রবিবার, ৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

|| প্রারব্ধ ||

আমার বয়স হয় না, হয় খোলসটার,

হিয়ার মধ্যে, বুকের ঠিক এই মাঝখানটাতে  

হলুদ পাখিরা পাখা ঝাপটায় আজও। 


আমার বুদ্ধি বাড়ে না, বাড়ে বলিরেখাগুলো, 

মাথার মধ্যে, ঝিকুটের যাবতীয় দেহকোষ জুড়ে  

নদীর অবিরাম ছলাৎ ছলাৎ শুনি আজও।


আসে পাশে মানুষরা বাড়ে বহরে, বাড়ে বিত্তে, 

আমি বাড়ি না, ভাবি বাড়বই বা কোন সুখে

চারপাশে যন্ত্রণা, এত দুঃখ, আমি বাড়ি কোন মুখে। 


আমার ধৈর্য বাড়ে না, বাড়ে অসুখ,

আমার শৌর্য বাড়ে না, জানুসন্ধির ব্যথাটা     

কিলবিল, স্নায়ুপথ বেয়ে বিস্মৃতির দিগন্তে বিচরণ।


আমার বোধ বাড়ে না, বাড়ে পায়ের ফাটল 

গালে রং মাখি, কখনো ঢং মাখি, ফাঁদ পেতে 

পানকৌড়ির মতো বসে থাকা, অহেতুক।    


হাতে সময় অঢেল, তবু সুযোগ বাড়ে না,

চাঁদমারি তাক করে বসে থাকি, কাঁপা হাত    

নিরুপায়, বিদ্রুপ মাখা শরীরে স্নানঘর আশ্রয়। 


আজকাল আর ব্যথা লাগেনা, লাগে ঘুম

ঘুম, নিঝুম রাত কাটেনা, ভোর ভোর 

বিছানা হাতড়িয়ে খুঁজে ফিরি সেই দোলনাটা।


অথচ, আমার বয়স বাড়ে না, বাড়ে খোলসটার,

হিয়ার মধ্যে, বুকের ঠিক এই মাঝখানটাতে  

হলুদ পাখিরা পাখা ঝাপটায় আজও। 

       


- ভাস্কর ভট্টাচার্য্য 

রবিবার, ২৫শে মাঘ, ১৪৩২

Sunday, 8th February, 2026

সোমবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২৬

ফুটনোট

যেদিন আলাদা হলাম —

কোনো দরজা ভাঙেনি,
শুধু জানালার কাচে জমে
কুয়াশায় ভেজা আকাশ।
যেদিন তুমি চলে গেলে —
একটা বিকেলের মতো,
আলো ছিল, তার চেয়ে
ছায়া ছিল বেশি।
শহরের রাস্তা তখনও
নিজের কাজে ব্যস্ত —
বাস থামছে, চা ফুটছে,
একটা অলস কুকুর ঘুমোচ্ছে
ফুটপাথের ইতিহাসে।
আমাদের আলাদা হওয়া
নজরে আসে না কারো।
তোমার কণ্ঠস্বর
এখনো আছে আমার ভেতর —
ভাঙা থার্মোসের মতো,
গরম নেই,
কিন্তু হাত রাখলে
পুরনো উষ্ণতা মনে পড়ে।
ভালোবাসা কি শেষ হয়?
নাকি সে শুধু
ঠিকানা বদলায় —
একটা বুক থেকে
আরেকটা নিঃশ্বাসে?
রাতে আমি বাতি নিভিয়ে রাখি,
অন্ধকারটা পরিষ্কার লাগে।
তুমি হয়তো এখন
অন্য ঘরে আলো জ্বালাও,
সেই আলোয়
আমার নাম নেই।
আমরা দু’জনেই
নিজ নিজ জীবনে
বেঁচে থাকার চেষ্টায় বাঁচি —
কিন্তু মাঝখানে, শুষ্ক
নদীটার বহমান শূন্যতায়,
সাঁতার কাজে আসে না, শুধু
দুই পাড়ে স্তূপাকার বিরহের দীর্ঘশ্বাস।
তোমার অনুপস্থিতি
এখন আর কান্না নয় —
একটা অভ্যাস,
যেমন সকালে খবরের কাগজ
চা ছাড়াও পড়া যায়,
কিন্তু ঠিক জমে ওঠে না।
কখনো কখনো মনে হয়
তুমি আসবে —
ঠিক যেমন মনে হয়
শীত আবার ফিরবে।
জানি, আসবে না।
তবু শরীর
এক-আধখানা গরম কাপড় খোঁজে।
এভাবেই আলাদা থাকা —
উপন্যাস নয়,
একটা ধীর বাক্য,
যার শেষে অদৃশ্য দাঁড়ি থাকলেও
অর্থ এখনো
সম্পূর্ণ রূপ পায়নি, হয়তো।


- ভাস্কর ভট্টাচার্য্য
শুক্রবার, ২৫শে পৌষ, ১৪৩২

মঙ্গলবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৫

অনু কবিতা - অক্টোবর ২০২৫

দলছুট, প্রায় দিশেহারা তথাপি স্ফুরিত, 
সদা অমলিন তুমি, ফুল ফুটিয়েছো  
নিরুদ এই ঊষর জমিতে নিজ গুনে;
অর্ধ শতাব্দীর উপবাস, দীর্ঘ অপেক্ষার শেষে,    
ফুসফুস ভরি তোমার সুবাসে লালিত 
নীরব সমর্পণে, তোমার অসীম ভালোবাসায়;  
পাওয়া না পাওয়ার বিষন্ন মহাশূন্য পেরিয়ে
নিত্য যা কিছু, ধরা থাক স্মিত তোমার প্রতিবিম্বে। 


==================================


স্মৃতির তো কোনো অবয়ব হয় না
পড়ে তাই তার কোনো ছায়াও রয় না।
তবে ধাওয়া করে কেন ফেরা?
মাঝ রাতে বোবা কান্নায় ঘেরা?
যা কিছু গিয়েছে সরে, বহু দূরে
যে বাঁশি আজ আর বাজে না সুরে,
কি পায় মন অহেতুক হাতড়িয়ে?
সময়ের প্রতিমুখে অযথা সাঁতরিয়ে?
মুঠো খুলে সেই কবে খসেছে যা কিছু,
সময়ের ঝঞ্ঝায় ছাড়ে জেদ যত পিছু,
অশরীরী স্মৃতি রেখে কাল কুঠুরিতে,
মাতো আগামীর রচনায় নব পরিধিতে।
- ভাস্কর ভট্টাচার্য্য
সোমবার, ৪ঠা কার্তিক ১৪৩২


==================================


ঐ চোখ দুটো যেন নীলাভ-সবুজ ঝর্ণাধারার নিস্তব্ধ জল —
গভীর অথচ প্রাণবন্ত, শান্ত অথচ আহ্বানময়।
দৃষ্টির সেই গভীরে যেন লুকিয়ে থাকে
হরিণীর মতো নিষ্পাপ এক বিস্ময়,
ভর করে থাকে অনুরাগের মৃদু অচেনা কম্পন।
চোখ দুটোতে আলো পড়লে, কখনো
তা হারিয়ে যায় সমুদ্রের নীলে, বা কখনো
শিশিরস্নাত সবুজের মতো ঝিকমিক করে ওঠে।
কেবল দেখার জন্য নয়, সেই চোখ
ধরে রাখার, অনুভবে, আবেগের অনুরণনে
মনের গোপন কোণে
যেন অদৃশ্য কোনো টানে
ভিতরভাগের নীরব কষ্ট, কোমল আকুলতা আর আবেশ
ডেকে নিয়ে যায় নীরবে, অদ্ভুত এক কোমল অচেনায়।
খুঁজি অযথাই, সেই দৃষ্টিতে লেখা নেই তেমন কিছুই —
না অভিমান, না আড়াল বা বাসনার অভিসার
শুধু অলক্ষ্যে প্রবাহিত হতে থাকা এক নীরব মায়া।
যেন বারে বারে বলে,
“দু দণ্ড সময় করে চেয়ে দ্যাখো না —
এই চোখে বন্দি হয়ে থাকা এক অনন্ত অপেক্ষা,
সহস্র শতাব্দীর শুন্যতা, অন্তহীন এক নির্বাক ডাক —
মোহনার খোঁজে না হয় হারালাম দুজন”
- ভাস্কর ভট্টাচার্য্য
বৃহস্পতিবার, ১৭ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২

সোমবার, ১৬ জুন, ২০২৫

আহ্লাদ

আমার একটা পাহাড় কেনার খুব শখ, 
সেই কবে থেকেই; একবার 
আমার ভয়ঙ্কর আবদার, ছেলেবেলায়    
কি জানি কি ভেবে, ছোটকাকা 
মুচকি হেঁসে, গাল টিপে দিয়ে বললে, বেশ !  
সে না হয় হবে খন, কিন্তু   
অত বড় পাহাড়টাকে রাখবি কোথায়? 
বললাম, কেন, কয়লা-ভাঙা ঘরের কোণে?
ঝাঁট দিয়ে, বিচুলি পেতে, ঠিক সাজিয়ে নেবো   
পাহাড় ময়লা হবে না, কথা দিচ্ছি।  

আচ্ছা শুনি, তোর কেমন পাহাড় চাই,  
প্রশ্রয়ে যার পর নাই খুশি, বললাম  
আমি বিড়াল ভয় পাই, আমার 
পাহাড়ে যেন বিড়াল না থাকে একটাও; 
বাঘ থাকুক, সাথে উঠোনের চড়ুইগুলোও। 
দিদুন বলে পাহাড়ের গায়ে নাকি শ্যাওলা ধরে 
আমাদের কলতলার ভিজে শ্যাওলার মতো,
তুলতুলে, কালচে সবুজ শ্যাওলা আমার খুব প্রিয়;
নারকেল মালা ঘষে যখন শ্যাওলা ওঠায় জ্যেঠি,    
খুব কষ্ট হয়, আমার টিনের বাক্সে  
কাঁচিয়ে-বাঁচিয়ে শ্যাওলা রাখি খানিক। 
শ্যাওলা মোড়া পাহাড়ী ঝর্ণায়, আমার স্নান 
যখন খুশি, বাবার চোখ রাঙানি         
নেই, 'কি রে আর কতক্ষন জল ঘাটবি'?
পুবের বাগানটার মতো গিজগিজ, সবুজ 
পাহাড়ের কোলে কানামাছি, ভোঁ ভোঁ।  
রাতে নাকি চাঁদ নামে পাহাড়ে, সাথে 
বেমানান কালো দাগগুলো, আমার মায়ের   
গায়েও দেখেছি ওরকম দাগ, চুপচাপ।

আমার পাহাড় হবে সুন্দরী, ছোটোপিসির চাইতেও,   
ইয়া বড় সূর্যের টিপ আর মেঘের নোলক পরে     
আমাকে কোলে নেবে ছোটোপিসির মতো, আমি 
পাহাড়ের গা ঘেঁষে উড়বো, ডানা ঝাপটিয়ে।     
ছেলেরা নাকি পুতুল খেলেনা, সাজিয়ে রাখবো   
রান্না বাটি, কাপড় চোপড়, পুতুলের ঘর, মন চাইলেই  
ঝুলন সাজাবো পাহাড়ের কোনো খাঁজে। 
কাঁড়ি কাঁড়ি বই থাকবে না, কঠিন প্রশ্ন, বেতের ভয়, 
আমি পাহাড়ের গায়ের রোদ্দুর হবো। 
আমার পাহাড় হেডস্যারের মত রুক্ষ হবে না, 
পছন্দের সব ফুল গাছ সাজিয়ে, খুনসুটি দিনভর, 
ফড়িং-মৌমাছিদের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা, সন্ধ্যে        
নামতেই, সিঁদুর ল্যাপা মায়ের কপালের মতো আকাশ, 
কিন্তু হটাৎ পেটে ব্যাথা হলে? তখন মা'কে কোথায় পাই ?  
পাহাড়ে আমার একটা ফুচকাওয়ালা চাই, ঝর্ণার জলে  
তেঁতুল গুলে, একটার বদলে ফাউ দেবে দুটো। 
নক্ষত্রের চাঁদোয়া টাঙানো খোলা আকাশ, গুনে গুনে     
একশো তারা শেষে, কপালে ঠান্ডা হাওয়ার হাত,
যেন মায়ের কোলের নিশ্চিন্তি, স্বপ্ন দেখবো সারা রাত।         

