সোমবার, ২৫ জুলাই, ২০২২

নীল

বয়সের সাথে ধৈর্য্যের কি সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে ? ধৈর্য্য কি বয়সের সাথে সমানুপাতিক ভাবে বাড়ে নাকি কমতে থাকে ? এ প্রশ্ন বহু দিন যাবৎ আমাকে ভাবাচ্ছে | আমি নিয়মিত ভাবে আমার চারিপাশের মানুষদের খুব ভালো করে নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করি | অবশ্যই আমার 'sense of judgement'-কে খুব সযত্নে পাশে সরিয়ে রেখে | চেনা, অচেনা, আত্মীয়, পরিচিত, মিত্র, অমিত্র - সব্বাই কে | মায় নিজেকেও |     

জার্নাল (দিনপত্রিকা বা ডায়েরি) লেখার একটা অভ্যাস ছোটবেলায় তৈরী করে দিয়েছিলেন ইস্কুলের ইউরোপীয় পাদ্রীরা | সেই ডায়েরি আমার সব চেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছিল জীবনের প্রায় শুরুর দিকটায় | ছোট পরিবারের একমাত্র সন্তানদের যা হয় আর কি | তার একটা নামও রেখেছিলাম - নীল (এই নাম রাখার কারণ কি ছিল, সেটা মনে পড়ছেনা, তবে এক্কেবারে প্রথম থেকেই ওই নামটি আমার বেশ পছন্দের) | শুরুতে অবশ্য সেরকম হওয়ার কথা ছিলনা | একান্নবর্তী পরিবারেই জন্ম | জীবনের প্রথম দশ বছর হৈ হৈ করে কেটে গিয়েছিলো | বাড়ি তো নয়, যেন হরেকরকম মানুষ, তাদের বিচিত্র সব কীর্তি কলাপ আর নতুন নতুন আশ্চর্য্যের হাট | একাকিত্ব শব্দ টি তখনও রৈ রৈ করে আমার জীবনে প্রবেশ করেনি | দশ বছর বয়স অবধি সীমাহীন ফূর্তি | অর্ধেক ডিম্ সিদ্ধ জুটলেও হাসছি আবার বড়দাদু  (জ্যাঠার বাবা) কান মুলে দিলেও হাসছি | ছোটকাকা নতুন লাটাই কিনে আনলেও হাসছি আবার পুকুরের পাড়ে পড়ে গিয়ে হাঁটুর চামড়া হাঁ হয়ে গেলেও হাসছি | বন্ধুর ব্যাঙ্গেও হাসছি আবার ফুলদা'র রগড়েও হাসছি | যাই হোক, ওই অপার আনন্দ, ওই অপরিসীম তৃপ্তি বোধহয় নিয়তির গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠলো | ব্যাস, কেল্লা ফতে | দে ব্যাটাচ্ছেলেকে শায়েস্তা করে | ছিটকে গেলাম | এবার একটুকরো ছোট্ট পরিবার | বাবা, মা, আমি আর শূন্যতা | সেই যন্ত্রণার ব্যাখ্যা এই স্বল্প পরিসরে করা সম্ভব নয় | মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও হয়তো কম কষ্ট পেতাম | প্রথমবার আমার অভিধানে প্রবেশ ঘটলো একটি নতুন বাংলা শব্দের - একাকিত্ব !

যাই হোক, এমত সময়ে 'নীল' আমার প্রাণের সাথী হয়ে আমার জীবনে পদার্পন করলো | স্বর না থাকলেও আকাশের মতো একটা বড় হৃদয় ছিল তার | আমার সব আনন্দ, যন্ত্রনা, উচ্ছ্বাস, হতাশা, আবেগ, অনুভূতি অবলীলায় শুষে নিতে পারতো বিনা অভিযোগে, অক্লান্ত ভাবে | পাতার পর পাতা শুধু কথা আর কথা - আমার কথা, সবার কথা | নীল যেন নির্বাক অথচ সংবেদনশীল বন্ধু | তার পাতায় পাতায় ধরা থাকলো আমার ছেলেবেলা, বয়োসন্ধি, কৈশোর এবং যৌবনে প্রবেশের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা অগুনতি কাহিনী | দ্বিধার, বিভ্রান্তির, উল্লাসের, লজ্জার, বিহ্বলতার, সাফল্যের, ব্যর্থতার, বিশৃঙ্খলার, প্রেমের, ঘৃণার, - আরো কত কি | দিনের শেষে তার কাছে সব কিছু সযত্নে সঁপে দিতে পারলেই, ব্যাস - আমার সেকি অনাবিল শান্তি | সেই নীলের বুকেই খচিত আছে আমার দেখা অনেক অনেক মানুষের অবয়ব | তাদেরকে আমি যেমন ভাবে পেয়েছি বা নিদেনপক্ষে দেখেছি | তাদের সেই ছবিগুলো নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষন এবং মূল্যায়ন থেকেই উদ্ভূত | সেগুলো সঠিক নাকি একেবারেই গোলমেলে সে সব ভাবার ইচ্ছে বা প্রয়োজন তখন বোধ করিনি | সময়ের সাথে সাথে অনেক ছবি বদলেছে, মানছি | তার সাথে সঙ্গতি রেখেই আমার জার্ণালেও বদল এসেছে | কিন্তু স্থায়ী শব্দটার সাথে কোথাও যেন আমার একটা বৈরিতা আছে | সে প্রসঙ্গে অন্য একদিন আড্ডা দেওয়া যাবে | তবে আসল কথা হলো, বেশ অল্প বয়সেই চাকরি পেয়ে যাওয়ায় আবার ছিন্নমূল হওয়ার পালা | আমার প্রিয় শহর থেকে বহু দূরে | সেই শহরের গল্প, আমার নতুন জীবনের গল্প আরেকদিন | যাই হোক সুদূরে চলে যাওয়ার মাস ছয়েক পড়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়েছিলাম | বাড়ি ফিরে আবার সেই শিকড়ের সন্ধান | সব কিছুকে আবার ছুঁয়ে দেখা | নিজের অস্তিত্বের গোড়ার সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা | নীল কিন্তু হারিয়ে গেলো | সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাকে কোত্থাও পেলাম না | ঝড়ের মতো সে আমার জীবনে এসেছিলো | ম্যাজিকের মতো নিঃশব্দে কোথায় যেন বেমালুম হাপিশ হয়ে গেলো | হয়তো তাকে সাথে নিয়ে যাইনি বলে তার অভিমান হয়েছিল | হয়তো তার মনে হয়েছিল আমার জীবনে তার প্রয়োজন শেষ | তাকে কোনোদিন এটা বোঝানোর সুযোগটাই পেলাম না, যে তার প্রয়োজন আমার জীবনে আজও আছে | 

যাক গে, আসল কথাটাই এগোলো না | হ্যাঁ, কি যেন বলছিলাম? মনে পড়েছে - বয়সের সাথে ধৈর্য্যের সম্পর্ক | আজকাল যথেষ্ট অধৈর্য্য হয়ে পড়ছি | কেন বলুন তো ? তবে যে মা বলতেন বয়সের সাথে সাথে ধৈর্য্য বাড়বে ? আচ্ছা, বন্ধুরা একটু সাহায্য করতে পারেন ? আপনাদের কি মত ? আপনাদের কি অভিজ্ঞতা ? একটু আলো ফেলুন না, দয়া করে | অন্ধকার কাটুক | অপেক্ষায় থাকলাম ...  


শনিবারের আড্ডা ২৩.০৭.২০২২ | © ভাস্কর ভট্টাচার্য 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

অসংখ্য ধন্যবাদ বন্ধু | আপনার ভালোবাসা আর পৃষ্ঠপোষকতা আমার উর্জা, আমার প্রধান পাথেয় | পাশে থাকুন, এই প্রার্থনা রইলো | অনেক ভালোবাসা থাকলো, আপনার জন্য | নমস্কার |