অসুর | নামটি নিশ্চই শোনা ?
খুব সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-২০০০ সালে রচিত বৈদিক সাহিত্যে প্রথম 'অসুর' ধারণাটির উল্লেখ পাওয়া যায় | এক্কেবারে শুরুর দিকে পূর্ণতাপ্রাপ্ত মানব বা দিব্য ক্ষমতাসম্পন্ন বলশালী সুনায়কোচিত অগ্রনেতাকে অসুর নামে উল্লেখ করা হলেও পরবর্তী সময়ে অসুররা বৈদিক দেবতাদের বিরোধীপক্ষ হিসেবেই আখ্যাত হন | পরবর্তীকালে দেবতাদের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি আর অসুরদের স্খলন ঘটতে থাকে | সময়ের সাথে সাথে অসুরদের জন্য পরিস্থিতি এতোটাই প্রতিকূল হয়ে পড়ে যে পরিণামে শ্রুতিসাহিত্য এবং পৌরাণিক কাহিনীসমূহে অসুরদের দৈত্য, রাক্ষস, পিশাচ, ইত্যাদি নামেই বর্ণন করা হয় | অমৃতমন্থন নিয়ে অসুর-দেবতার অন্তহীন কলহ তো সর্বজনবিদিত | দারুন মজার কথা হচ্ছে যে, লভ্য তথ্য অনুযায়ী, পারস্যে (এখনকার ইরান) এই প্যাটার্নটা কিন্তু একদম বিপরীতমুখী পথে অগ্রসর হয় | সেখানে কালক্রমে অসুর'রা সর্বোচ্চ দেবতা এবং দেব'রা নিকৃষ্ট রাক্ষস হিসেবে পরিচিত হন |
লক্ষ্য করার বিষয়, রাম-রাবনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা | কেউ কেউ রামকে শ্রেষ্ঠ এবং উত্তম পুরুষ মানেন, কেউ কেউ আবার রাবন কে | এই একটি বিষয়ে কিন্তু ভারতের একাধিক প্রান্ত, সমষ্টি বা সম্প্রদায় এক্কেবারে ভিন্ন মত পোষণ করে | কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠীগুলো প্রায় আড়াআড়ি বিভক্তও হয়ে যায় | কোনটা সত্যি আর কোনটা বিকৃতি, সেটা বোঝা প্রায় অসম্ভব | কোনটা প্রকৃত এবং অকল্পিত আর কোনটা নির্মিত সত্য, সেটাও বোঝা দায় | পুরোটাই দৃষ্টিকোণ বা পরিপ্রেক্ষিতের ব্যাপার, তাই না ?
তবে একটা জিনিস বেশ বুঝি - নায়কের উদ্ভাস একমাত্র খলনায়কের উপস্থিতিতেই সম্ভব | খলনায়কের অসংযম এবং অমিতাচারেই নায়কের উত্থান সূত্র লুকিয়ে থাকে | কালোর অবর্তমানে সাদার মান থাকে না | নায়ক এবং খলনায়ক একে ওপরের 'রেফারেন্স ফ্রেম' | কে নায়ক আর কে খলনায়ক তা বিচার করা বেশ দুরূহ | তবু খলনায়ক ছাড়া নায়ক অসম্পূর্ণ, নিতান্ত পানসে | তাই মহিষাসুর হোক, রাবন হোক বা গব্বর সিং - যুগ যুগ ধরে, সযত্নে, খলনায়কের নির্মাণ ঘটে, নায়কের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে | প্রকৃত নিকৃষ্ট পুরুষ বাজারে উপলব্ধ না হলে, হাতের সামনে উপস্থিত অমুক সেরা বিকল্পকেই বেছে নিয়ে বেচারার মধ্যেই খলনায়কের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয় | হাজার হাজার বছরের পুরোনো এই রীতির বা পদ্ধতির কোনো পরিবর্তন হয়নি | এই খলনায়ক নির্মাণ করার পদ্ধতি নিয়ে না হয় অন্য একদিন গল্প করা যাবে |
তো, হটাৎ অসুর নিয়ে পড়লাম কেন ? আরে না না, সেরকম কিছু নয় - কোনো বৈপ্লবিক কিছু ভাবছি না | দুগ্গো পুজো আসছে | মনে কাশফুল ফুটছে | ছোটবেলা থেকেই অসুরকে আমার খুব আকর্ষণীয় এবং কৌতূহলোদ্দীপক লাগে | নিজের অজান্তেই দেবতাদের থেকে বেশি ছবি বোধহয় অসুরের তুলে ফেলি | এমনকি কোনো কোনো অসতর্ক মুহূর্তে অসুরকে লক্ষ্য করে হাত জোড়ও করে ফেলেছি ছোটবেলায় | মনে হয় সব দেব দেবীদের সম্বন্ধে এতো কিছু জানতে পারি, কিন্তু অসুরদের সম্বন্ধে যথেষ্ট জানি কি ? আজকাল অসুরের দিকে তাকিয়ে থাকলে "হীরক রাজার দেশে"র একটা সংলাপের অংশ মুখ থেকে প্রায় স্বগতোক্তির মতো বেরিয়ে আসে - "ভালো মন্দের বিচার করে কে ?"
© ভাস্কর ভট্টাচার্য | রবিবারের আড্ডা | ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২২
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন
অসংখ্য ধন্যবাদ বন্ধু | আপনার ভালোবাসা আর পৃষ্ঠপোষকতা আমার উর্জা, আমার প্রধান পাথেয় | পাশে থাকুন, এই প্রার্থনা রইলো | অনেক ভালোবাসা থাকলো, আপনার জন্য | নমস্কার |