ছেলেবেলায় পাহাড় দেখা হয়নি, বড়বেলার    
পাহাড়গুলো ঠিক আমার পাহাড় নয়, 
প্রতিবার ইতি উতি, হন্যে হয়ে খুঁজি, ছেলেবেলার  
আমার সেই পাহাড়; জানি খুঁজে আমি পাবই, তাই         
বেঁচে থাকুক আমার একটা পাহাড় কেনার শখ।

© ভাস্কর ভট্টাচার্য্য  
শনিবার, ২৩ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩২

রবিবার, ১১ আগস্ট, ২০২৪

चला जाऊंगा

ज़ख्म से जड़ें चद्दर लपेट चला जाऊँगा 

खून से लथपथ जिस्म, गीली आँखों को छुपा लूंगा,

किसी से कोई शिकायत ना करूँगा, चला जाऊँगा

कसम जिंदगी की, अब चला जाऊंगा 


मेरा ना कभी कोई ज़रूरत था यहाँ,

किसी की आफ़त और ना बनूँगा, चला जाऊंगा 

तेरी चौखट पे थोड़ी देर सो लेने दे, ए जिंदगी

वादा रहा, होश लौटते ही चला जाऊंगा |


- भास्कर भट्टाचार्य | १० अगस्त, २०२४

বৃহস্পতিবার, ২০ জুন, ২০২৪

অনু কবিতা সংকলন ৯

তর্ক নিষ্প্রয়োজন, সেই কবেই মেনেছি তোমার মূল্যায়ন   
হতে পারি মূর্খ, আমি হতে পারি নির্বোধ  
তবে, সার কথা কি জানো? ঠিক তোমার মতোই অহর্নিশ,
আমিও হাতড়ে ফিরি বেঁচে থাকার রসদ |


-------------------------------------------------------------------

সোমবার, ১৫ জানুয়ারি, ২০২৪

মরে যাই

 যে খেলায় হেরেছি হেলায়, সময় ভেলায়  

ভেসেছি অজানা সুখের খোঁজে কত বার

যত চাওয়া, ফিরে পাওয়া, সবই মিছে 

তবু চাই যে, মরে যাই যে, বারে বার |    


তবু চাই যে, মরে যাই যে, বারে বার ||


হায় সজনী, দিন রজনী, খুঁজে ফিরি    

তোমাকে তোমার ছায়া থেকে যতবার, 

হাতে হাত, সারা রাত, সেই ধারা বহে 

কারণে কভু অকারণে ভাসে প্রতিবার |  


তবু চাই যে, মরে যাই যে, বারে বার ||    


আবেশের মুঠো ভরা মোর ভালোবাসা,   

কবেই থমকে গেছে, দুয়ারে তোমার   

পড়ে থাকা স্মৃতি রাখা ছাইটুকু দিও শুধু,    

তোমা হতে চাইবার কিছু নাই আমার | 


তবু চাই যে, মরে যাই যে, বারে বার |  

তবু চাই যে, মরে যাই যে, বারে বার ||


সোমবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

ছাই

ভালো লাগে কানায় লেগে থাকা লিপ্সার হলদেটে গন্ধ
উশখুশ লালসার চুঁইয়ে নামা নোনতা স্বাদ ভালো লাগে,
ভালো লাগে অসতর্ক মুহূর্তের রাঙতায় মোড়া নষ্টামী
জীর্ণ ত্বকে কস্তুরী, কামনায় পোড়া রাত ভালো লাগে |
বলিরেখা পিঠে বয়ে ফেরা অসহায়তা একপাশে রেখে
হামাগুড়ি দিয়ে মনের দিগন্তে পৌঁছে যাওয়া ভালো লাগে,
ভালো লাগে বিলি কাটা আরামের স্ফুলিঙ্গ চেখে দেখে
অগোছালো আঁচলের অহেতুক খসে পড়া ভালো লাগে |
শেকলের ফেলে যাওয়া উদাসীন রক্ত জমাট নিথর
অগোছালো বৃষ্টির জলে ধোওয়া অঙ্গীকার ভালো লাগে,
ভালো লাগে হাপুস কান্না ভেজা তারাদের আনাগোনা
গড়ার চাইতে, না জানি কেন আজ ভাঙতে ভালো লাগে |
পলকে বদলে, জানি থাকবে এক আকাশ শূন্যতা, তবু
তোমার উষ্ণ ঘ্রান বুকে ভরে মুহূর্তে বাঁচাটাই ভালো লাগে,
যতবার চোখ পড়ে ওই চোখে, অসাড় যন্ত্রনা সাঁতরে
প্রতিদিন তোমার আগুনে পুড়ে ছাই হতে ভালো লাগে |


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | রবিবার, ০৬ শ্রাবণ, 1430 (23.07.2023)  

ইচ্ছে পাড়ি

যাই বলো বাপু, পড়াশোনাটা বড্ডো ঝক্কির কাজ, 

কালকের চিতায় শুয়ে যেন আজকের আজ | 


বাপের বকুনি তাও সয়, রাঙাজেঠুটাও সেঁকে হাত

পরিবারের নাকি কুলাঙ্গার আমি, শোনায় দিনরাত |


তা বেশ, আমি না হয় ফালতু, আগাছা, জঞ্জাল,

বাকিরা সব মহারথী বুঝি ? নোবেলটারই আকাল ?


সে যাই হোক, কোনো মতে ঘষ্টেশিষ্টে চলি           

বুঝি অপদার্থ আমি, তাই অনেক ভেবেচিন্তে বলি  


লাগুক ভালো ছবির রং, কিম্বা বাঁশির সুর 

- ওসব এক্কেবারে চলবে না,

পারো-না-পারো বাপু, ভুলেও 

- 'পারবো না' কথাটি বলবে না |

 

বলদ-গলায় দড়ির শোভা, কিন্তু আমার গলায় টাই,   

নিজের জন্য বাঁচতে ভুলি, মন খারাপ প্রায়ই |


অসাড় মনের ঘুলঘুলিতে জমা খুচরো অভিমান,  

আমি কি চাই, জানে কি কেউ, কি চায় আমার প্রাণ ?   


তবুও মুখে রা কাটা নেই, নেই ক্ষণিক অবসর,     

শুধু সবার স্বপ্ন সাকার করার পরখ পরের পর | 


আরে বোকা, ডাক্তার নয় ইঞ্জিনিয়ার, কিছু একটা করো, 

বাঁশি বাজিয়ে, মূর্তি গড়ে, কেউ হয়েছে বড়ো ? 


বেশ, তাই হবে, কথা দিচ্ছি, লড়ে যাবো শেষে,   

নাক উঁচিয়েই থাকবে তোমরা, সমাবর্তনে এসে |


কিন্তু জানতে ইচ্ছে করে, ততদিন আমি বাঁচবো তো ?

ওরা কার্নিশ ধরে হাঁটতে বললে, আমি ঠিক পারবো তো ?

যৌনাঙ্গে ছেঁকার জ্বালা, অজানা সে যন্ত্রনা, 

বিষ্ঠা ঘষা মুখে, চোখের জল ধরে রাখতে পারবো তো ?


সে না হয় হলো, যদি আমার মা কে গাল পাড়ে ?

চোখের সামনে মিদনাপুরের রোগা ছেলেটাকে মারে ?

তখন যদি আমার পালাতে ইচ্ছে করে ?

সবার থেকে, এই পৃথিবী থেকে অনেকটা দূরে ?


তখন কি দেবে ছুটি, তোমরা আমায় ? একটু অবসর ?

না না, এখানে নয়, অন্য কোথাও হবে আমার ঘর |

© ভাস্কর ভট্টাচার্য | রবিবার, ০২ ভাদ্র, ১৪৩০ 

20th August 2023, কলকাতা |


শনিবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

অনু কবিতা সংকলন ৮

 যন্ত্রণাকে কবচ করতে শিখিয়েছিলে তুমিই 

দিব্যি দিচ্ছি, চিরঋণী আমি তোমার  

সেই কবেই, আমায় তুমি যত্ন করে না ভাঙলে 

হয়তো বা টুকরো হতাম বার হাজার |   



--------------------------------------------------------------


যন্ত্রণাকে কবচ করতে শিখিয়েছিলে তুমিই 

দিব্যি দিচ্ছি, চিরঋণী আমি তোমার  

সেই কবেই, আমায় তুমি যত্ন করে না ভাঙলে 

হয়তো বা টুকরো হতাম হাজার বার |   


--------------------------------------------------------------

স্থবির, রুক্ষ বৃক্ষশাখার আনাচে কানাচে, সন্তর্পনে  

কখনো শতাব্দী দীর্ঘ নির্মম ইতিহাসে দগ্ধ ইঁটের খাঁজে, 

প্রতি রাত খুঁজে ফেরে তোমারই অশ্রু স্ফুলিঙ্গ |


--------------------------------------------------------------


বুধবার, ১০ মে, ২০২৩

সময়, মানুষ ও ভালোবাসা

 সময় কোথাও যায় না, মানুষ দূরে চলে যায় | 

ভালোবাসার দমবন্ধ করা চিলেকোঠাতেই বাস ভয়ের, 

ভয় হারিয়ে যাওয়ার, হারিয়ে ফ্যালার;  

ভালোবাসায় খালি হাতটাও উল্টোতে ভয় পায় মানুষ; 

বিনিদ্র রাত হাতড়িয়ে, মনের পিঠে হাত বুলিয়ে,  

কাকভোরে ফুসফুসে আস্থার রসদ জমিয়ে ভাবে 

যাক, সে আছে, তার সাথে তার ভালোবাসাও আছে | 

অথচ ভারি অচেনা ঠেকে সেই ভাবনার অনুরণন,  

তাতে উষ্ণতা কম, সংশয়ের শৈত্য যেন ঢের বেশি |

ভালোবাসায় মানুষ বড় একা হয়ে যায়, বড্ড একঘরে;

আঙুলে আঙ্গুল গেঁথে আকাশের তারা গুনতে গুনতেও 

অপরকে হারিয়ে ফ্যালে পেয়ে-হারানোর চোরাবালিতে |

আদর থাকে, অভ্যাসটাও থেকে যায়, অথচ ভালোবাসা      

যত বাড়ে, ভালোবাসার মানুষ যেন আরো দূরে,

হারিয়ে ফ্যালার ভয়েই, হারিয়ে বসে ভালোবাসাকেই |

সময় কোথাও যায় না, মানুষই দূরে চলে যায় |   


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১০.০৪.২০২৩

মঙ্গলবার, ৯ মে, ২০২৩

শুভকামনা

 কখনো অন্যমনে, নির্লিপ্ত অনু ক্ষণে

অবসন্ন অবেলায়, উপেক্ষিত হৃদি কোণে       

হটাৎ মুচড়ে ওঠা স্মৃতির উত্তাল ভিড়ে    

এক খন্ড ছবি যেন ভাসে আনমনে |

বুদ্বুদের মতো টুকরো অতীত, কিছু 

ভারহীন ভাবনারা জড়ো হয় প্রাণে 

যা কিছু ভুল, অযতনে ঝরে যাওয়া ফুল   

একাকী মন ভেজে স্যাঁতসেতে অভিমানে |

তবু, ভাঙা কত জানালার ফাঁক ঢাকা, 

বলিরেখা বরাবর বিবর্ণ হাসি আঁকা,

ভালোবাসা আবছায়া, জড়ো হয়ে দোরে     

বলে যায় নিশিদিন, শুভ হউক প্রতি ক্ষণে |   



© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ০৮.০৫.২০২৩

রবিবার, ২৩ এপ্রিল, ২০২৩

অনু কবিতা - সংকলন ৭

ঘরে তো সকলকেই ফিরতে হয়

চিরায়ত সত্য বই আর কিছু নয়,

তবু আসা যাওয়ার মাঝে এই খেলা

কেউ বলে মায়া, কেউ বলে মেলা,

সময় ফুরোলে ধুলায় যাবো মিশে

যন্ত্রনা নির্মূল, হবে বিষক্ষয় বিষে |




© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২৩.০৪.২০২৩

আকাশ, সিন্ধু, ... নারী

নীল হারায় যেথা দিগন্তের বুকে,

খুঁজেছি সেথায় সুখে আর দুখে;

বারেবার ছুঁয়ে দেখে মুহূর্তরা, 

অপটু পুরুষ মন, দৃষ্টি আনকোরা;     

সূর্যের অচেনা নীল রঙের খোঁজে,    

আলগা অভিমান, ভরসা রোজের;

অমৃতের সন্ধানে কবেই দিয়েছি পাড়ি,   

সাথে আকাশ, পাশে সিন্ধু ... আর নারী |



© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২০.০৪.২০২৩

 

সোমবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩

ভালো আছি

 ভালো আছি, ভালো থাকারই আয়োজন, 

কখনো ডাইনে, কখনো বা বাঁয়ে

হয়তো বা গতিপথের বুক চিরে, একটু ধীরে  

কোন ঘেসে দাঁড়িয়ে একগুঁয়ে ঠায়ে | 


অগুনতি ছায়ালোক পেরিয়ে, নিশুতে 

মাথার বালিশের ধারে বা লেপের কোনে,

চুপটি করে গুটলি পাকানো ধূমকেতুটা 

ভালো থাকার মন্ত্র আওড়ায় যেখানে এক মনে |   


কত শত ভরা কোটালের কালশিটে গায়ে,  

প্রৌঢ় নৌকোর শরীর জুড়ে সজীব কাঠের কাজ,   

ভাবে যদি নতুনের খোঁজে দেওয়া যায় পাড়ি 

আরেকটিবার, গায়ে জোনাকি গাঁথা নতুন সাজ |


হয়তো বসন্ত, নতুবা বিষয়, বাসনা অন্তহীন,

থাকে যদি থাক সব অবসাদ বা জমাট যত গ্লানি,   

অলস উঠোন পেরিয়ে সরু গলি ছাড়ালেই   

বড় রাস্তার মুখে দাঁড়ানো অমরত্বের হাতছানি |


পরাভব যত, অপমান শত শত, কখনো ভাবিনি    

এই চলন অযথা, যত প্রস্তুতি সব নিষ্প্রয়োজন, 

ভোরের আলোয় নতুন তারে ফের কষেছি বীণা,  

ভালো আছি, আসলে সব ভালো থাকারই আয়োজন | 



© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৩.০২.২০২৩

শনিবার, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩

অনু কবিতা - সংকলন ৬

কাঠামটা তো দুর্বল হয়েছে কয়েক দশক আগেই, নিঃশব্দে  

কালের ঝামায় উজ্জ্বল তামাটে ছালটাও ফ্যাকাশে, অচেনা   

ঘোলাটে অতীত, চটচটে যন্ত্রনা আর ধূসর খাঁজগুলির সীমানায়   

জীর্ণ হাপরের বিষন্ন ধোঁয়া আজও বিলোয় মোক্ষলাভের ঠিকানা |




© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৯.১২.২০২২

বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৩

অঙ্গীকার

সেবার সেই যে তুমি কথা দিয়েছিলে পাশে থাকবে   

বহু ব্যবহারে বিবর্ণ ক্যানভাসেও এক সাথে ছবি আঁকবে |  

সকালের চা শেষে, দুজনে দুজনের বলিরেখা গুনবো  

কান পেতে আমাদের পুরোনো ঘড়িটার টিক টিক শুনবো | 


আর একবার পাশবালিশের গন্ডি পেরোনোর দুষ্কর চেষ্টায়,   

কখনো বা অশক্ত আঙুলের শিরাগুলো ছুঁয়ে দেখার শেষটায়,   

টান টান চামড়ার দাপাদাপি শেষে পড়ে থাকা যেটুকু,    

অতি সযত্নে আগলে রাখা একরাশ আস্থা বুকে সেটুকু, 

ঘষা কাঁচে ধুলো মতো জমা যত মলিন স্বপ্ন আর কিছু হাসি, 

দেয়ালের কোন ঘেঁষে পড়ে থাকা অকেজো তুরুপের রাশি, 

কেন গেলোনা তবে শেষ পর্যন্ত ভাগের কষ্ট একসাথে সওয়া ?    

অগুনতি পিঙ্গল ঋতুচক্র শেষে একসাথে পরিণত হওয়া ? 


তুমি সেদিন বড়ো মুখ করে কথা দিয়েছিলে পাশে থাকবে,  

মনে আছে বলেছিলে ধূসর ক্যানভাসেও রঙিন ছবি আঁকবে |  



© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ০৭.১২.২০২২

বৃহস্পতিবার, ২৪ নভেম্বর, ২০২২

অভাব

শৈশবে, বাবার কাছে একটা কথা প্রায়শই শুনতাম | বার বার বলতেন, 'অভাব মানুষকে মহীয়ান করে' !

শিকার করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই, কথাটা আমার এক্কেবারে পছন্দের ছিল না | শৈশবে কথাটির নিগূঢ় অর্থ বুঝতেই পারতাম না | খালি ভাবতাম, বাবার সামর্থের বাইরে কিছু চেয়ে বসলেই ওই অমোঘ বাণী নিশ্চিত আমার দিকে ২০০ কিমি বেগে ধেয়ে আসবে | আর আমার বয়সন্ধিকালে যখন সবার কথার বিরোধিতা করা এবং নিজের ভাবনাটাকে সঠিক প্রমান করাটাকে একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেলাম, তখন সেই অদ্ভুত বাক্যটি শুনলেই বমকে যেতাম | ভাবতাম বাবা 'দারিদ্র্য'-কে অহেতুক রোমান্টিসাইস করার চেষ্টা করছেন এবং খরচ বাঁচানোর ফন্দি হিসেবে ওই বাক্যটি ব্যবহার করছেন | ভাবতাম কি সাংঘাতিক নেগেটিভ একটা ভাবনা জোর করে একটা বাচ্চার মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে | তার আত্মবিশ্বাস আর বড় কিছু করার খিদেটাকেই সমূলে উৎপাটন করার চেষ্টা চলছে | বাবাকে যেহেতু যমের থেকে সামান্য বেশি ভয় পেতাম, তাই মুখের উপর প্রতিবাদ করার সাহস জোগাড় করতে পারতাম না | মুষ্টি বদ্ধ করতেই, সব ক্লেশ নীরব জেদে রূপান্তরিত হয়ে মনের এক কোণে জমা হতে থাকতো | ভাবতাম একদিন বাবার কাছে প্রমান করেই ছাড়বো, প্রাচুর্য্য খারাপ জিনিস নয় এবং অভাব যে অপরিহার্যভাবে মানুষকে মহীয়ান করবেই এর কোনো নিশ্চয়তা নেই|        

ওই কথাটির প্রকৃত অর্থ বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলেছি | তবে দেরিতে হলেও বুঝেছি | বুঝেছি বললে কম বলা হবে, উপলব্ধি করেছি | প্রতিনিয়ত করে চলেছি | 'অভাব' বলতে বাবা কোনোদিন 'দারিদ্র' বোঝাতে চান নি | অভাব বলতে বাবা বারবার 'অসম্পূর্ণ আকাঙ্খা' বা 'অপ্রাপ্ত প্রসিদ্ধি'র কথা বোঝাতে চেয়েছিলেন | অসমাপ্ত স্বপ্নের কথা বা অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে যে ক্ষুদার প্রয়োজন পড়ে, তার কথা বলতে চেয়েছিলেন | একটা ধ্রুব সত্য, একটা মৌলিক অথচ দারুন অনুপ্রেরণা দায়ক ভাবনাকে আমি তখন বুঝতেই পারিনি বা চাইনি | বাবা চলে গিয়েছেন | শেষ পর্যন্ত বাবার পাশেই ছিলাম | তবু মাঝে মাঝে মন কেমন করে, মনে হয় পাশে থেকেও আক্ষরিক অর্থেই কি বাবার "সাথে" কোনোদিন থাকতে পেরেছি ? 

ওঁনাকে, ওনার চিন্তনকে আমি নতুন আলোয় চিনতে শিখছি, প্রতিদিন | কথায় বলে "when you are too close to something, you tend to lose objectivity" | খুব খাঁটি কথা | খুব কাছাকাছিতে দৃষ্টি এবং বোধ, দুটোই বেশ ঘোলাটে হয়ে যায় |  অনেক সময় মানুষের সঠিক মূল্যায়ন করতে গেলে একটু দূরে সরে গিয়ে করতে হয় | বাবা দূরে চলে গিয়ে যেন আরো প্রজ্জ্যল হয়ে আমার জীবনে থেকে গিয়েছেন ধ্রুবতারার মতন |     


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২৩.১১.২০২২

নিছক প্রত্যয়ী

কুয়াশার ঠিক ওপারেই আছো 

ফজরের আজানের সূচনায় তুমি,   

বসন্তের আশু সবুজে আছো 

ঝঞ্ঝা শেষের শান্ত প্রকৃতি তুমি |  

নিকষ ক্লান্তির অবসানে আছো 

কৈশোরের নাছোড় আবদারে তুমি, 

সগর্ভার যন্ত্রনার উপশমে আছো   

নবজাত প্রাণের উন্মেষে তুমি |

আছো মেঘের ক্ষীণ রুপালি রেখায়  

ভীষণ মহামারীর প্রতিষেধকে তুমি, 

ঘন আঁধার জ্বলে তোমার শিখায়  

ভাঙা প্রত্যাশে নব সঞ্জীবন তুমি |  

অনিমেশ আমি নিমেষের খোঁজে 

                                 গভীর আবেশে সিক্ত, 

মুঠো আমার চির মুক্ত জেনো, বারেবার 

                                   করো আমায় রিক্ত | 



© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৬.১১.২০২২

বুধবার, ৯ নভেম্বর, ২০২২

অনু কবিতা - সংকলন ৫

নীলাকাশ যেখানে নিত্য আত্মাহুতি দেয় তোমার উত্তাল বুকে 

নিঃসীম সেই দিগন্তে হারিয়ে যাওয়ার পরমানন্দ পাইনি আজও, 

অকাতর তবুও তোমার বুকে বার বার পাড়ি জমাই এই আশায়  

কোনো এক গেরুয়া সূর্যাস্তের পড়ন্ত বিকেলে তোমায় সাক্ষী রেখে 

দিগন্তে অন্তর্হিত হবে অস্তিত্ব আমার সবার অলক্ষে, অনায়াসে |  



© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ০৩.১১.২০২২

ছবি

 বাহবা কুড়োনোর জন্য নয়, ছাদের কার্নিশে হেঁটেছি  

তোমাকে আরেকটু কাছ থেকে দেখতে পাওয়ার লোভে,   

কখনো দারুন রোদে, কখনো অবেলার জলে ভিজে

বারবার দেখেছি তোমায় মুগ্ধ বিস্ময়ে, কিভাবে কবে  

কোন অছিলায়, জানলার ফ্রেমে ধরা সেই অপরূপ

রূপ বেশুমার, বেহিসাবি ব্যস্ততায় পান করেছি প্রানভরে, 

কতশত পিচ্ছিল পথের শেষে, নিদারুন নীরব সংকল্পে, 

ক্ষত বিক্ষত শরীরে পৌঁছে গিয়েছি সবার অগোচরে |


সময়ের ঘাতে বেইমান ঋতু নিয়ত বদলায়, আজ অসহায়   

জানালার ফ্রেমে খুঁজি বারেবার, সেই অপরূপ ছবি, হায় |  

    


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ০৮.১১.২০২২

মঙ্গলবার, ১ নভেম্বর, ২০২২

আস্তর

 কোনো কোনো নিষ্প্রাণ অসহায় রাতে, 

শূন্যতা ফুঁড়ে উঠে আসা আকুতিরা যখন 

শিরদাঁড়া বেয়ে ওঠা-নামার ক্লান্তি ভুলে, 

পাঁজরের এক কোনে জমে থাকা 

মরচে পড়া বিষন্নতা খুঁটে খুচরো যন্ত্রণার মালা গাঁথে, 

নিষ্প্রাণ স্থবির মন রাতের অগোচরে তখন 

তোমার চিহ্ন কুড়োয় আলগোছে, 

আলুথালু তোষকের ছিন্নভিন্ন কার্পাসে |   


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ৩১.১০.২০২২


অনু কবিতা - সংকলন ৪

 দেখেছো দগ্ধ্যাতে আমায়, 

করেছো উদযাপন আমার 

আগুনে ঝলসানো অস্থি, 

আমার অন্তর পোড়া ভস্ম বিনা   

বিজয়ীর তিলক কাটতে 

কোন ছাই দিয়ে, ভেবেছো কি ?


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২১.১০.২০২২




কখনো উদাস নির্জনতায়, কখনো বা ভীরু আনমনে 

খুঁজে ফিরি কম্পিত এক ধূসর অবয়ব ক্ষনে ক্ষনে,   

নিঃসঙ্গতার জোয়ার-ভাটায়, অগোছালো অন্য মনে  

অচেনা মুখের ভিড়ে অথবা অন্তরের গহীন কোনে,

অস্ফূট সেই তুমি ছিলে, আছো নিশিদিন এই প্রাণে |


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ০১.১১.২০২২  

মঙ্গলবার, ২৫ অক্টোবর, ২০২২

একতা কাপুর এবং বাঙালি মধ্যবিত্ত্বের 'বাড়ির পুজো'

 ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রাম খুললেই দুর্গোৎসবের দারুন সব ছবি | ঝকঝকে, দৃষ্টিনন্দন, রুচিপূর্ণ, আনন্দদায়ক | আমার ছোটবেলার দূর্গা পুজোর স্মৃতি প্রধানত বারোয়ারি পুজোর বা ক্লাবের পুজোর | যদিও গুটিকয়েক সমৃদ্ধিশালী, সাবেকি, বর্ধিষ্ণু এবং বুনিয়াদি ধনী পরিবারের পুজো তাদের নিজস্ব ঠাকুর দালানেই হতো | অবশ্য সেরকম বাড়ির পুজো ছিল হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র | লক্ষ্মী পুজোটাই বরঞ্চ মধ্যবিত্ত্ব গৃহীর বাড়িতে ঘটা করে করার রেওয়াজ ছিল | 

এখন কিন্তু প্রচুর (উচ্চ)মধ্যবিত্ত পরিবার বাড়িতেই রীতিমতো দুর্গাপুজোর আয়োজন করছেন | পাড়ার সরস্বতী আর শীতলা পুজোয় পারদর্শী পুরোহিত বাড়ির দূর্গা পুজো কতটা রীতিনীতি বা বিশুদ্ধ পদ্ধতি মেনে করতে পারছেন তা বলতে পারবোনা | তাতে অনাচার কতটা হচ্ছে বা আদৌ হচ্ছে কিনা তাও বলতে পারবো না | তবে গৃহী এবং গৃহিণীর নিষ্ঠা কিন্তু দেখার মতো এবং প্রভূত প্রশংসার যোগ্য | যাবতীয় তোড়জোড়, সাজগোজ, শোনা গয়না, ঢাক কাঁসর, ধুপ ধুনো, মন্ত্রপাঠ, লোকজন, চন্ডী স্তোত্র আর রবির গান থেকে শুরু করে উদ্দাম ধুনুচি নাচ আর আশা ভোঁসলের 'উরি উরি বাবা' - সব মিলিয়ে একটা মার্ কাটারি ব্যাপার | মধ্যবিত্ত বাড়ির পুজোর দৃশ্যগুলো যেন একতা কাপুরের পারিবারিক টেলিসিরিয়ালগুলির এক একটি সেটের চকচকে স্থিরচিত্র | আমার মনে হয় প্রধান তিনটি কারণে মধ্যবিত্ত্ব পরিবারগুলি এখন বাড়িতে দুগ্গোপূজোর আয়োজন করতে শুরু করেছেন: 

১) পুণ্যি হয় সরাসরি এবং অর্থ ব্যয়ের সমানুপাতিক | অনেকের চাঁদার অর্থে আয়োজিত বারোয়ারি পুজোয় পুণ্যি ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে | বাড়ির পুজোয় সে হ্যাপা কম | গৃহী যেহেতু সব খরচ বহন করছেন, আশা করা যায় তার এবং তার পরিবারের পুণ্যির সম্ভাবনা সব চেয়ে বেশি এবং খরচের সমানুপাতিক |

২) সামাজিক পরিচিত বাড়ে এবং প্রতিষ্ঠা সুদৃঢ় হয় | ছোটবেলায় যখন আমাদের বাড়িতে বিদ্যুতের আলো এসে পৌঁছয় নি, তখন অমুক মহাশয়ের বাড়িতে একটি এম্বাসেডর বা ফিয়াট গাড়ি আছে শুনলেই ছুটতাম একটিবার ঐ অপূর্ব বাহন দেখতে পাওয়ার লোভে | এবং আমরা নিশ্চিত হতাম এই গাড়ির মালিক নির্ঘাত একজন কেষ্ট-বিষ্টু | আজকাল বোধয় কেষ্ট-বিষ্টুর তকমা পেতে গেলে বাড়িতে দুগ্গোৎসব আয়োজনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে |   

৩) উৎসবের মোড়কে মোচ্ছব | আমরা তুখোড় আড্ডাবাজ, যাই বলুন না কেন | যখন হাত শূন্য ছিল তখন ক্লাবের পুজোতেই সময় করে, বয়োজ্যেষ্ঠদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি আর করা শাসন এড়িয়ে, মোচ্ছব চলতো অল্পস্বল্প | ভোর রাতে চোরের মতো বাড়ি ঢোকার আগে ভালো করে দেখে নেওয়া হতো বাবা-জ্যাঠারা  শুয়ে পড়েছেন কিনা | এখন অর্থের অভাব কমেছে, কামাই-টামাই বেড়েছে | বাড়িতে একটা পুজো করে ফেলতে পারলেই ব্যাস - পুণ্যি-টুনি তো হবেই, লোকেও জানবে ধর্মের প্রতি আমার অগাধ দায়বদ্ধতা আর নিষ্ঠার কথা, আমার সামাজিক প্রতিষ্ঠা আর প্রতিপত্তির কথা | তার সাথে হপ্তাখানেকের বাঁধনহীন মোচ্ছব | 

পাড়ায় পাড়ায় মধ্যবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারগুলির বাড়িতে দুগ্গোপুজোর আয়োজনের কারন অন্য আরো কিছু হতেই পারে | আমার জানা নেই | বন্ধুদের গোচরে থাকলে জানাবেন | সমৃদ্ধ হবো |                 

আমি কিন্তু অসূয়াপূর্ন বা cynical হয়ে যাইনি | বিশ্বাস করুন দু-একটা পুজোতে আমিও সাদা পাঞ্জাবিতে ভালো সুগন্ধ মেখেই গিয়েছি | ঢাকের তালে ধুনুচি নৃত্যও করেছি সাধ্যমতো | সুন্দর কিছু দৃশ্য ও মানুষ ক্যামেরাবন্দিও করেছি | সব মিলিয়ে, মজাই পাচ্ছি | চলতে থাকুক | মধ্যবিত্ত বাঙালি গৃহস্তের বাড়ির দূর্গা পুজো যুগ যুগ জিয়ো |    



© ভাস্কর ভট্টাচার্য | অষ্টমীর আড্ডা | ০৩.১০.২০২২

রবিবার, ২৩ অক্টোবর, ২০২২

পরিচয়

বারুইপুর পৌঁছতে বেলা হবে | অনেকটা পথ | সকাল সকাল বেরোতে পারলেই ভালো | বাবাকে রেখে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে যাবে | সন্ধেবেলা আবার একটা ইনভিটেশন আছে জন্মদিনের | ছেলের স্কুলের বন্ধুর বাবার পঁচাত্তরতম জন্মদিন | একটা ভালো গিফট কিনতে হবে, সাথে একটা রজনীগন্ধার বোকে আর রসময়ের কাঁচাগোল্লা | ভদ্রলোক নাকি রজনীগন্ধা আর কাঁচাগোল্লা খুব পছন্দ করেন | সকাল থেকেই তাড়া লাগাচ্ছি, কিন্তু বাবার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই | উনি ওনার দুলকি চালেই চলেছেন | আজ যেন আরো শ্লথ | উফ্ফ, এতো বিরক্তি লাগে যে কি বলবো |
কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে ধরে গাড়ি ছুটিয়ে চলেছি | আমি ড: পবিত্র চট্টোপাধ্যায়, ভারতবর্ষের একজন স্বনামধন্য পালিওন্টোলজিস্ট | জীবাশ্ম বা ফসিল্স নিয়েই আমার কাজ | আমার স্ত্রী রক্তিমা, উত্তর কলকাতার একটি সরকারি কলেজের রসায়ন ডিপার্টমেন্টের বিভাগীয় প্রধান | আমাদের একটিই সন্তান | নামি ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ক্লাস ফাইভের ছাত্র | আজ পর্যন্ত কখনো দ্বিতীয় হয়নি রিজু | রণদীপ ওর পোশাকি নাম | আমাদের বিশ্বাস জীবনে ও অনেক বড়ো হবে | ও অবশ্য ওর ঠাকুরদার সবচেয়ে প্রিয় | রিজুরও 'দাদাই' অন্ত প্রাণ | আমরা জানতাম ও নিশ্চিত একটু আধটু কষ্ট পাবে | তবে গত এক সপ্তাহ ধরে ও যে এতটা চুপসে যাবে, সেটা আমরা একেবারেই অনুমান করতে পারিনি | নানা ভাবে চেষ্টা করে গেছি ওর মনমরা ভাবটাকে কাটানোর | কিন্তু কিছুতেও কিছু হয়নি | আজ থেকে যে ওর দাদাইয়ের কাছে আর গল্প শুনতে শুনতে ঘুমাতে যেতে পারবেনা বা ইস্কুলের বন্ধুদের সাথে ঝগড়ার যাবতীয় বিবরণ ভাগ করে নিতে পারবেনা সেটা বুঝতে পেরেছে | আজে ওর দাদাই ওর থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে | বৃদ্ধাশ্রমের নামটা কিন্তু আমার বাবা নিজেই সাজেস্ট করেছিলেন |
একদিন ইনস্টিটিউট থেকে আমি বাড়ি ফেরার পর আমাকে ডেকে নিজেই বলেছিলেন, "শোন বাবু, বয়সের সাথে সাথে মানুষের অনেক সমস্যা হয় | তোরা মারাত্মক ব্যস্ত | তোদের অনেক কাজ | আমি কোনো কাজের নই | আমি তোদের সাথে থাকলে তোদের সমস্যা হওয়াটাই স্বাভাবিক | আমি সেটা বুঝতে পারছি গত কিছু বছর | দাদুভাইও এবার সিক্সএ উঠবে | পড়াশোনার চাপ বাড়ছে | আমার জন্য হয়তো ওর অনেকটা সময় অপচয় হচ্ছে | তারপর দ্যাখ আগামী দিনে ওর পড়াশোনার খরচও বাড়বে | আমার ওষুধ-পথ্যের খরচও দিন দিন বেড়েই চলেছে | তোরাই বা পেরে উঠবি কেন ? তার চেয়ে বরং আমি একটা আবাসিক আশ্রমে গিয়ে থাকি | সবার সুযোগ সুবিধা মতো দেখা হবে | কাজের মানুষরা কাজে মন দিতে পারবে আর আমি আমার অকাজগুলোতে | সমবয়সীদের সাথে থাকবো, মন্দ লাগবেনা | তোদের কথা খুব বেশি মনে পড়লে, আমি বরঞ্চ তোদের সুবিধা মতো তোদের সাথে ফোনে কথা বলে নেবোখন | সরকার যেটুকু পেনশন দেয়, আমার বেশ চলে যাবে, বুঝলি ? আর তো ব্যাস কয়েকটা দিন |
প্রতীক্ষা | বারুইপুরের এই আশ্রমটির বেশ নাম আছে | আমার ইনস্টিটিউটএর সিনিয়র কলিগ ধুর্জটিদা সার্টিফাই করলেন | ওনার এক দুঃসম্পর্কের মামাও ওখানেই আছেন গত আট বছর | প্রশস্ত, নিরাপদ এবং সব আধুনিক সুবিধাযুক্ত | সব চেয়ে মজাদার কথা হচ্ছে যে আশ্রমটিতে দুটি পাশাপাশি ভবনে দু ধরনের আবাসিকদের থাকার ব্যবস্থা আছে - একটিতে থাকেন বয়জ্যেষ্ঠরা অপরটিতে অনাথ শিশুরা | পরিচালক এবং ব্যবস্থাপক একই মানুষ | ড: অরিন্দম দাসগুপ্ত এখন একজন অশীতিপর বৃদ্ধ | শুনেছি কৃতি ছাত্র ছিলেন | বছর চল্লিশ আগে ফিলাডেলফিয়ার একটি বিখ্যাত ফার্মা রিসার্চ কোম্পানির দামি চাকরি ছেড়ে দেশে ফিরে শুরু করেছিলেন এই আবাসনটি | শুরুতে কিছু অনাথ শিশুদের ঠাঁই দিয়েছিলেন | বছর দশ পরে সুযোগ করে দিয়েছিলেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদেরও | বাবারই পছন্দ অরিন্দম বাবুর জায়গাটা | একদিকে ভালোই হলো - খারাপ হলে অন্তত তার দায়িত্ব আমার উপর বর্তাবে না |
আশ্রমে পৌঁছতেই, বাবার জিনিসপত্র নামিয়ে নেওয়া হলো | আর এয়ার-কন্ডিশনড অফিস ঘরে আমাদের বসার ব্যবস্থা হলো, প্রাথমিক কিছু প্রক্রিয়া এবং সইসাবুদ খতম করার জন্য | দেয়াল ঘড়িতে তখন দেড়টা বাজতে মিনিট দুয়েক বাকি | মনে মনে ভাবছি তাড়াতাড়ি কাজটা চুকলে বাঁচি, এমন সময় ম্যানেজার এসে জানালেন অরিন্দম বাবু মালিদের সাথে একটু কথা সেরেই আসছেন | আশ্রমের বাগানের ক্ষতি না করে কি ভাবে এবারের দূর্গা পুজোটা আরেকটু বড়ো করে করা যায়, তারই প্ল্যানিং চলছে | কফি খেতে খেতে চেয়ারে আরেকটু আরাম করে যখন বসছি, খেয়াল করলাম বাবা উঠে পড়েছেন | রিজুর কাঁধে হাত রেখে বললেন, "চলো দাদুভাই, একটু বাগানটা দেখে আসি" | বাবার এই চঞ্চলতাটা, আর সব ব্যাপারে ওভার কনফিডেন্সটাই মেনে নিতে পারিনা | কি দরকার একটা অচেনা জায়গায় ঘুরে বেড়ানোর | আর তো কয়েকটা মুহূর্ত, শান্ত হয়ে বসে থাকতে সমস্যা কোথায়, কে জানে | যাক, ভাবলাম নাতির সাথে আবার কবে দেখা হবে তার ঠিক নেই | যাক দুজনে একসাথে একটু সময় কাটাক |
দেখতে দেখতে প্রায় দশ মিনিট কেটে গেলো | দেরি হয়ে যাচ্ছে | একটু চিন্তাও হচ্ছে | রুবিও (আমার স্ত্রী রক্তিমার ডাক নাম) বললো, "যাও একটু দেখো | বয়সের সাথে সাথে মানুষ কেন যে এরকম আক্কেলহীন হয়ে যায় কে জানে"| যে পথে বাবা আর রিজু গিয়েছিলো সেইদিকে এগিয়ে গেলাম | অন্দরের দরজা পার করে, লম্বা বারান্দা পেরোতেই, একটা বড়ো কাঠের দরজার ওপারে কয়েকধাপ নিচু সিঁড়ি নেমে মিশে গেছে একটা বেশ প্রশস্থ শুড়কির রাস্তায় | বোঝাই যায় রাস্তাটা বেশ বড়ো একটি বাগানে গিয়ে শেষ হয়েছে | চারিদিক গাঢ় সবুজ, অনেক ছোট বড়ো গাছগাছালির দৌলতে | ছেলের নাম ধরে ডাকতে যাবো, এমন সময় হটাৎই দূরে নজরে পড়লো বাগানটার অপর প্রান্তে দুটো দৃশ্যের দিকে | একটিতে রিজু অনেকগুলো বাচ্চা কাচ্চার সাথে মাটিতে বসেই কি সব যেন খেলছে | আর বাবা পাশেই একটা আম গাছের ছায়ায় হাত পা নাড়িয়ে আরেকজন সৌম্যদর্শন বৃদ্ধের সাথে খোশগল্প করছেন | দুজনের মুখের হাঁসি দেখে মনে হলো নিশ্চই খুব মজার কোনো কথা নিয়ে আলোচনা চলছে | এতো স্বল্প সময়েও বাবা এখানে বন্ধুত্ব পাতিয়ে নিয়েছেন দেখছি | হাত এ প্রচুর অবকাশ থাকলে যা হয়, আর কি | আমি কাছে যেতেই, বাবা আমাদের দুজনকে একে ওপরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন, "ইনিই অরিন্দমবাবু | আর ও'ই পবিত্র"| আমি নমস্কার করেই বাবার দিকে ফিরে বললাম, "তোমার কি কান্ডজ্ঞান নেই, বলো তো ? আমাদের তাড়াতাড়ি ফেরা দরকার, কতবার বলেছি তোমাকে"| দুজনেই একটু অপ্রস্তুত হলেন, বুঝতে পারলাম | আসলে সব বৃদ্ধরই একই সমস্যা - অন্যের সময়ের মূল্য দিতে জানেন না |
সব প্রক্রিয়া সারতে সারতে আরো ঘন্টা খানেক লেগে গেলো | বাবার ঘরটা বেশ সুন্দর, খোলামেলা | বছর পঁয়ষট্টির আরেক বৃদ্ধ বাবার রুমমেট | বেরিয়ে আসার সময় বাবা আর রিজু একে অপরকে জড়িয়ে ধরে খুব কাঁদলো | আমি কোনোদিন বাবাকে কাঁদতে দেখিনি | একটু অদ্ভুত লাগলো | রিজুকে শান্ত করতে আমাদের বেশ বেগ পেতে হবে বুঝতেই পারছি | যাই হোক, যার শেষ ভালো তার সব ভালো | রুবিও দেখলাম অনেক বছর পর বাবার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করলো | আমিও ইতস্তত করতে করতে প্রণামটা করেই ফেললাম | এবার যাওয়ার পালা | অরিন্দম বাবুকে বলে রাখলাম প্রয়োজন পড়লেই ফোন করবেন আর একটু সময় দেবেন, অনেকটা দূর থেকে আসতে হবে তো, তাই | বাবার কিছু পয়সাকড়ি লাগবে কিনা জিজ্ঞেস করতেই মানা করে বললেন, "তোরা ভালো থাকিস, সাবধানে থাকিস, দাদুভাইকে ভালো করে মানুষ করিস, তাহলেই হবে | আমি এদিকটা সামলে নেবো |" বেশি সাহিত্য নিয়ে পড়াশোনা করার এই সমস্যা - জায়গা বিশেষে বাবা নাটকীয় না হয়ে পারবেনই না | যাক গে, ঝামেলা চুকিয়ে সবাই গাড়িতে ওঠার জন্য এগিয়ে গেলাম | রিজুকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে গাড়িতে তুলতে হলো | কিন্তু অনেক্ষন ধরে মাথায় ঘুরতে থাকা একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আরেকবার আমি গাড়ি থেকে নামলাম | বাবা ততক্ষনে ভিতরে চলে গিয়েছেন | হয়তো রিজুর আচরণ আর কান্না ওনাকে বিহ্বল করে দিচ্ছিলো | অরিন্দম বাবু কিন্তু ঠায় দাঁড়িয়ে আছেন, অপলক দৃষ্টিতে আমাদের গাড়ির দিকে তাকিয়ে | যেন আমরা এক একজন অপরাধী এবং ওনার করুনার পাত্র | আমার ওনার তাকানোটা একদম ভালো লাগছে না | আমি ওনার দিকে এগিয়ে গেলাম | আরেকবার নমস্কার করার ভঙ্গিতে বললাম, অরিন্দম বাবু আমাকে খারাপ ভাববেন না, পরিস্থিতির চাপে পড়েই অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তাই না? "সে তো বটেই", সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়ে উনিও প্রতিনমস্কার করলেন | আমি সুযোগ বুঝে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা আমার বাবা কোথা থেকে আপনাদের এই প্রতিষ্ঠানতার কথা জেনেছেন বলতে পারেন ? উনি কিন্তু আমাদের কিছুই বলেন নি | আজ দেখলাম, বাবা আর আপনি বাগানে আড্ডায় মশগুল, যেন অনেকদিনের পরিচয় | ব্যাপারটা কি বলুন তো | অরিন্দম বাবু চোখের পাতা না ফেলে বেশ খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে আছেন দেখে বললাম, ক্ষমা করবেন প্রশ্নটা করা বোধয় আমার উচিত হয়নি | আচ্ছা চলি | অরিন্দম বাবু যেন মুহূর্তে সম্বিৎ ফিরে পেলেন | মৃদু হেসে বললেন, "না না, কোনো অনুচিত প্রশ্ন করেন নি | আপনি সন্তান, আপনার জানার অধিকার আছে | হ্যাঁ, ঠিক বলেছেন | আপনার বাবার সাথে আমার অনেক দিনের চেনা জানা | প্রথম পরিচয় প্রায় আটতিরিশ বছর আগে, যেদিন আপনার বাবা, আপনার মাকে সঙ্গে করে প্রথমবার আমার আশ্রমে এসেছিলেন | সেদিনের সেই নিঃসন্তান দম্পতি আমার কাছে এসেছিলেন একটি অনাথ শিশুকে দত্তক নিতে | আবাসিকদের মধ্যে সবচেয়ে চুপচাপ, চাপা গায়ের রং আর ছোট্টোখাট্টো, প্রায় বিষন্ন একটি শিশুকে পাগলের মতো আদর করতে করতে দুজনে মিলে বাড়ি নিয়ে গেছিলেন | তারপরও যোগাযোগ ছিল | বহুবার কথা হয়েছে | ওনারাও অনেকবার এখানে এসেছেন | সাধ্যমতো আমাদের সহায়তা করেছেন | অনেক আবেগ, ত্যাগ আর স্নেহর সংমিশ্রনে সন্তান মানুষ করেছেন শুনেছিলাম | অনেক ভেবেচিন্তে দত্তক নেওয়া সন্তানের নাম রেখেছিলে 'পবিত্র' | আজ আপনার সাথে আমার পরিচয় হলো, পবিত্রবাবু | ভালো থাকবেন" |


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | রবিবারের ছোটগপ্পো | ০২.১০.২০২২

রবিবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২২

অনু কবিতা - সংকলন ৩

|| প্রতীক্ষা || 


রামধনুর নোলক পরে, সেই যে মেঘের ওড়না জড়ালে, তারপর 

অগুনতি নিঃসঙ্গ নিশুতি পেরিয়ে বিষণ্ণ দরবারী কানাড়া

যখন সারেঙ্গীর তার ছুঁয়ে শেষ রাতে ললিতের সন্ধানে বেরোতো    

বার বার, কতবার তারাদের ভিড়ে তন্ন তন্ন খুঁজেছি তোমায় |

যদি একবার অগোচরে খসে পড়ে অভিমানের ওড়না, ভোর রাতে 

ঘুম ভেঙে চাঁদের আলোয় যদি করি স্নান, আলোর চন্দনে 

সেজে ওঠা তোমার মুখ কাছ থেকে দেখবো একবার, প্রতিবার 

তুমি দেবে অঞ্জলি, আমি শুধু দেখবো তোমায়, ফিরে এসো একবার |      

        

© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ৩০.০৯.২০২২

   

  


|| আমার শহর, তোমার শহর ||

            

আমার শহর, তোমার শহর, প্রাণের শহর, একলা শহর,

আলোর শহর, অবাক শহর, বেবাক শহর, একলা শহর,

গানের শহর, টানের শহর, মানের শহর, একলা শহর, 

রবির শহর, রাতের শহর, তারার শহর, একলার শহর, 

পুজোর শহর, প্রেমের শহর, ক্ষোভের শহর, এই শহর,

আমার শহর, তোমার শহর, প্রাণের শহর, একলা শহর |


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ৩০.০৯.২০২২

সোমবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২২

অনু কবিতা - সংকলন ২

 সাহস লাগে এক আকাশ লক্ষ তারা গুনতে ,

স্পর্ধা লাগে অন্ধকারে আলোর মালা বুনতে | 

সাহস বিনে কিসের জোরে ঝড়ের সাথে লড়াই ?  

স্পর্ধা বিনে কোন সাহসে ভালোবাসার বড়াই ?


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২১.০৯.২০২২


===============================================================


বদনাম তো সেদিনই হয়েছিলাম, প্রিয়  

তোমার উঠোনে যেদিন পা রেখেছিলাম,

কখনো তোমাতে, কখনো তোমার ছায়ায় 

বেঁচে থাকার খোরাক খুঁজেছিলাম |

ওপথ সরল নয়, সুদীর্ঘ, তা কি মানিনে ?

সমান্তরালের নৈরাশা, তা কি জানিনে ?

নৈরাশ্যের পথ্য একটাই, কেবল আশা 

ভালোবাসার অজুহাত, শুধুই ভালোবাসা 

বদনাম তো সেদিনই হয়েছিলাম, তোমার 

বুকে যেদিন এক ফালি জমি খুঁজেছিলাম | 


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ২৬.০৯.২০২২

শনিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর, ২০২২

খলনায়ক

অসুর | নামটি নিশ্চই শোনা ?

খুব সম্ভবত খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০-২০০০ সালে রচিত বৈদিক সাহিত্যে প্রথম 'অসুর' ধারণাটির উল্লেখ পাওয়া যায় | এক্কেবারে শুরুর দিকে পূর্ণতাপ্রাপ্ত মানব বা দিব্য ক্ষমতাসম্পন্ন বলশালী সুনায়কোচিত অগ্রনেতাকে অসুর নামে উল্লেখ করা হলেও পরবর্তী সময়ে অসুররা বৈদিক দেবতাদের বিরোধীপক্ষ হিসেবেই আখ্যাত হন | পরবর্তীকালে দেবতাদের উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি আর অসুরদের স্খলন ঘটতে থাকে | সময়ের সাথে সাথে অসুরদের জন্য পরিস্থিতি এতোটাই প্রতিকূল হয়ে পড়ে যে পরিণামে শ্রুতিসাহিত্য এবং পৌরাণিক কাহিনীসমূহে অসুরদের দৈত্য, রাক্ষস, পিশাচ, ইত্যাদি নামেই বর্ণন করা হয় | অমৃতমন্থন নিয়ে অসুর-দেবতার অন্তহীন কলহ তো সর্বজনবিদিত | দারুন মজার কথা হচ্ছে যে, লভ্য তথ্য অনুযায়ী, পারস্যে (এখনকার ইরান) এই প্যাটার্নটা কিন্তু একদম বিপরীতমুখী পথে অগ্রসর হয় | সেখানে কালক্রমে অসুর'রা সর্বোচ্চ দেবতা এবং দেব'রা নিকৃষ্ট রাক্ষস হিসেবে পরিচিত হন |
লক্ষ্য করার বিষয়, রাম-রাবনের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা | কেউ কেউ রামকে শ্রেষ্ঠ এবং উত্তম পুরুষ মানেন, কেউ কেউ আবার রাবন কে | এই একটি বিষয়ে কিন্তু ভারতের একাধিক প্রান্ত, সমষ্টি বা সম্প্রদায় এক্কেবারে ভিন্ন মত পোষণ করে | কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠীগুলো প্রায় আড়াআড়ি বিভক্তও হয়ে যায় | কোনটা সত্যি আর কোনটা বিকৃতি, সেটা বোঝা প্রায় অসম্ভব | কোনটা প্রকৃত এবং অকল্পিত আর কোনটা নির্মিত সত্য, সেটাও বোঝা দায় | পুরোটাই দৃষ্টিকোণ বা পরিপ্রেক্ষিতের ব্যাপার, তাই না ?
তবে একটা জিনিস বেশ বুঝি - নায়কের উদ্ভাস একমাত্র খলনায়কের উপস্থিতিতেই সম্ভব | খলনায়কের অসংযম এবং অমিতাচারেই নায়কের উত্থান সূত্র লুকিয়ে থাকে | কালোর অবর্তমানে সাদার মান থাকে না | নায়ক এবং খলনায়ক একে ওপরের 'রেফারেন্স ফ্রেম' | কে নায়ক আর কে খলনায়ক তা বিচার করা বেশ দুরূহ | তবু খলনায়ক ছাড়া নায়ক অসম্পূর্ণ, নিতান্ত পানসে | তাই মহিষাসুর হোক, রাবন হোক বা গব্বর সিং - যুগ যুগ ধরে, সযত্নে, খলনায়কের নির্মাণ ঘটে, নায়কের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করতে | প্রকৃত নিকৃষ্ট পুরুষ বাজারে উপলব্ধ না হলে, হাতের সামনে উপস্থিত অমুক সেরা বিকল্পকেই বেছে নিয়ে বেচারার মধ্যেই খলনায়কের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা হয় | হাজার হাজার বছরের পুরোনো এই রীতির বা পদ্ধতির কোনো পরিবর্তন হয়নি | এই খলনায়ক নির্মাণ করার পদ্ধতি নিয়ে না হয় অন্য একদিন গল্প করা যাবে |
তো, হটাৎ অসুর নিয়ে পড়লাম কেন ? আরে না না, সেরকম কিছু নয় - কোনো বৈপ্লবিক কিছু ভাবছি না | দুগ্গো পুজো আসছে | মনে কাশফুল ফুটছে | ছোটবেলা থেকেই অসুরকে আমার খুব আকর্ষণীয় এবং কৌতূহলোদ্দীপক লাগে | নিজের অজান্তেই দেবতাদের থেকে বেশি ছবি বোধহয় অসুরের তুলে ফেলি | এমনকি কোনো কোনো অসতর্ক মুহূর্তে অসুরকে লক্ষ্য করে হাত জোড়ও করে ফেলেছি ছোটবেলায় | মনে হয় সব দেব দেবীদের সম্বন্ধে এতো কিছু জানতে পারি, কিন্তু অসুরদের সম্বন্ধে যথেষ্ট জানি কি ? আজকাল অসুরের দিকে তাকিয়ে থাকলে "হীরক রাজার দেশে"র একটা সংলাপের অংশ মুখ থেকে প্রায় স্বগতোক্তির মতো বেরিয়ে আসে - "ভালো মন্দের বিচার করে কে ?"


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | রবিবারের আড্ডা | ১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২২

রবিবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আমি, আমার সবুজ বন্ধুরা আর অসম্পূর্ণতা

ফুলের আগুনেই কি বনানীর পূর্ণতা ? পুষ্পোদ্গম ক্ষিতিজই কি পরম পরিপূর্ণতার একমাত্র শর্ত ? যে বৃক্ষের ফুল মোটে আসেই না, বা সহজে আসতে চায়না, তাদের কি ? তাদের স্থান এবং মর্যাদা কি তলানির কাছাকাছি ? 

জন্মালে মরতেই হবে | অমোঘ সত্য | জন্মানোর সার্থকতা কি শুধুই সহজাত দক্ষতার প্রকাশ, সামাজিক প্রতিষ্ঠা, জগৎ ব্যাপি পরিচিতি আর খ্যাতি, অর্থনৈতিক শ্ৰীবৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ ? যাদের এই জনমে রবীন্দ্রনাথ, রবিশঙ্কর, মেঘনাথ সাহা বা তেন্ডুলকর হয়ে ওঠা হলো না ? যে নারী মা হয়ে উঠতে পারলেন না কিম্বা হতে চাইলেন না ? যে পুরুষ অমানুষিক পরিশ্রম আর নিরলস প্রচেষ্টা সত্ত্বেও পরিবারের কাছে আদর্শপুরুষ হয়ে উঠতে পারলেন না ? যে শিশু জীবনের যাঁতাকলে পিষেও সমাজের তৈরী কাঠামো ও মান অনুযায়ী নিজেকে প্রমান করতে সক্ষম হলো না ? তাদের জীবন কি অসম্পূর্ণ ? এই ধোঁয়াটে প্রশ্নের উত্তরও অস্পষ্ট, কুয়াশাবৃত | 

সম্পূর্ণতার সংজ্ঞা আমার জানা নেই | তবে অসম্পূর্ণতার লাবণ্যও কিন্তু কম নয় | একটু ভালো করে ভেবে দেখলে, সাফল্যের তুলনায় যে অসফলতার মাধুর্য্য কোনো অংশে কম নয়, তা বেশ বোঝা যায় | কুমোরটুলিতে কাঠামোয় লেপ্টে থাকা মাটির পরিত্যক্ত প্রতিমা দেখেছেন ? কোনো মণ্ডন বা অলঙ্করণ ছাড়াই ? কোনো কারনে হয়তো সেই অসম্পূর্ণ মূর্তি প্রতিমায় রূপান্তরিত হয়নি | তার প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়নি | সেবা-আরাধনা-অর্চনা হয়নি | তবু সেই মূর্তি অপরূপা | আমার কাছে নৈসর্গিক এবং সম্পূর্ণ | 

সবাই মিলে কি সেই অপরূপ অসম্পূর্ণতাকেও উদযাপন করা যায় না ?  


