বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২২

অভাব

শৈশবে, বাবার কাছে একটা কথা প্রায়শই শুনতাম | বার বার বলতেন, 'অভাব মানুষকে মহীয়ান করে' !

শিকার করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই, কথাটা আমার এক্কেবারে পছন্দের ছিল না | শৈশবে কথাটির নিগূঢ় অর্থ বুঝতেই পারতাম না | খালি ভাবতাম, বাবার সামর্থের বাইরে কিছু চেয়ে বসলেই ওই অমোঘ বাণী নিশ্চিত আমার দিকে ২০০ কিমি বেগে ধেয়ে আসবে | আর আমার বয়সন্ধিকালে যখন সবার কথার বিরোধিতা করা এবং নিজের ভাবনাটাকে সঠিক প্রমান করাটাকে একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেলাম, তখন সেই অদ্ভুত বাক্যটি শুনলেই বমকে যেতাম | ভাবতাম বাবা 'দারিদ্র্য'-কে অহেতুক রোমান্টিসাইস করার চেষ্টা করছেন এবং খরচ বাঁচানোর ফন্দি হিসেবে ওই বাক্যটি ব্যবহার করছেন | ভাবতাম কি সাংঘাতিক নেগেটিভ একটা ভাবনা জোর করে একটা বাচ্চার মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে | তার আত্মবিশ্বাস আর বড় কিছু করার খিদেটাকেই সমূলে উৎপাটন করার চেষ্টা চলছে | বাবাকে যেহেতু যমের থেকে সামান্য বেশি ভয় পেতাম, তাই মুখের উপর প্রতিবাদ করার সাহস জোগাড় করতে পারতাম না | মুষ্টি বদ্ধ করতেই, সব ক্লেশ নীরব জেদে রূপান্তরিত হয়ে মনের এক কোণে জমা হতে থাকতো | ভাবতাম একদিন বাবার কাছে প্রমান করেই ছাড়বো, প্রাচুর্য্য খারাপ জিনিস নয় এবং অভাব যে অপরিহার্যভাবে মানুষকে মহীয়ান করবেই এর কোনো নিশ্চয়তা নেই|        

ওই কথাটির প্রকৃত অর্থ বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলেছি | তবে দেরিতে হলেও বুঝেছি | বুঝেছি বললে কম বলা হবে, উপলব্ধি করেছি | প্রতিনিয়ত করে চলেছি | 'অভাব' বলতে বাবা কোনোদিন 'দারিদ্র' বোঝাতে চান নি | অভাব বলতে বাবা বারবার 'অসম্পূর্ণ আকাঙ্খা' বা 'অপ্রাপ্ত প্রসিদ্ধি'র কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন | অসমাপ্ত স্বপ্নের কথা বা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে যে ক্ষুদার প্রয়োজন পড়ে, তার কথা বলতে চেয়েছিলেন | একটা ধ্রুব সত্য, একটা মৌলিক অথচ দারুন অনুপ্রেরণা দায়ক ভাবনাকে আমি তখন বুঝতেই পারিনি বা চাইনি | বাবা চলে গিয়েছেন | শেষ পর্যন্ত বাবার পাশেই ছিলাম | তবু মাঝে মাঝে মন কেমন করে, মনে হয় পাশে থেকেও আক্ষরিক অর্থেই কি বাবার "সাথে" কোনোদিন থাকতে পেরেছি ? 

ওঁনাকে, ওনার চিন্তনকে আমি নতুন আলোয় চিনতে শিখছি, প্রতিদিন | কথায় বলে "when you are too close to something, you tend to lose objectivity" | খুব খাঁটি কথা | খুব কাছাকাছিতে দৃষ্টি এবং বোধ, দুটোই বেশ ঘোলাটে হয়ে যায় |  অনেক সময় মানুষের সঠিক মূল্যায়ন করতে গেলে একটু দূরে সরে গিয়ে করতে হয় | বাবা দূরে চলে গিয়ে যেন আরো প্রজ্জ্যল হয়ে আমার জীবনে থেকে গিয়েছেন ধ্রুবতারার মতন |     


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২৩.১১.২০২২

নিছক প্রত্যয়ী

কুয়াশার ঠিক ওপারেই আছো 

ফজরের আজানের সূচনায় তুমি,   

বসন্তের আশু সবুজে আছো 

ঝঞ্ঝা শেষের শান্ত প্রকৃতি তুমি |  

নিকষ ক্লান্তির অবসানে আছো 

কৈশোরের নাছোড় আবদারে তুমি, 

সগর্ভার যন্ত্রনার উপশমে আছো   

নবজাত প্রাণের উন্মেষে তুমি |

আছো মেঘের ক্ষীণ রুপালি রেখায়  

ভীষণ মহামারীর প্রতিষেধকে তুমি, 

ঘন আঁধার জ্বলে তোমার শিখায়  

ভাঙা প্রত্যাশে নব সঞ্জীবন তুমি |  

অনিমেশ আমি নিমেষের খোঁজে 

                                 গভীর আবেশে সিক্ত, 

মুঠো আমার চির মুক্ত জেনো, বারেবার 

                                   করো আমায় রিক্ত | 



© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৬.১১.২০২২

বুধবার, ৯ নভেম্বর, ২০২২

অনু কবিতা - সংকলন ৫

নীলাকাশ যেখানে নিত্য আত্মাহুতি দেয় তোমার উত্তাল বুকে 

নিঃসীম সেই দিগন্তে হারিয়ে যাওয়ার পরমানন্দ পাইনি আজও, 

অকাতর তবুও তোমার বুকে বার বার পাড়ি জমাই এই আশায়  

কোনো এক গেরুয়া সূর্যাস্তের পড়ন্ত বিকেলে তোমায় সাক্ষী রেখে 

দিগন্তে অন্তর্হিত হবে অস্তিত্ব আমার সবার অলক্ষে, অনায়াসে |  



© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ০৩.১১.২০২২

ছবি

 বাহবা কুড়োনোর জন্য নয়, ছাদের কার্নিশে হেঁটেছি  

তোমাকে আরেকটু কাছ থেকে দেখতে পাওয়ার লোভে,   

কখনো দারুন রোদে, কখনো অবেলার জলে ভিজে

বারবার দেখেছি তোমায় মুগ্ধ বিস্ময়ে, কিভাবে কবে  

কোন অছিলায়, জানলার ফ্রেমে ধরা সেই অপরূপ

রূপ বেশুমার, বেহিসাবি ব্যস্ততায় পান করেছি প্রানভরে, 

কতশত পিচ্ছিল পথের শেষে, নিদারুন নীরব সংকল্পে, 

ক্ষত বিক্ষত শরীরে পৌঁছে গিয়েছি সবার অগোচরে |


সময়ের ঘাতে বেইমান ঋতু নিয়ত বদলায়, আজ অসহায়   

জানালার ফ্রেমে খুঁজি বারেবার, সেই অপরূপ ছবি, হায় |  

    


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ০৮.১১.২০২২

মঙ্গলবার, ১ নভেম্বর, ২০২২

আস্তর

 কোনো কোনো নিষ্প্রাণ অসহায় রাতে, 

শূন্যতা ফুঁড়ে উঠে আসা আকুতিরা যখন 

শিরদাঁড়া বেয়ে ওঠা-নামার ক্লান্তি ভুলে, 

পাঁজরের এক কোনে জমে থাকা 

মরচে পড়া বিষন্নতা খুঁটে খুচরো যন্ত্রণার মালা গাঁথে, 

নিষ্প্রাণ স্থবির মন রাতের অগোচরে তখন 

তোমার চিহ্ন কুড়োয় আলগোছে, 

আলুথালু তোষকের ছিন্নভিন্ন কার্পাসে |   


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ৩১.১০.২০২২


অনু কবিতা - সংকলন ৪

 দেখেছো দগ্ধ্যাতে আমায়, 

করেছো উদযাপন আমার 

আগুনে ঝলসানো অস্থি, 

আমার অন্তর পোড়া ভস্ম বিনা   

বিজয়ীর তিলক কাটতে 

কোন ছাই দিয়ে, ভেবেছো কি ?


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২১.১০.২০২২




কখনো উদাস নির্জনতায়, কখনো বা ভীরু আনমনে 

খুঁজে ফিরি কম্পিত এক ধূসর অবয়ব ক্ষনে ক্ষনে,   

নিঃসঙ্গতার জোয়ার-ভাটায়, অগোছালো অন্য মনে  

অচেনা মুখের ভিড়ে অথবা অন্তরের গহীন কোনে,

অস্ফূট সেই তুমি ছিলে, আছো নিশিদিন এই প্রাণে |


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ০১.১১.২০২২