্রস্ত বলে আত্মীয়কুলে আমার যথেষ্ট সুনাম | কয়েকটা প্রশ্ন মাথার মধ্যে ভন ভন করছে | না না, ভাববেন না ভয় পেয়ে গেছি বা বিকল্প খুঁজছি | শুধু পাঠককুলের কাছে আমার বিনীত নিবেদন, তারা যেন মহানুভব শ্রী জুকেরবার্গ বাবাজীর সাথে কথা বলে আমার কৌতুহল টুকু নিরসন করে দেন | আমার ক্রমশঃ স্ফীত হতে থাকা মাথায় এই প্রসঙ্গে প্রশ্নের সংখ্যা মাত্র নয় লক্ষ্য তেতাল্লিশ হাজার সাতশো ছিয়াশি টি | তবে আমি অর্বাচীন নই - কাজেই এটা বুঝি, যে আলোচনার এই স্বল্প পরিসরে একইসাথে সবকটির সুরাহা হওয়া শুধু "মুশকিল" নয়, "না মুমকিনও" বটে | কাজেই বাছাই করা তিনখানির প্রতি আম জনতার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি আপাতত ?    

১. ছোটবেলায় সুপার হিরো হওয়ার মারাত্মক ইচ্ছে ছিল - জোর দিয়ে বলতে পারবো না যে সেই ইচ্ছেটা এখন পোড়া বেল কাঠ হয়ে গেছে | পিঠে বাঁধা লাল টেবিলক্লথ, চোস্ত পাজামার সাথে সুপারম্যানের ছবি ছাপা ছোট ম্যাগি-হাতা গেঞ্জি, মাথায় মা'র লাল রঙের চুল বাঁধার ফিতের ফেটটি আর দাদুর রেক্সিনের পা-ঢাকা জুতো | তৈরী হয়ে যখন বাড়ির সবেধন নীলমনি আয়না লাগানো বড়ো কাঠের আলমারিটার সামনে দাঁড়াতাম, তখন শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলা করতো | তারপর আর কি ? কল্পনাশক্তির গনগনে আগুনে হাওয়া দিয়ে কত যে খারাপ লোক যে লোপাট করেছি তার ইয়ত্তা নেই | সে যাই হোক | মোদ্দা কথা, জানতে চাই যে মেটাভার্সে কি সুপারহিরো হওয়ার সম্ভাবনাটা বহাল থাকবে ? শুনেছি ওখানে নাকি আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স নামক জাদু কাঠি থাকবে | তারই কল্যানে কিছুই অসম্ভব নয় বলেই শুনছি | তাহলে কি ... ?

২. আমার আবার আটচালার ঘরে থেকে কোটি টাকার স্বপ্ন ছেলেবেলা থেকেই | শুনলুম মেটাভার্সে নাকি উপার্জনের উপায় প্রচুর | কোনোদিন যে নিজের জুতোর ফিতেটাও ঠিক মতো বাঁধতে পারেনি সেও নাকি ডিজিটাল এন্ট্রেপ্রেনিওর হয়ে কোটি কোটি টাকা, থুড়ি, কি যেন এনএফটি নামক ছাই পাশ কামাই করতে পারবে | তা সে হতেই পারে | বাবা বলতেন কলকাতার রাস্তায় নাকি লক্ষ লক্ষ টাকা উড়ে বেড়ায় - পাকড়াতে জানতে হয় | আমি অবশ্য পরবর্তীকালে কলকাতার বিভিন্ন রাস্তায় উড়তে থাকা টাকার সন্ধান করেছি | যাক, সে অন্য প্রসঙ্গ | এখানে প্রশ্ন হচ্ছে মেটাভার্সেও কি সেরকম কিছু মুদ্রা-টুদ্রা উড়ে বা ভেসে টেসে বেড়ায় নাকি ? তো, সেক্ষেত্রে ওসব সাপ্টানোর প্রশিক্ষণও কি মার্কের লোক জনই দেবেন ? আচ্ছা সে না হয় হলো, কিন্তু দুষ্টু সরকারগুলো থেকে বাঁচাতে আমার বাড়ির তোষক, বালিশ আর লেপের মধ্যে চালান করা টাকা গুলোর কি হবে? ওগুলো কি ...? 