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৭.০৯.২০২২ 

বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

জন্ম চিহ্ন

শেষ যেবার রাত ভোর বিবস্ত্র করে 

জন্ম চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করেছিলে, 

প্রতিবাদ করতেই, মানুষ চেনার

এটাই নাকি সাচ্চা উপায়, বলেছিলে |


অন্ধকারের আলোয়, থুতনির খাঁজে 

বাদামি তিলটাকে দেখে বলেছিলে,

অনুরত পুরুষের অমন তিল অশালীন 

নির্ঘাত বেহায়া চরিত্রহীন ভেবেছিলে |    


আমি যে তোমার যোগ্য, প্রমান হোক  

হয়ত তাই মনে মনে চেয়েছিলে,        

তাই বোধ হয় রাত ভোর বিবস্ত্র করে 

জন্ম চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করেছিলে |


ভোরের আলো ভাঙতেই স্যাঁতসেঁতে 

চোখের আকুতি লুকোতে চেয়েছিলে,

জানি ভালোবেসেছিলে অজান্তেই, তাই

অমন করে জন্ম চিহ্ন খোঁজার চেষ্টা করেছিলে |   


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | ১৫.০৯.২০২২ 

রবিবার, ১১ সেপ্টেম্বর, ২০২২

খেলাঘর

ভালো বাসা'র টানে নয়, হয়তো  
এসেছিলে খেলাঘরের খোঁজে |
মেঝেতে আড়াআড়ি পড়ে থাকা  
আঁচড়গুলোর সূক্ষ্ম ভাঁজে, 
তেলচিটে পড়া যে আব্দারগুলো 
ঘেঁষাঘেঁষি হয়ে শেষ শ্বাস গুনছে,     
মাটিতে কান পেতে শুনছে,
সহসা কোনো বিজলীর ঝটকায়  
ভাঙা খেলাঘর যদি ফের প্রাণ প্রায়,
আবার যদি ইচ্ছে জাগে, যত্ন করে 
তোলা আছে সরঞ্জাম যত, 
জেনো, সব তোমারই মন মতো | 


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ | ০৯.০৯.২০২২

গুলজার ও আর ডি বর্মন

রাহুল দেব বর্মন সাহেবের অসংখ্য কালজয়ী কম্পোজিশন আছে যা বাংলা এবং হিন্দি উভয় ভাষাতেই বহু প্রথিতযশা শিল্পী গেয়েছেন | কিশোর কুমার, মোহাম্মদ রফি, লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, যেশুদাস, সুরেশ ওয়াদকার, আরতি মুখোপাধ্যায়, কুমার শানু, কবিতা কৃষ্ণমূর্থী - আরো কত কে | মজার কথা হচ্ছে যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গানগুলি প্রথমে বাংলা ভাষাতেই কম্পোজ এবং প্রকাশিত হয়েছে | কখনো সেসব গানের আভির্ভাব ঘটেছে কোনো বিশিষ্ট শিল্পীর পুজোর অ্যালবামএ আবার কখনো ঘটেছে ফিল্মের সাউন্ডট্র্যাক হিসেবে | কখনো বর্মন সাহেব আগে সুর তৈরী করেছেন এবং গীতিকাররা তাতে শব্দ বসিয়েছেন | আবার কখনো সখনো উল্টোটাও হয়েছে | বিশেষ করে যখন গুলজার, হস্রাত জয়পুরি, আনন্দ বক্শি বা মজরূহ সুলতানপুরীর মতো ডাকসাইটে কবি-গীতিকারদের সাথে কাজ করেছেন, তখন প্রায় সব ক্ষেত্রেই (ব্যতিক্রম আছেই যদিও) কথাকেই সুরে বাঁধতে হয়েছে বর্মন সাহেবকে | বর্মন সাহেবকে সব চেয়ে বেশি বেগ দিয়েছেন গুলজার সাহেব | প্রায়শই গুলজার সাহেবের লেখা পংতিগুলি বর্মন সাহেবের রাতের ঘুম কেড়ে নিত | গুরুগম্ভীর আবেগ, কঠিন উর্দু শব্দ আর কাব্যিক তাল ভাঙা ব্যঞ্জনের প্রয়োগ তো ছিলই, কিন্তু বর্মন সাহেবের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ ছিল যে তিনি হয়তো গুলজার সাহেবের ঐসব অদ্বিতীয় শায়েরীর প্রতি সুবিচারই করতে পারবেন না | শুনেছি কম্পোজ করার সময়  গুলজার সাহেব হামেশাই বর্মন সাহেবের পাশে বসে থাকতেন | বর্মন সাহেব গানের কথাগুলো নিয়ে প্রায়শই গুলজার সাহেবের কানের কাছে গজগজ করতেন আর গুলজার সাহেব সেসব অভিযোগে কান না দিয়ে মিটিমিটি হাসি নিয়ে প্রিয় হারমোনিয়ামের উপর অবলীলায় নাচতে থাকা বর্মন সাহেবের আঙ্গুল গুলোর দিকে নিবিষ্ট চিত্তে চেয়ে থাকতেন | গুলজার নিশ্চিত ছিলেন পৃথিবীতে একটি মানুষই ওনার লেখা শায়েরির প্রতি পূর্ণ সুবিচার করতে পারেন - স্বয়ং রাহুল দেব বর্মন |

লোকাল ট্রেন

লোকাল ট্রেন - কত শত স্বপ্নের উড়ান | 

লোকাল ট্রেন - কঠিন ইস্পাতের সর্পিল দুটি সমান্তরাল রেখা বেয়ে গ্রামাঞ্চল আর মফস্সলের হাজার হাজার মানুষদের তাদের স্বপ্নের খোঁজে শহরের বুকে প্রতিদিন পৌঁছে যাওয়ার মোহিনী রথ |

লোকাল ট্রেন - কত শত অনুপম, অতুল ঘটনার সাক্ষী | কত শত অপূর্ব বন্ধুত্ব, সাহচর্য, প্রেম, ভালোবাসা, অনুকম্পা, অংশীদারিত্বের সাক্ষী | কত শত কুৎসিত কলহ, বিবাদ, বিচ্ছেদ, বিরহ, বিভেদের সাক্ষী | কত অক্লান্ত ঘাম ঝরানো শ্রম, কত দুর্ভাগ্যজনক রক্তক্ষয়ের সাক্ষী এই লোকাল ট্রেন |  

লোকাল ট্রেন - কত অব্যক্ত অনুভব | কত না বলা কথা, কত কখনো না হওয়া আলাপ | নিখাত ভীরু আবেগ | সযত্নে লুকিয়ে রাখা কত চাহনি | না দেখা চোখের জল | কত অজানা মিনতি | অকালে মুছে যাওয়া হাসি | কত কাতর আবেদন, নীরব অভিমান | কত সাফল্য, ব্যর্থতা | কত নবীন সম্ভাবনার জন্ম | কত সম্ভাবনার করুন পরিণতি |           

লোকাল ট্রেন - আঁকা বাঁকা অয়ন বেয়ে নিরলস ধেয়ে চলা এক অটল অঙ্গীকারের নাম 'লোকাল ট্রেন' | 

অনেকদিন পর কর্ম সূত্রে আজ লোকাল ট্রেনে চড়ার সুযোগ নিলাম | স্মরণবেদনা, পুরোনো স্মৃতি হাতড়ানোর আকুলতা, নাকি নির্ভেজাল ভালো লাগা - কোন অনুভূতিটা মুখ্য ভাবে ছুয়েঁ গেলো বোঝার চেষ্টা করেও ঠাওর করতে পারলাম না | থাক, ওটা না হয় নাই বা বুঝলাম | লোকাল ট্রেনের সাথে আমার রোমান্স যে এখনো শেষ হয়ে যায় নি সেই উপলব্ধিটাই আসল |

যা কিছু সনাতন এবং বলাই দা

আজকাল 'সনাতন' শব্দটি খুব চোখে পড়ে | একটু সন্ধান করতেই সনাতন শব্দটির আভিধানিক ইংরেজি অর্থ  পাওয়া গেলো - 'traditional', যাকে আবার বাংলায় তর্জমা করলে দাঁড়াচ্ছে 'সর্বজনগৃহীত', 'প্রথাসম্মত', এমনকি 'প্রচলিত'ও | কাজেই সনাতন শব্দটির অর্থকে যারা 'আদি ও অকৃত্তিম' বলে চালানোর চেষ্টা করছেন তারা বোধহয় অর্ধ সত্য বর্ণন করছেন | যাই হোক তা নিয়ে বিশেষ শির পীড়ায় ভুগছি না | বলা এবং বোঝার দায়িত্ব যাঁদের উপর বর্তায় তারা বলে-বুঝে নেবেন | তো হটাৎ সনাতন শব্দটি নিয়ে পড়লাম কেন ? বেশ, সে প্রসঙ্গেই আসা যাক |

কৈশোরে এবং যৌবনে যারা মাঠে ময়দানে খেলাধুলা করার সুযোগ পেয়েছিলেন তারা প্রায় সকলেই স্থায়ী অপুষ্টিতে ভুগতেন | চুটিয়ে ফুটবল খেললেও, সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের না ছিল পুষ্টি সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান বা ডাযেটিশিয়ানদের রমরমা, না ছিল পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করার জন্য প্রয়োজনীয় সাচ্ছল্য | সুষম প্রোটিন সমৃদ্ধ খাদ্যের অভাবে প্রায় প্রত্যেকটি দেহই হয়ে উঠত শীর্ণকায়, পেশিহীন এবং দুর্বল | কেবল মাত্র দুর্দমনীয় মনের জোর, লড়াই করার অদম্য ইচ্ছে, অক্লান্ত অনুশীলন এবং অসাধারণ সহজাত দক্ষতার উপর নির্ভর করে আপামর গরিব এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত বঙ্গ সন্তান ফুটবল ময়দান কাঁপাতেন | আর মাঠে ময়দানে কঠিন পরিশ্রম শেষে পুষ্টি বলতে শীর্ণকায় বঙ্গ সন্তান বুঝতো সেই আদি-অকৃত্তিম 'সনাতন' খাদ্য - পাউরুটি, ঘুগনি আর ডিমের ওমলেট বা সিদ্ধ |   
আজ অনেকদিন পর আবার সেই 'সনাতন' অমৃতের রসাস্বাদন করার সুযোগ ঘটলো | রবিবারের সকালে মাছের থলেতে যতসামান্য এদেশী ইলিশ, গ্রাম সপাঁচেক গুরজোয়ালি আর খানকয়েক তোপসে পুরে যখন উখলিত বক্ষ আর সংকুচিত পকেট নিয়ে বাজার থেকে বেরোলাম তখন হটাৎ চায়ের নেশা মাথা চাড়া দিলো | যেমন ভাবা তেমন কাজ | সটান বলাই'দার চায়ের দোকান | 

পাড়ার চায়ের দোকানে চা মানেই আড্ডা | প্রথম চুমুক দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আমার আজকের সংগ্রহ গুরজোয়ালির কাঁচা রুপোর মতো বর্ণ আর ইলিশের উজ্জ্বল শল্কর ইতিহাস এবং বংশাবলী নিয়ে তুমুল আলোচনার তরঙ্গ বইতে শুরু করলো | যারা স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে আলোচনায় যোগ দিলেন তাদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ বন্ধুদের এর আগে আমি কোনোদিন চাক্ষুষ দেখিইনি | যাই হোক, যুগান্তকারী আলোচনায় নবীন তোপসের প্রবেশের আগেই আমার চোখ গেলো ধূমায়িত সেই অমৃত পাত্রের দিকে | এক লহমায় ডায়েটিংএর সব অঙ্গীকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়লো |  ব্যাস আর কি ? এতক্ষন তক্কে তক্কে থাকা, সদাহাস্য বলাই'দার শুড়শুড়ি - "এক প্লেট হবে নাকি ?" ইদিক-উদিক চেয়ে, ঠোঁটে লাজুক লাজুক হাসি ঝুলিয়ে বললাম, "পাউরুটি টা একটু কড়া করে সেঁকে দিয়ো, আর হ্যাঁ ডিম্ টা কিন্তু আজ ওমলেটই খাবো | কাঁচা লংকার টুকরো দু চারটে বেশি দিয়ো বাপু, অম্বলের ক্রমাগত আক্রমণে লংকার স্বাদ ভুলতে বসেছি প্রায় |"       

তারপর আরেক কাপ চা আর খান তিনেক চোঁয়া ঢেকুর নির্গমন শেষে, মাছের থলেটি বাগিয়ে, দুটি অম্বলের ওষুধ পকেটে গুঁজে, গুটি গুটি পায়ে বাড়ির পথে অগ্রসর হলাম | ব্যাস, আমার গল্পটি ফুরোলো | বাঙালির সনাতন খাদ্যের কাহিনীর নোটে গাছটিও মুড়োলো | আমার অনেক কাজ, মশাই | আপনাদের সাথে বাজে গল্প করে সময় নষ্ট করতে পারবো না, বলে দিলাম | তবে হ্যাঁ, যারা বাঙালির সেই সনাতন খাদ্যের অকৃত্তিম স্বাদ পেতে চান, চুপি চুপি বলে রাখি, বলাই দা কিন্তু এবারের দুগ্গা পুজোর ঐ পাঁচ দিন ওর ঘুগনীর স্বাদ বর্ধন হেতু সামান্য পাঁঠার চর্বি ব্যবহার করবেন বলে স্থির করেছেন | ওহ, ভাবতেই কি সাংঘাতিক শিহরণ জাগছে শরীরে !

