bangla artcile লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
bangla artcile লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

মঙ্গলবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২২

একতা কাপুর এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত্বের 'বাড়ির পুজো'

 ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খুললেই দুর্গোৎসবের দারুন সব ছবি | ঝকঝকে, দৃষ্টিনন্দন, রুচিপূর্ণ, আনন্দদায়ক | আমার ছোটবেলার দূর্গা পুজোর স্মৃতি প্রধানত বারোয়ারি পুজোর বা ক্লাবের পুজোর | যদিও গুটিকয়েক সমৃদ্ধিশালী, সাবেকি, বর্ধিষ্ণু এবং বুনিয়াদি ধনী পরিবারের পুজো তাদের নিজস্ব ঠাকুর দালানেই হতো | অবশ্য সেরকম বাড়ির পুজো ছিল হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র | লক্ষ্মী পুজোটাই বরঞ্চ মধ্যবিত্ত্ব গৃহীর বাড়িতে ঘটা করে করার রেওয়াজ ছিল | 

এখন কিন্তু প্রচুর (উচ্চ)মধ্যবিত্ত পরিবার বাড়িতেই রীতিমতো দুর্গাপুজোর আয়োজন করছেন | পাড়ার সরস্বতী আর শীতলা পুজোয় পারদর্শী পুরোহিত বাড়ির দূর্গা পুজো কতটা রীতিনীতি বা বিশুদ্ধ পদ্ধতি মেনে করতে পারছেন তা বলতে পারবোনা | তাতে অনাচার কতটা হচ্ছে বা আদৌ হচ্ছে কিনা তাও বলতে পারবো না | তবে গৃহী এবং গৃহিণীর নিষ্ঠা কিন্তু দেখার মতো এবং প্রভূত প্রশংসার যোগ্য | যাবতীয় তোড়জোড়, সাজগোজ, শোনা গয়না, ঢাক কাঁসর, ধুপ ধুনো, মন্ত্রপাঠ, লোকজন, চন্ডী স্তোত্র আর রবির গান থেকে শুরু করে উদ্দাম ধুনুচি নাচ আর আশা ভোঁসলের 'উরি উরি বাবা' - সব মিলিয়ে একটা মার্ কাটারি ব্যাপার | মধ্যবিত্ত বাড়ির পুজোর দৃশ্যগুলো যেন একতা কাপুরের পারিবারিক টেলিসিরিয়ালগুলির এক একটি সেটের চকচকে স্থিরচিত্র | আমার মনে হয় প্রধান তিনটি কারণে মধ্যবিত্ত্ব পরিবারগুলি এখন বাড়িতে দুগ্গোপূজোর আয়োজন করতে শুরু করেছেন: 

১) পুণ্যি হয় সরাসরি এবং অর্থ ব্যয়ের সমানুপাতিক | অনেকের চাঁদার অর্থে আয়োজিত বারোয়ারি পুজোয় পুণ্যি ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে | বাড়ির পুজোয় সে হ্যাপা কম | গৃহী যেহেতু সব খরচ বহন করছেন, আশা করা যায় তার এবং তার পরিবারের পুণ্যির সম্ভাবনা সব চেয়ে বেশি এবং খরচের সমানুপাতিক |

২) সামাজিক পরিচিত বাড়ে এবং প্রতিষ্ঠা সুদৃঢ় হয় | ছোটবেলায় যখন আমাদের বাড়িতে বিদ্যুতের আলো এসে পৌঁছয় নি, তখন অমুক মহাশয়ের বাড়িতে একটি এম্বাসেডর বা ফিয়াট গাড়ি আছে শুনলেই ছুটতাম একটিবার ঐ অপূর্ব বাহন দেখতে পাওয়ার লোভে | এবং আমরা নিশ্চিত হতাম এই গাড়ির মালিক নির্ঘাত একজন কেষ্ট-বিষ্টু | আজকাল বোধয় কেষ্ট-বিষ্টুর তকমা পেতে গেলে বাড়িতে দুগ্গোৎসব আয়োজনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে |   

৩) উৎসবের মোড়কে মোচ্ছব | আমরা তুখোড় আড্ডাবাজ, যাই বলুন না কেন | যখন হাত শূন্য ছিল তখন ক্লাবের পুজোতেই সময় করে, বয়োজ্যেষ্ঠদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর করা শাসন এড়িয়ে, মোচ্ছব চলতো অল্পস্বল্প | ভোর রাতে চোরের মতো বাড়ি ঢোকার আগে ভালো করে দেখে নেওয়া হতো বাবা-জ্যাঠারা  শুয়ে পড়েছেন কিনা | এখন অর্থের অভাব কমেছে, কামাই-টামাই বেড়েছে | বাড়িতে একটা পুজো করে ফেলতে পারলেই ব্যাস - পুণ্যি-টুনি তো হবেই, লোকেও জানবে ধর্মের প্রতি আমার অগাধ দায়বদ্ধতা আর নিষ্ঠার কথা, আমার সামাজিক প্রতিষ্ঠা আর প্রতিপত্তির কথা | তার সাথে হপ্তাখানেকের বাঁধনহীন মোচ্ছব | 