৩. শিব ঠাকুরের আপন দেশে নিয়ম কানুন সর্বনেশে - সে তো সবারই মোটামুটি জানা | মেটাভার্সেও কি সেরকম কিছু ‘আবোল-তাবোল’ আইন কানুনের চক্কর আছে নাকি ? সেরকম কিছু হলে কিন্তু সর্বনাশ | আমি বাবা গুটখার রস টস গিলতে টিল্টে পারবো না | 'লঘু শঙ্কার' ক্ষেত্রে কি হবে ? দেওয়ালে যতক্ষণ না, ইয়ে, মানে, নিখুঁত মানচিত্র আঁকতে পারছি, ততক্ষন তো বারি ত্যাগের আসল আনন্দটাই পাই না | তাছাড়া সিগন্যাল এদেশেও মানিনা, ওখানেও মানতে পারবো না বাপু ? আগে থাকতেই বলে দিলুম | আচ্ছা মেটাভার্সে ঘুষ-টুশ চলে তো ? ঘুষ না দিলে আমার আবার পিলেতে ভয়ানক বেদনা হয় আর ঘুষ না নিলে বুকের ভিতর হাঁপরের দাপাদাপি | এটা বলছিনা যে অরণ্যদেবের মতো প্যান্টের উপর অন্তর্বাস পরে ইদিক ওদিক ঘুরে বেড়াবো, তবে ওসব ঠুন্কো শালীনতা ফালিনতা আবার ঘাড়ের উপর চাপিয়ে দেওয়া হবে না তো ? তাহলে কিন্তু ...  

যাক, এবার পাঠককুল চট করে মার্কএর সাথে আলোচনা করে আমার কৌতূহল নিরসনের ব্যবস্থা করলে উপকৃত হই | ওই যে বললাম, প্রশ্ন অনেক | যেমন ধরুন, রোমান্স আর যৌনতা মেটাভার্সে  কি ভাবে হবে ? চুম্বনটাও কি ভার্চুয়ালি করতে হবে, নাকি একটু খরচ টরচ করলে, ইয়ে, মানে ... থাক | আচ্ছা, ইহ জগতের (থুড়ি এই ইউনিভার্সএ) ব্যবহৃত নিজ গোত্রই কি ব্যবহার করা যাবে ? আর মেটাভার্স যাওয়ার পথে কি কিছু গুড়-মুড়ি-ছোলা বেঁধে নেওয়া দরকার, নাকি রাস্তায় হকার-টকার যথেষ্ট পাওয়া যাবে ? আমি কিন্তু ভায়া ভাজা বাদামটাই পছন্দ করি - কাঁচা বাদাম খেলে আবার বড্ড চোঁয়া ঢেকুর ওঠে |      

আসলে শিবরাম যে নেই | থাকলে আপনাদের জ্বালাতন করতাম না | আমি নিশ্চিত উনি থাকলে আমি আমার সব প্রশ্নের উপযুক্ত এবং যথাযত জবাব পেয়ে যেতাম | নারায়ণ তো অনেক আগেই ফিরে গিয়েছেন | তাছাড়া সঞ্জীবও এখন রামকৃষ্ণে মন এবং কলম সপেঁছেন | কাজেই আপনারাই আমার শেষ ভরসা, পাঠক গণ |


রবিবারের আড্ডা 2022 | ©ভাস্কর ভট্টাচার্য 

নিজ বাসা

দিনশেষে পসরা গুটিয়ে বণিক্ 

দিগন্তে শায়িত গোধূলির আবছায়ারা, 

নগদের হিসেব মেলা অবধি 

ছেঁদো ছুতো ভেঙেচুরে দিশেহারা |


দীর্ঘ ছায়াপথ নিমেষে নিঃশেষ

ক্ষীণ আলোক উৎস হাতছানি, 

সুচারু চেতনা ক্রমশ ক্ষীণ  

শ্রবণে থরথর মঞ্জীরধ্বনি |


ঝরে পাতা, কিছু সম্পর্ক 

সন্তান সন্ততি আত্মীয় পরিজন, 

দড়িদড়া ছেঁড়া স্বপ্ন মলিন  

অনন্ত আনন্দে বিলীন প্রাণমন |


বহু ব্যবহারে জীর্ণ ডানা 

বাতাসের সাথে বহুকাল আড়ি, 

অখণ্ড অবসরে শ্রান্ত আঁখি,  

দীর্ঘ ছুটি, অবশেষে নিজ বাড়ি |  


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ |