রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২২

যা কিছু সনাতন এবং বলাই দা

আজকাল 'সনাতন' শব্দটি খুব চোখে পড়ে | একটু সন্ধান করতেই সনাতন শব্দটির আভিধানিক ইংরেজি অর্থ  পাওয়া গেলো - 'traditional', যাকে আবার বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়াচ্ছে 'সর্বজনগৃহীত', 'প্রথাসম্মত', এমনকি 'প্রচলিত'ও | কাজেই সনাতন শব্দটির অর্থকে যারা 'আদি ও অকৃত্তিম' বলে চালানোর চেষ্টা করছেন তারা বোধহয় অর্ধ সত্য বর্ণন করছেন | যাই হোক তা নিয়ে বিশেষ শির পীড়ায় ভুগছি না | বলা এবং বোঝার দায়িত্ব যাঁদের উপর বর্তায় তারা বলে-বুঝে নেবেন | তো হটাৎ সনাতন শব্দটি নিয়ে পড়লাম কেন ? বেশ, সে প্রসঙ্গেই আসা যাক |

কৈশোরে এবং যৌবনে যারা মাঠে ময়দানে খেলাধুলা করার সুযোগ পেয়েছিলেন তারা প্রায় সকলেই স্থায়ী অপুষ্টিতে ভুগতেন | চুটিয়ে ফুটবল খেললেও, সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের না ছিল পুষ্টি সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান বা ডাযেটিশিয়ানদের রমরমা, না ছিল পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করার জন্য প্রয়োজনীয় সাচ্ছল্য | সুষম প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্যের অভাবে প্রায় প্রত্যেকটি দেহই হয়ে উঠত শীর্ণকায়, পেশিহীন এবং দুর্বল | কেবল মাত্র দুর্দমনীয় মনের জোর, লড়াই করার অদম্য ইচ্ছে, অক্লান্ত অনুশীলন এবং অসাধারণ সহজাত দক্ষতার উপর নির্ভর করে আপামর গরিব এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত বঙ্গ সন্তান ফুটবল ময়দান কাঁপাতেন | আর মাঠে ময়দানে কঠিন পরিশ্রম শেষে পুষ্টি বলতে শীর্ণকায় বঙ্গ সন্তান বুঝতো সেই আদি-অকৃত্তিম 'সনাতন' খাদ্য - পাউরুটি, ঘুগনি আর ডিমের ওমলেট বা সিদ্ধ |   
আজ অনেকদিন পর আবার সেই 'সনাতন' অমৃতের রসাস্বাদন করার সুযোগ ঘটলো | রবিবারের সকালে মাছের থলেতে যতসামান্য এদেশী ইলিশ, গ্রাম সপাঁচেক গুরজোয়ালি আর খানকয়েক তোপসে পুরে যখন উখলিত বক্ষ আর সংকুচিত পকেট নিয়ে বাজার থেকে বেরোলাম তখন হটাৎ চায়ের নেশা মাথা চাড়া দিলো | যেমন ভাবা তেমন কাজ | সটান বলাই'দার চায়ের দোকান | 

পাড়ার চায়ের দোকানে চা মানেই আড্ডা | প্রথম চুমুক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমার আজকের সংগ্রহ গুরজোয়ালির কাঁচা রুপোর মতো বর্ণ আর ইলিশের উজ্জ্বল শল্কর ইতিহাস এবং বংশাবলী নিয়ে তুমুল আলোচনার তরঙ্গ বইতে শুরু করলো | যারা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আলোচনায় যোগ দিলেন তাদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ বন্ধুদের এর আগে আমি কোনোদিন চাক্ষুষ দেখিইনি | যাই হোক, যুগান্তকারী আলোচনায় নবীন তোপসের প্রবেশের আগেই আমার চোখ গেলো ধূমায়িত সেই অমৃত পাত্রের দিকে | এক লহমায় ডায়েটিংএর সব অঙ্গীকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো |  ব্যাস আর কি ? এতক্ষন তক্কে তক্কে থাকা, সদাহাস্য বলাই'দার শুড়শুড়ি - "এক প্লেট হবে নাকি ?" ইদিক-উদিক চেয়ে, ঠোঁটে লাজুক লাজুক হাসি ঝুলিয়ে বললাম, "পাউরুটি টা একটু কড়া করে সেঁকে দিয়ো, আর হ্যাঁ ডিম্ টা কিন্তু আজ ওমলেটই খাবো | কাঁচা লংকার টুকরো দু চারটে বেশি দিয়ো বাপু, অম্বলের ক্রমাগত আক্রমণে লংকার স্বাদ ভুলতে বসেছি প্রায় |"       

তারপর আরেক কাপ চা আর খান তিনেক চোঁয়া ঢেকুর নির্গমন শেষে, মাছের থলেটি বাগিয়ে, দুটি অম্বলের ওষুধ পকেটে গুঁজে, গুটি গুটি পায়ে বাড়ির পথে অগ্রসর হলাম | ব্যাস, আমার গল্পটি ফুরোলো | বাঙালির সনাতন খাদ্যের কাহিনীর নোটে গাছটিও মুড়োলো | আমার অনেক কাজ, মশাই | আপনাদের সাথে বাজে গল্প করে সময় নষ্ট করতে পারবো না, বলে দিলাম | তবে হ্যাঁ, যারা বাঙালির সেই সনাতন খাদ্যের অকৃত্তিম স্বাদ পেতে চান, চুপি চুপি বলে রাখি, বলাই দা কিন্তু এবারের দুগ্গা পুজোর ঐ পাঁচ দিন ওর ঘুগনীর স্বাদ বর্ধন হেতু সামান্য পাঁঠার চর্বি ব্যবহার করবেন বলে স্থির করেছেন | ওহ, ভাবতেই কি সাংঘাতিক শিহরণ জাগছে শরীরে !

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

অসংখ্য ধন্যবাদ বন্ধু | আপনার ভালোবাসা আর পৃষ্ঠপোষকতা আমার উর্জা, আমার প্রধান পাথেয় | পাশে থাকুন, এই প্রার্থনা রইলো | অনেক ভালোবাসা থাকলো, আপনার জন্য | নমস্কার |