পাড়ায় পাড়ায় মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারগুলির বাড়িতে দুগ্গোপুজোর আয়োজনের কারন অন্য আরো কিছু হতেই পারে | আমার জানা নেই | বন্ধুদের গোচরে থাকলে জানাবেন | সমৃদ্ধ হবো |                 

আমি কিন্তু অসূয়াপূর্ন বা cynical হয়ে যাইনি | বিশ্বাস করুন দু-একটা পুজোতে আমিও সাদা পাঞ্জাবিতে ভালো সুগন্ধ মেখেই গিয়েছি | ঢাকের তালে ধুনুচি নৃত্যও করেছি সাধ্যমতো | সুন্দর কিছু দৃশ্য ও মানুষ ক্যামেরাবন্দিও করেছি | সব মিলিয়ে, মজাই পাচ্ছি | চলতে থাকুক | মধ্যবিত্ত বাঙালি গৃহস্তের বাড়ির দূর্গা পুজো যুগ যুগ জিয়ো |    



© ভাস্কর ভট্টাচার্য | অষ্টমীর আড্ডা | ০৩.১০.২০২২

রবিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২২

পরিচয়

বারুইপুর পৌঁছতে বেলা হবে | অনেকটা পথ | সকাল সকাল বেরোতে পারলেই ভালো | বাবাকে রেখে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যাবে | সন্ধেবেলা আবার একটা ইনভিটেশন আছে জন্মদিনের | ছেলের স্কুলের বন্ধুর বাবার পঁচাত্তরতম জন্মদিন | একটা ভালো গিফট কিনতে হবে, সাথে একটা রজনীগন্ধার বোকে আর রসময়ের কাঁচাগোল্লা | ভদ্রলোক নাকি রজনীগন্ধা আর কাঁচাগোল্লা খুব পছন্দ করেন | সকাল থেকেই তাড়া লাগাচ্ছি, কিন্তু বাবার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই | উনি ওনার দুলকি চালেই চলেছেন | আজ যেন আরো শ্লথ | উফ্ফ, এতো বিরক্তি লাগে যে কি বলবো |
কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছি | আমি ড: পবিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভারতবর্ষের একজন স্বনামধন্য পালিওন্টোলজিস্ট | জীবাশ্ম বা ফসিল্স নিয়েই আমার কাজ | আমার স্ত্রী রক্তিমা, উত্তর কলকাতার একটি সরকারি কলেজের রসায়ন ডিপার্টমেন্টের বিভাগীয় প্রধান | আমাদের একটিই সন্তান | নামি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ক্লাস ফাইভের ছাত্র | আজ পর্যন্ত কখনো দ্বিতীয় হয়নি রিজু | রণদীপ ওর পোশাকি নাম | আমাদের বিশ্বাস জীবনে ও অনেক বড়ো হবে | ও অবশ্য ওর ঠাকুরদার সবচেয়ে প্রিয় | রিজুরও 'দাদাই' অন্ত প্রাণ | আমরা জানতাম ও নিশ্চিত একটু আধটু কষ্ট পাবে | তবে গত এক সপ্তাহ ধরে ও যে এতটা চুপসে যাবে, সেটা আমরা একেবারেই অনুমান করতে পারিনি | নানা ভাবে চেষ্টা করে গেছি ওর মনমরা ভাবটাকে কাটানোর | কিন্তু কিছুতেও কিছু হয়নি | আজ থেকে যে ওর দাদাইয়ের কাছে আর গল্প শুনতে শুনতে ঘুমাতে যেতে পারবেনা বা ইস্কুলের বন্ধুদের সাথে ঝগড়ার যাবতীয় বিবরণ ভাগ করে নিতে পারবেনা সেটা বুঝতে পেরেছে | আজে ওর দাদাই ওর থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে | বৃদ্ধাশ্রমের নামটা কিন্তু আমার বাবা নিজেই সাজেস্ট করেছিলেন |
একদিন ইনস্টিটিউট থেকে আমি বাড়ি ফেরার পর আমাকে ডেকে নিজেই বলেছিলেন, "শোন বাবু, বয়সের সাথে সাথে মানুষের অনেক সমস্যা হয় | তোরা মারাত্মক ব্যস্ত | তোদের অনেক কাজ | আমি কোনো কাজের নই | আমি তোদের সাথে থাকলে তোদের সমস্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক | আমি সেটা বুঝতে পারছি গত কিছু বছর | দাদুভাইও এবার সিক্সএ উঠবে | পড়াশোনার চাপ বাড়ছে | আমার জন্য হয়তো ওর অনেকটা সময় অপচয় হচ্ছে | তারপর দ্যাখ আগামী দিনে ওর পড়াশোনার খরচও বাড়বে | আমার ওষুধ-পথ্যের খরচও দিন দিন বেড়েই চলেছে | তোরাই বা পেরে উঠবি কেন ? তার চেয়ে বরং আমি একটা আবাসিক আশ্রমে গিয়ে থাকি | সবার সুযোগ সুবিধা মতো দেখা হবে | কাজের মানুষরা কাজে মন দিতে পারবে আর আমি আমার অকাজগুলোতে | সমবয়সীদের সাথে থাকবো, মন্দ লাগবেনা | তোদের কথা খুব বেশি মনে পড়লে, আমি বরঞ্চ তোদের সুবিধা মতো তোদের সাথে ফোনে কথা বলে নেবোখন | সরকার যেটুকু পেনশন দেয়, আমার বেশ চলে যাবে, বুঝলি ? আর তো ব্যাস কয়েকটা দিন |
প্রতীক্ষা | বারুইপুরের এই আশ্রমটির বেশ নাম আছে | আমার ইনস্টিটিউটএর সিনিয়র কলিগ ধুর্জটিদা সার্টিফাই করলেন | ওনার এক দুঃসম্পর্কের মামাও ওখানেই আছেন গত আট বছর | প্রশস্ত, নিরাপদ এবং সব আধুনিক সুবিধাযুক্ত | সব চেয়ে মজাদার কথা হচ্ছে যে আশ্রমটিতে দুটি পাশাপাশি ভবনে দু ধরনের আবাসিকদের থাকার ব্যবস্থা আছে - একটিতে থাকেন বয়জ্যেষ্ঠরা অপরটিতে অনাথ শিশুরা | পরিচালক এবং ব্যবস্থাপক একই মানুষ | ড: অরিন্দম দাসগুপ্ত এখন একজন অশীতিপর বৃদ্ধ | শুনেছি কৃতি ছাত্র ছিলেন | বছর চল্লিশ আগে ফিলাডেলফিয়ার একটি বিখ্যাত ফার্মা রিসার্চ কোম্পানির দামি চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে শুরু করেছিলেন এই আবাসনটি | শুরুতে কিছু অনাথ শিশুদের ঠাঁই দিয়েছিলেন | বছর দশ পরে সুযোগ করে দিয়েছিলেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরও | বাবারই পছন্দ অরিন্দম বাবুর জায়গাটা | একদিকে ভালোই হলো - খারাপ হলে অন্তত তার দায়িত্ব আমার উপর বর্তাবে না |
আশ্রমে পৌঁছতেই, বাবার জিনিসপত্র নামিয়ে নেওয়া হলো | আর এয়ার-কন্ডিশনড অফিস ঘরে আমাদের বসার ব্যবস্থা হলো, প্রাথমিক কিছু প্রক্রিয়া এবং সইসাবুদ খতম করার জন্য | দেয়াল ঘড়িতে তখন দেড়টা বাজতে মিনিট দুয়েক বাকি | মনে মনে ভাবছি তাড়াতাড়ি কাজটা চুকলে বাঁচি, এমন সময় ম্যানেজার এসে জানালেন অরিন্দম বাবু মালিদের সাথে একটু কথা সেরেই আসছেন | আশ্রমের বাগানের ক্ষতি না করে কি ভাবে এবারের দূর্গা পুজোটা আরেকটু বড়ো করে করা যায়, তারই প্ল্যানিং চলছে | কফি খেতে খেতে চেয়ারে আরেকটু আরাম করে যখন বসছি, খেয়াল করলাম বাবা উঠে পড়েছেন | রিজুর কাঁধে হাত রেখে বললেন, "চলো দাদুভাই, একটু বাগানটা দেখে আসি" | বাবার এই চঞ্চলতাটা, আর সব ব্যাপারে ওভার কনফিডেন্সটাই মেনে নিতে পারিনা | কি দরকার একটা অচেনা জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর | আর তো কয়েকটা মুহূর্ত, শান্ত হয়ে বসে থাকতে সমস্যা কোথায়, কে জানে | যাক, ভাবলাম নাতির সাথে আবার কবে দেখা হবে তার ঠিক নেই | যাক দুজনে একসাথে একটু সময় কাটাক |
দেখতে দেখতে প্রায় দশ মিনিট কেটে গেলো | দেরি হয়ে যাচ্ছে | একটু চিন্তাও হচ্ছে | রুবিও (আমার স্ত্রী রক্তিমার ডাক নাম) বললো, "যাও একটু দেখো | বয়সের সাথে সাথে মানুষ কেন যে এরকম আক্কেলহীন হয়ে যায় কে জানে"| যে পথে বাবা আর রিজু গিয়েছিলো সেইদিকে এগিয়ে গেলাম | অন্দরের দরজা পার করে, লম্বা বারান্দা পেরোতেই, একটা বড়ো কাঠের দরজার ওপারে কয়েকধাপ নিচু সিঁড়ি নেমে মিশে গেছে একটা বেশ প্রশস্থ শুড়কির রাস্তায় | বোঝাই যায় রাস্তাটা বেশ বড়ো একটি বাগানে গিয়ে শেষ হয়েছে | চারিদিক গাঢ় সবুজ, অনেক ছোট বড়ো গাছগাছালির দৌলতে | ছেলের নাম ধরে ডাকতে যাবো, এমন সময় হটাৎই দূরে নজরে পড়লো বাগানটার অপর প্রান্তে দুটো দৃশ্যের দিকে | একটিতে রিজু অনেকগুলো বাচ্চা কাচ্চার সাথে মাটিতে বসেই কি সব যেন খেলছে | আর বাবা পাশেই একটা আম গাছের ছায়ায় হাত পা নাড়িয়ে আরেকজন সৌম্যদর্শন বৃদ্ধের সাথে খোশগল্প করছেন | দুজনের মুখের হাঁসি দেখে মনে হলো নিশ্চই খুব মজার কোনো কথা নিয়ে আলোচনা চলছে | এতো স্বল্প সময়েও বাবা এখানে বন্ধুত্ব পাতিয়ে নিয়েছেন দেখছি | হাত এ প্রচুর অবকাশ থাকলে যা হয়, আর কি | আমি কাছে যেতেই, বাবা আমাদের দুজনকে একে ওপরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, "ইনিই অরিন্দমবাবু | আর ও'ই পবিত্র"| আমি নমস্কার করেই বাবার দিকে ফিরে বললাম, "তোমার কি কান্ডজ্ঞান নেই, বলো তো ? আমাদের তাড়াতাড়ি ফেরা দরকার, কতবার বলেছি তোমাকে"| দুজনেই একটু অপ্রস্তুত হলেন, বুঝতে পারলাম | আসলে সব বৃদ্ধরই একই সমস্যা - অন্যের সময়ের মূল্য দিতে জানেন না |
সব প্রক্রিয়া সারতে সারতে আরো ঘন্টা খানেক লেগে গেলো | বাবার ঘরটা বেশ সুন্দর, খোলামেলা | বছর পঁয়ষট্টির আরেক বৃদ্ধ বাবার রুমমেট | বেরিয়ে আসার সময় বাবা আর রিজু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদলো | আমি কোনোদিন বাবাকে কাঁদতে দেখিনি | একটু অদ্ভুত লাগলো | রিজুকে শান্ত করতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হবে বুঝতেই পারছি | যাই হোক, যার শেষ ভালো তার সব ভালো | রুবিও দেখলাম অনেক বছর পর বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো | আমিও ইতস্তত করতে করতে প্রণামটা করেই ফেললাম | এবার যাওয়ার পালা | অরিন্দম বাবুকে বলে রাখলাম প্রয়োজন পড়লেই ফোন করবেন আর একটু সময় দেবেন, অনেকটা দূর থেকে আসতে হবে তো, তাই | বাবার কিছু পয়সাকড়ি লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করতেই মানা করে বললেন, "তোরা ভালো থাকিস, সাবধানে থাকিস, দাদুভাইকে ভালো করে মানুষ করিস, তাহলেই হবে | আমি এদিকটা সামলে নেবো |" বেশি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করার এই সমস্যা - জায়গা বিশেষে বাবা নাটকীয় না হয়ে পারবেনই না | যাক গে, ঝামেলা চুকিয়ে সবাই গাড়িতে ওঠার জন্য এগিয়ে গেলাম | রিজুকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলতে হলো | কিন্তু অনেক্ষন ধরে মাথায় ঘুরতে থাকা একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আরেকবার আমি গাড়ি থেকে নামলাম | বাবা ততক্ষনে ভিতরে চলে গিয়েছেন | হয়তো রিজুর আচরণ আর কান্না ওনাকে বিহ্বল করে দিচ্ছিলো | অরিন্দম বাবু কিন্তু ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন, অপলক দৃষ্টিতে আমাদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে | যেন আমরা এক একজন অপরাধী এবং ওনার করুনার পাত্র | আমার ওনার তাকানোটা একদম ভালো লাগছে না | আমি ওনার দিকে এগিয়ে গেলাম | আরেকবার নমস্কার করার ভঙ্গিতে বললাম, অরিন্দম বাবু আমাকে খারাপ ভাববেন না, পরিস্থিতির চাপে পড়েই অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাই না? "সে তো বটেই", সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে উনিও প্রতিনমস্কার করলেন | আমি সুযোগ বুঝে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা আমার বাবা কোথা থেকে আপনাদের এই প্রতিষ্ঠানতার কথা জেনেছেন বলতে পারেন ? উনি কিন্তু আমাদের কিছুই বলেন নি | আজ দেখলাম, বাবা আর আপনি বাগানে আড্ডায় মশগুল, যেন অনেকদিনের পরিচয় | ব্যাপারটা কি বলুন তো | অরিন্দম বাবু চোখের পাতা না ফেলে বেশ খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে আছেন দেখে বললাম, ক্ষমা করবেন প্রশ্নটা করা বোধয় আমার উচিত হয়নি | আচ্ছা চলি | অরিন্দম বাবু যেন মুহূর্তে সম্বিৎ ফিরে পেলেন | মৃদু হেসে বললেন, "না না, কোনো অনুচিত প্রশ্ন করেন নি | আপনি সন্তান, আপনার জানার অধিকার আছে | হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন | আপনার বাবার সাথে আমার অনেক দিনের চেনা জানা | প্রথম পরিচয় প্রায় আটতিরিশ বছর আগে, যেদিন আপনার বাবা, আপনার মাকে সঙ্গে করে প্রথমবার আমার আশ্রমে এসেছিলেন | সেদিনের সেই নিঃসন্তান দম্পতি আমার কাছে এসেছিলেন একটি অনাথ শিশুকে দত্তক নিতে | আবাসিকদের মধ্যে সবচেয়ে চুপচাপ, চাপা গায়ের রং আর ছোট্টোখাট্টো, প্রায় বিষন্ন একটি শিশুকে পাগলের মতো আদর করতে করতে দুজনে মিলে বাড়ি নিয়ে গেছিলেন | তারপরও যোগাযোগ ছিল | বহুবার কথা হয়েছে | ওনারাও অনেকবার এখানে এসেছেন | সাধ্যমতো আমাদের সহায়তা করেছেন | অনেক আবেগ, ত্যাগ আর স্নেহর সংমিশ্রনে সন্তান মানুষ করেছেন শুনেছিলাম | অনেক ভেবেচিন্তে দত্তক নেওয়া সন্তানের নাম রেখেছিলে 'পবিত্র' | আজ আপনার সাথে আমার পরিচয় হলো, পবিত্রবাবু | ভালো থাকবেন" |


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | রবিবারের ছোটগপ্পো | ০২.১০.২০২২

রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আমি, আমার সবুজ বন্ধুরা আর অসম্পূর্ণতা

ফুলের আগুনেই কি বনানীর পূর্ণতা ? পুষ্পোদ্গম ক্ষিতিজই কি পরম পরিপূর্ণতার একমাত্র শর্ত ? যে বৃক্ষের ফুল মোটে আসেই না, বা সহজে আসতে চায়না, তাদের কি ? তাদের স্থান এবং মর্যাদা কি তলানির কাছাকাছি ? 

জন্মালে মরতেই হবে | অমোঘ সত্য | জন্মানোর সার্থকতা কি শুধুই সহজাত দক্ষতার প্রকাশ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা, জগৎ ব্যাপি পরিচিতি আর খ্যাতি, অর্থনৈতিক শ্ৰীবৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ ? যাদের এই জনমে রবীন্দ্রনাথ, রবিশঙ্কর, মেঘনাথ সাহা বা তেন্ডুলকর হয়ে ওঠা হলো না ? যে নারী মা হয়ে উঠতে পারলেন না কিম্বা হতে চাইলেন না ? যে পুরুষ অমানুষিক পরিশ্রম আর নিরলস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিবারের কাছে আদর্শপুরুষ হয়ে উঠতে পারলেন না ? যে শিশু জীবনের যাঁতাকলে পিষেও সমাজের তৈরী কাঠামো ও মান অনুযায়ী নিজেকে প্রমান করতে সক্ষম হলো না ? তাদের জীবন কি অসম্পূর্ণ ? এই ধোঁয়াটে প্রশ্নের উত্তরও অস্পষ্ট, কুয়াশাবৃত | 

সম্পূর্ণতার সংজ্ঞা আমার জানা নেই | তবে অসম্পূর্ণতার লাবণ্যও কিন্তু কম নয় | একটু ভালো করে ভেবে দেখলে, সাফল্যের তুলনায় যে অসফলতার মাধুর্য্য কোনো অংশে কম নয়, তা বেশ বোঝা যায় | কুমোরটুলিতে কাঠামোয় লেপ্টে থাকা মাটির পরিত্যক্ত প্রতিমা দেখেছেন ? কোনো মণ্ডন বা অলঙ্করণ ছাড়াই ? কোনো কারনে হয়তো সেই অসম্পূর্ণ মূর্তি প্রতিমায় রূপান্তরিত হয়নি | তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়নি | সেবা-আরাধনা-অর্চনা হয়নি | তবু সেই মূর্তি অপরূপা | আমার কাছে নৈসর্গিক এবং সম্পূর্ণ | 

সবাই মিলে কি সেই অপরূপ অসম্পূর্ণতাকেও উদযাপন করা যায় না ?  


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৭.০৯.২০২২ 

রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২২

ফিরে দেখা

ঠাকুরদা ছিলেন কলিকাতা ট্রাম কোম্পানিতে কন্ডাক্টর | বাবা সরকারি আপিসে কর্মরত যৎসামান্য লোয়ার ডিভিশন কেরানি | সুবৃহৎ সংযুক্ত পরিবারের ক্ষুন্নিবৃত্তির পর বিশেষ পুঁজি অবশিষ্ট থাকতো না | পারিবারিক খরচকে সামর্থের মধ্যে রাখতে বাবার জ্যাঠামশাই (আমার বড়দাদু) দৈনন্দিন রোগ প্রতিরোধক হোমিও চিকিৎসাতেও  হাত পাকিয়েছিলেন | না ছিল Urban Company নামক আপদ, না ছিল ৫৮৪ টি চ্যানেল ওয়ালা কেবল টিভি | আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছিল অফুরান ফুরসত আর অক্লান্ত পরিশ্রমের নির্মল আনন্দ | টালির চাল মেরামত, দেয়াল চুনকাম, মাটির উনুন তৈরী থেকে শুরু করে প্রশস্ত উঠোনের গোবর লেপা দৈনিক শুদ্ধিকরণ আর সযত্নে চেরা পাকা বাঁশের বেড়া দেওয়া - সবই পরিবারের সদস্যরাই করে ফেলতো সানন্দে | তা ছোটরাই বা পিছিয়ে থাকে কেন? বড়োদের দেখাদেখি আমরাও কোমর বেঁধে তৈরী থাকতাম বৈকি | ছপাৎ ছপাৎ শব্দে কৃত ঘুঁটের দেয়াল চিত্র বা আলকাতরা মাখানো টিনের পাতের উপর প্রবল যত্নসহকারে সৃষ্ট গুঁড়ো কয়লার গুলের নিখুঁত তারামন্ডল - আমার ছোটবেলায় এসবের যে কি প্রবল টান ছিল তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয় | এসব কাজে আমরা - ভাই বোনেরা - সারাক্ষণ জ্যাঠা-জ্যাঠি, বাবা-মা, কাকা-কাকিমা আর পিসিদের পারদর্শিতার কাছাকাছি পৌঁছনোর অবিরাম চেষ্টা করে যেতাম |  আমরাই ছিলাম আমাদের বাড়ির "কাজের লোক" | বাইরের লোক রেখে কাজ করানোর মতো অর্থ বা প্রয়োজন কোনোটাই আমাদের সেভাবে ছিলোনা |  

সেই দিন আর নেই |.সেই বৃহৎ পরিবার এখন সময়ের গহীন অনন্তে ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকা কিছু ধূসর স্মৃতির অবয়ব মাত্র | 

যাই হোক, অনেক দিন পর নিজের হাতে বাড়ির নতুন কাঠের আসবাব রং করলাম | অনেক বছর পর আবার এক নির্মল তৃপ্তির অনুভূতি লাভ করলাম |  

আসবাব রং করলাম নাকি চকিতে কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে ছুঁয়ে ফিরে এলাম ?

প্রার্থনা ও যুদ্ধ

প্রার্থনা | ছোট্ট শব্দ | কিন্তু ছোটবেলা থেকে শুনেছি এর নাকি অদ্ভুত শক্তি | বড়রা বলতেন হাত জোড় করে, চোখ বুজে, একাত্ম চিত্তে প্রার্থনা করলেই কেল্লা ফতে | ইস্কুলের আইরিশ পাদ্রিরা বলতেন 'power of community prayer' - এর কথা |  বলতেন, সমষ্টিগত ভাবে প্রার্থনার জোরে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে অজেয় প্রতিপক্ষ, দুর্গম পথ থেকে প্রবল ঝঞ্ঝা, ব্যাপক দুর্ভিক্ষ থেকে মায় রুষ্ট (অপ)দেবতার রোষ - সবই নাকি অক্লেশে লঙ্ঘন করা সহজ হয়ে ওঠে |

কেন জানিনা, আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে - বেয়নেটের খোঁচায় ফালা ফালা হতে হতে মানুষ কি প্রার্থনা করে ? ক্লাস্টার বোমার আঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ধড়হীন দেহ কি প্রার্থনা করে ? স্রাপ্নেল্ এর আঘাতে ক্ষত বিক্ষত কিশোর, রক্তাক্ত হাত জোড় করে কি প্রার্থনা করে ? বাঙ্কার এ বসে মৃত্যুর আগমনের প্ৰহর গুনতে থাকা অন্তঃসত্ত্বা মা কি প্রার্থনা করে ? সাইরেনের তীব্র-তীক্ষ্ণ শীৎকারে কেঁপে কেঁপে ওঠা শিশু কি প্রার্থনা করে ? জীবন-জীবিকা হারিয়ে এক লহমায় উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া মানুষ কি প্রার্থনা করে ? পূর্বপুরুষের ভিটে মাটি ছেড়ে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা, ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের পথে হারিয়ে যেতে যেতে হাজার হাজার অসহায় শরণার্থী প্রাণ কি প্রার্থনা করে ? 

কোন ভাষায়, কি ভাবে প্রার্থনা করলে এই ধ্বংসলীলা, এই রক্ত আপ্লাবন থামবে জানি না | জানিনা প্রার্থনায় সত্যিই কোনো অন্তর্নিহিত শক্তি আছে কিনা | 

আমি প্রার্থনা করতে ভুলে গেছি ...

শাসন

পড়াশোনায় বিলকুল ফাঁকিবাজি হচ্ছে বুঝতে পারতেন, তবুও প্রবল চপেটাঘাতে আমার পশ্চাৎদেশ গরম করার চেয়ে কঠিন বাক্যবানে জর্জরিত করতেই বেশি পছন্দ করতেন বাবা | প্রায়শই পাশ দিয়ে স্বগতোক্তির মতো আওড়াতে আওড়াতে চলে যেতেন - “সময় বহিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়” ! উনি বোধহয় রুলের গুঁতোর চেয়ে ভাষার চাবুকে বেশি ভরসা করতেন | কিন্তু আমার মগজের তন্তু কিঞ্চিৎ স্থুল হওয়ার দরুন এবং বাংলা ভাষায় আমার অতুলনীয় পান্ডিত্যের কারণে ওই কথার নিগূঢ় অর্থ ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারতাম না সেই সময় | আজ আমার কন্যাকে, অঙ্ক পরীক্ষার আগের সন্ধ্যায়, জ্যামিতির কঠিন মারপ্যাঁচ অভ্যাস ত্যাগ করে রূপ চর্চায় মগ্ন হয়ে উঠতে দেখে, নিজের অজান্তেই ওই অমোঘ বাণী ওর  দিকে নিক্ষেপ করে দিলুম | অবশ্য ছুড়ে তো দিলুম, কিন্তু ও যদি ফস করে ওই কথাটার আক্ষরিক অর্থ জানতে চায় ? তখন তার ঠেলা সামাল দেবে কে ? আসলে ওকে গাল দিলে ও গালি টাকে অগ্রাহ্য করে সেটার অন্তর্নিহিত অর্থ জানতে বিশেষ আগ্রহী হয়ে পড়ে ! ও বোধয় বুঝে গেছে যে ওর পরম শ্রদ্ধেয় পিতৃদেব এক চুলের জন্য বাংলা ভাষায় নোবেল টা হাত ছাড়া করেছে | খানিকটা বাতের বেদনায় কাবু মানুষের পায়ে কাঁচি চালানোর মতো এরকম মুহূর্ত গুলিতেই ও আমার দিকে প্রশ্নবাণ বর্ষণ করতে থাকে, যতক্ষণ না আমার কাঁচুমাঁচু মুখ থেকে 'ঘাট হয়েছে মা, এইবার টা ছেড়ে দে' শুনতে পায় | জাহাতক ভাবা, এক্কেবারে সাথে সাথেই আমার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা ! কি কুক্ষণে বাবার কথার অপব্যবহার করার দুঃসাহস দেখাতে গেলাম ! কন্যা আমার দিকে চকিতে ফিরে প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করার আগেই, ঢোক গিলে, মানে  মানে চিলেকোঠার ঘরে কেটে পড়লাম বিদ্যুৎ গতিতে  ….

সোমবার, ২৫ জুলাই, ২০২২

নীল

বয়সের সাথে ধৈর্য্যের কি সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে ? ধৈর্য্য কি বয়সের সাথে সমানুপাতিক ভাবে বাড়ে নাকি কমতে থাকে ? এ প্রশ্ন বহু দিন যাবৎ আমাকে ভাবাচ্ছে | আমি নিয়মিত ভাবে আমার চারিপাশের মানুষদের খুব ভালো করে নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করি | অবশ্যই আমার 'sense of judgement'-কে খুব সযত্নে পাশে সরিয়ে রেখে | চেনা, অচেনা, আত্মীয়, পরিচিত, মিত্র, অমিত্র - সব্বাই কে | মায় নিজেকেও |     

জার্নাল (দিনপত্রিকা বা ডায়েরি) লেখার একটা অভ্যাস ছোটবেলায় তৈরী করে দিয়েছিলেন ইস্কুলের ইউরোপীয় পাদ্রীরা | সেই ডায়েরি আমার সব চেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছিল জীবনের প্রায় শুরুর দিকটায় | ছোট পরিবারের একমাত্র সন্তানদের যা হয় আর কি | তার একটা নামও রেখেছিলাম - নীল (এই নাম রাখার কারণ কি ছিল, সেটা মনে পড়ছেনা, তবে এক্কেবারে প্রথম থেকেই ওই নামটি আমার বেশ পছন্দের) | শুরুতে অবশ্য সেরকম হওয়ার কথা ছিলনা | একান্নবর্তী পরিবারেই জন্ম | জীবনের প্রথম দশ বছর হৈ হৈ করে কেটে গিয়েছিলো | বাড়ি তো নয়, যেন হরেকরকম মানুষ, তাদের বিচিত্র সব কীর্তি কলাপ আর নতুন নতুন আশ্চর্য্যের হাট | একাকিত্ব শব্দ টি তখনও রৈ রৈ করে আমার জীবনে প্রবেশ করেনি | দশ বছর বয়স অবধি সীমাহীন ফূর্তি | অর্ধেক ডিম্ সিদ্ধ জুটলেও হাসছি আবার বড়দাদু  (জ্যাঠার বাবা) কান মুলে দিলেও হাসছি | ছোটকাকা নতুন লাটাই কিনে আনলেও হাসছি আবার পুকুরের পাড়ে পড়ে গিয়ে হাঁটুর চামড়া হাঁ হয়ে গেলেও হাসছি | বন্ধুর ব্যাঙ্গেও হাসছি আবার ফুলদা'র রগড়েও হাসছি | যাই হোক, ওই অপার আনন্দ, ওই অপরিসীম তৃপ্তি বোধহয় নিয়তির গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠলো | ব্যাস, কেল্লা ফতে | দে ব্যাটাচ্ছেলেকে শায়েস্তা করে | ছিটকে গেলাম | এবার একটুকরো ছোট্ট পরিবার | বাবা, মা, আমি আর শূন্যতা | সেই যন্ত্রণার ব্যাখ্যা এই স্বল্প পরিসরে করা সম্ভব নয় | মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও হয়তো কম কষ্ট পেতাম | প্রথমবার আমার অভিধানে প্রবেশ ঘটলো একটি নতুন বাংলা শব্দের - একাকিত্ব !

যাই হোক, এমত সময়ে 'নীল' আমার প্রাণের সাথী হয়ে আমার জীবনে পদার্পন করলো | স্বর না থাকলেও আকাশের মতো একটা বড় হৃদয় ছিল তার | আমার সব আনন্দ, যন্ত্রনা, উচ্ছ্বাস, হতাশা, আবেগ, অনুভূতি অবলীলায় শুষে নিতে পারতো বিনা অভিযোগে, অক্লান্ত ভাবে | পাতার পর পাতা শুধু কথা আর কথা - আমার কথা, সবার কথা | নীল যেন নির্বাক অথচ সংবেদনশীল বন্ধু | তার পাতায় পাতায় ধরা থাকলো আমার ছেলেবেলা, বয়োসন্ধি, কৈশোর এবং যৌবনে প্রবেশের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা অগুনতি কাহিনী | দ্বিধার, বিভ্রান্তির, উল্লাসের, লজ্জার, বিহ্বলতার, সাফল্যের, ব্যর্থতার, বিশৃঙ্খলার, প্রেমের, ঘৃণার, - আরো কত কি | দিনের শেষে তার কাছে সব কিছু সযত্নে সঁপে দিতে পারলেই, ব্যাস - আমার সেকি অনাবিল শান্তি | সেই নীলের বুকেই খচিত আছে আমার দেখা অনেক অনেক মানুষের অবয়ব | তাদেরকে আমি যেমন ভাবে পেয়েছি বা নিদেনপক্ষে দেখেছি | তাদের সেই ছবিগুলো নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষন এবং মূল্যায়ন থেকেই উদ্ভূত | সেগুলো সঠিক নাকি একেবারেই গোলমেলে সে সব ভাবার ইচ্ছে বা প্রয়োজন তখন বোধ করিনি | সময়ের সাথে সাথে অনেক ছবি বদলেছে, মানছি | তার সাথে সঙ্গতি রেখেই আমার জার্ণালেও বদল এসেছে | কিন্তু স্থায়ী শব্দটার সাথে কোথাও যেন আমার একটা বৈরিতা আছে | সে প্রসঙ্গে অন্য একদিন আড্ডা দেওয়া যাবে | তবে আসল কথা হলো, বেশ অল্প বয়সেই চাকরি পেয়ে যাওয়ায় আবার ছিন্নমূল হওয়ার পালা | আমার প্রিয় শহর থেকে বহু দূরে | সেই শহরের গল্প, আমার নতুন জীবনের গল্প আরেকদিন | যাই হোক সুদূরে চলে যাওয়ার মাস ছয়েক পড়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়েছিলাম | বাড়ি ফিরে আবার সেই শিকড়ের সন্ধান | সব কিছুকে আবার ছুঁয়ে দেখা | নিজের অস্তিত্বের গোড়ার সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা | নীল কিন্তু হারিয়ে গেলো | সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাকে কোত্থাও পেলাম না | ঝড়ের মতো সে আমার জীবনে এসেছিলো | ম্যাজিকের মতো নিঃশব্দে কোথায় যেন বেমালুম হাপিশ হয়ে গেলো | হয়তো তাকে সাথে নিয়ে যাইনি বলে তার অভিমান হয়েছিল | হয়তো তার মনে হয়েছিল আমার জীবনে তার প্রয়োজন শেষ | তাকে কোনোদিন এটা বোঝানোর সুযোগটাই পেলাম না, যে তার প্রয়োজন আমার জীবনে আজও আছে | 

যাক গে, আসল কথাটাই এগোলো না | হ্যাঁ, কি যেন বলছিলাম? মনে পড়েছে - বয়সের সাথে ধৈর্য্যের সম্পর্ক | আজকাল যথেষ্ট অধৈর্য্য হয়ে পড়ছি | কেন বলুন তো ? তবে যে মা বলতেন বয়সের সাথে সাথে ধৈর্য্য বাড়বে ? আচ্ছা, বন্ধুরা একটু সাহায্য করতে পারেন ? আপনাদের কি মত ? আপনাদের কি অভিজ্ঞতা ? একটু আলো ফেলুন না, দয়া করে | অন্ধকার কাটুক | অপেক্ষায় থাকলাম ...  


শনিবারের আড্ডা ২৩.০৭.২০২২ | © ভাস্কর ভট্টাচার্য