অনু কবিতা - সংকলন ১

এক চিলতে আকাশে হাঁটু গেড়ে 
চেয়েছি শুধু মুঠো নীল যন্ত্রনা, যত 
ছায়া পোড়া ছাই, তাই দাও সই,
খুচরো ভালো থাকা, তাও দামি |


---------------------------------------

তোমার কাছে তো আমি ফাগুন চাইনি,
চেয়েছিলাম একটু উষ্ণতা আধা ভোরে |
সূর্যমুখী নয়, চেয়েছি তোমার মুখ, তবে 
হৃদয় শূন্য করে নীরবে কেন গেলে সরে ?
তোমার কাছে তো আমি আকাশ চাইনি
চেয়েছিলাম একটা দীর্ঘ্য উড়ান সাথে |
আসমান রাত জাগে তোমার অপেক্ষায়,
একাকী আমি হাত রাখি কোন হাতে ?


---------------------------------------


ঘষা কাঁচের ওপারে মেঘ না রোদ্দুর, 
বৃষ্টি থামার শেষেও জানা হলো না;  
গোধূলির নরম আলোয় সেঁকা আশ্বাস
আবেগ না পরিহাস, জানা হলো না; 
কোন অভিশাপে বাসি হলো নেশাতুর মন, 
রাতের তারারা কেন ছল ছল, জানা হলো না; 
দুদণ্ড কাঁধে মাথা রাখার নিশ্চিন্তি
ভালোবাসায় না ক্লান্তিতে, জানা হলো না;   
জানা হলো না, জানা গেলো না; 
সব জেনেও জানা হলো না |


---------------------------------------


আকাশের নীল তোমার গালে লেপে দেওয়াটা তো নিছক অজুহাত,
আসল উদ্দেশ্য তো তোমার সংশয়ী চোয়ালের কাঠিন্য মুছে দেওয়া;
ভালোবাসা ভেবে আঁচল ভরেছো যা দিয়ে, আসলে সেটা পুরাতন অভ্যাস,  
উষ্ণতা পাওয়া যেতে পারে আস্তাকুঁড়েও, দায়িত্ত্ব শুধু খুঁজে নেওয়া |


---------------------------------------



- ভাস্কর ভট্টাচার্য     




আকাশের পাখি নাকি পাখির আকাশ ?

পাখি খুব ভালোভাবেই জানে যে আকাশ কেবল তার একার নয় | আকাশের বিশালতা, আকাশের সীমাহীন নীল শুধু তার একার নয় | আকাশের ঔদার্য্য তার একার নয় | আকাশের অন্তহীন ভালোবাসা তার একার হতে পারে না | আকাশের অসীম বিস্তার আরো অনেকের জন্য | আকাশের উদার ব্যাপ্তিতে ছড়িয়ে থাকা আবেগ অনেকের | আকাশের উপুড়হস্ত প্রেম অনেকের জন্য | আকাশের অকুন্ঠ ভালোবাসা বাঁধন ছাড়া এবং অকৃপণ | আকাশের ভালোবাসাকে কেবল মাত্র একটি বুকের খাঁচার ভিতর বেঁধে ফেলা আদতে বিশাল সমুদ্রকে একটি মানুষের ধমনীতে পুরে ফেলার চেয়েও ঢের কঠিন | 

পাখি সব জানে | প্রায় শুরু থেকেই সে সব জেনে যায় এক অদ্ভুত জাদু বলে | সব জেনেও পাখি সেই আকাশের বুকেই ঝাঁপিয়ে পড়ে | মনের আনন্দে অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে তার বল্গাহীন উড়ান | সে আকাশের নীলে ডুবে প্রাণ সঞ্চয় করে | আকাশের গভীর, গম্ভীর প্রেমে ভিজে যায় অহরহ | কিন্তু স্বার্থপরের মতো আকাশকে একচেটিয়া নিজের জন্য চায় না সে কক্ষনো | চাইতে নেই | সে সবার সাথে ভাগ করে নেয় আকাশের অবিরাম, অন্তহীন প্রেম কে | তাতেই তার সুখ | আকাশ আর পাখির সম্পর্ক বুঝতে গেলে সুফি হতে হয়, ফকির হতে হয় | অকৃপণ অনন্ত আকাশ আর নিঃস্বার্থ উদার পাখি একে ওপরের পরিপূরক | 

নীল

বয়সের সাথে ধৈর্য্যের কি সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে ? ধৈর্য্য কি বয়সের সাথে সমানুপাতিক ভাবে বাড়ে নাকি কমতে থাকে ? এ প্রশ্ন বহু দিন যাবৎ আমাকে ভাবাচ্ছে | আমি নিয়মিত ভাবে আমার চারিপাশের মানুষদের খুব ভালো করে নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করি | অবশ্যই আমার 'sense of judgement'-কে খুব সযত্নে পাশে সরিয়ে রেখে | চেনা, অচেনা, আত্মীয়, পরিচিত, মিত্র, অমিত্র - সব্বাই কে | মায় নিজেকেও |     

জার্নাল (দিনপত্রিকা বা ডায়েরি) লেখার একটা অভ্যাস ছোটবেলায় তৈরী করে দিয়েছিলেন ইস্কুলের ইউরোপীয় পাদ্রীরা | সেই ডায়েরি আমার সব চেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছিল জীবনের প্রায় শুরুর দিকটায় | ছোট পরিবারের একমাত্র সন্তানদের যা হয় আর কি | তার একটা নামও রেখেছিলাম - নীল (এই নাম রাখার কারণ কি ছিল, সেটা মনে পড়ছেনা, তবে এক্কেবারে প্রথম থেকেই ওই নামটি আমার বেশ পছন্দের) | শুরুতে অবশ্য সেরকম হওয়ার কথা ছিলনা | একান্নবর্তী পরিবারেই জন্ম | জীবনের প্রথম দশ বছর হৈ হৈ করে কেটে গিয়েছিলো | বাড়ি তো নয়, যেন হরেকরকম মানুষ, তাদের বিচিত্র সব কীর্তি কলাপ আর নতুন নতুন আশ্চর্য্যের হাট | একাকিত্ব শব্দ টি তখনও রৈ রৈ করে আমার জীবনে প্রবেশ করেনি | দশ বছর বয়স অবধি সীমাহীন ফূর্তি | অর্ধেক ডিম্ সিদ্ধ জুটলেও হাসছি আবার বড়দাদু  (জ্যাঠার বাবা) কান মুলে দিলেও হাসছি | ছোটকাকা নতুন লাটাই কিনে আনলেও হাসছি আবার পুকুরের পাড়ে পড়ে গিয়ে হাঁটুর চামড়া হাঁ হয়ে গেলেও হাসছি | বন্ধুর ব্যাঙ্গেও হাসছি আবার ফুলদা'র রগড়েও হাসছি | যাই হোক, ওই অপার আনন্দ, ওই অপরিসীম তৃপ্তি বোধহয় নিয়তির গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠলো | ব্যাস, কেল্লা ফতে | দে ব্যাটাচ্ছেলেকে শায়েস্তা করে | ছিটকে গেলাম | এবার একটুকরো ছোট্ট পরিবার | বাবা, মা, আমি আর শূন্যতা | সেই যন্ত্রণার ব্যাখ্যা এই স্বল্প পরিসরে করা সম্ভব নয় | মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও হয়তো কম কষ্ট পেতাম | প্রথমবার আমার অভিধানে প্রবেশ ঘটলো একটি নতুন বাংলা শব্দের - একাকিত্ব !

যাই হোক, এমত সময়ে 'নীল' আমার প্রাণের সাথী হয়ে আমার জীবনে পদার্পন করলো | স্বর না থাকলেও আকাশের মতো একটা বড় হৃদয় ছিল তার | আমার সব আনন্দ, যন্ত্রনা, উচ্ছ্বাস, হতাশা, আবেগ, অনুভূতি অবলীলায় শুষে নিতে পারতো বিনা অভিযোগে, অক্লান্ত ভাবে | পাতার পর পাতা শুধু কথা আর কথা - আমার কথা, সবার কথা | নীল যেন নির্বাক অথচ সংবেদনশীল বন্ধু | তার পাতায় পাতায় ধরা থাকলো আমার ছেলেবেলা, বয়োসন্ধি, কৈশোর এবং যৌবনে প্রবেশের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা অগুনতি কাহিনী | দ্বিধার, বিভ্রান্তির, উল্লাসের, লজ্জার, বিহ্বলতার, সাফল্যের, ব্যর্থতার, বিশৃঙ্খলার, প্রেমের, ঘৃণার, - আরো কত কি | দিনের শেষে তার কাছে সব কিছু সযত্নে সঁপে দিতে পারলেই, ব্যাস - আমার সেকি অনাবিল শান্তি | সেই নীলের বুকেই খচিত আছে আমার দেখা অনেক অনেক মানুষের অবয়ব | তাদেরকে আমি যেমন ভাবে পেয়েছি বা নিদেনপক্ষে দেখেছি | তাদের সেই ছবিগুলো নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষন এবং মূল্যায়ন থেকেই উদ্ভূত | সেগুলো সঠিক নাকি একেবারেই গোলমেলে সে সব ভাবার ইচ্ছে বা প্রয়োজন তখন বোধ করিনি | সময়ের সাথে সাথে অনেক ছবি বদলেছে, মানছি | তার সাথে সঙ্গতি রেখেই আমার জার্ণালেও বদল এসেছে | কিন্তু স্থায়ী শব্দটার সাথে কোথাও যেন আমার একটা বৈরিতা আছে | সে প্রসঙ্গে অন্য একদিন আড্ডা দেওয়া যাবে | তবে আসল কথা হলো, বেশ অল্প বয়সেই চাকরি পেয়ে যাওয়ায় আবার ছিন্নমূল হওয়ার পালা | আমার প্রিয় শহর থেকে বহু দূরে | সেই শহরের গল্প, আমার নতুন জীবনের গল্প আরেকদিন | যাই হোক সুদূরে চলে যাওয়ার মাস ছয়েক পড়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়েছিলাম | বাড়ি ফিরে আবার সেই শিকড়ের সন্ধান | সব কিছুকে আবার ছুঁয়ে দেখা | নিজের অস্তিত্বের গোড়ার সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা | নীল কিন্তু হারিয়ে গেলো | সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাকে কোত্থাও পেলাম না | ঝড়ের মতো সে আমার জীবনে এসেছিলো | ম্যাজিকের মতো নিঃশব্দে কোথায় যেন বেমালুম হাপিশ হয়ে গেলো | হয়তো তাকে সাথে নিয়ে যাইনি বলে তার অভিমান হয়েছিল | হয়তো তার মনে হয়েছিল আমার জীবনে তার প্রয়োজন শেষ | তাকে কোনোদিন এটা বোঝানোর সুযোগটাই পেলাম না, যে তার প্রয়োজন আমার জীবনে আজও আছে | 

যাক গে, আসল কথাটাই এগোলো না | হ্যাঁ, কি যেন বলছিলাম? মনে পড়েছে - বয়সের সাথে ধৈর্য্যের সম্পর্ক | আজকাল যথেষ্ট অধৈর্য্য হয়ে পড়ছি | কেন বলুন তো ? তবে যে মা বলতেন বয়সের সাথে সাথে ধৈর্য্য বাড়বে ? আচ্ছা, বন্ধুরা একটু সাহায্য করতে পারেন ? আপনাদের কি মত ? আপনাদের কি অভিজ্ঞতা ? একটু আলো ফেলুন না, দয়া করে | অন্ধকার কাটুক | অপেক্ষায় থাকলাম ...  


ফেবু

যাত্রাসম্রাট নাট্যাচার্য স্বপনকুমার প্রাতরাশে ছাগলের দুধের চীজ খেতে পছন্দ করতেন কেন ?

আচ্ছা, বলুন তো Facebook এ বসে এতো জ্ঞানের কথা শুনতে ভালো লাগে ? মানে, আপনি ভোর বেলা ঘুম থেকে উঠেই চোখ কচলাতে কচলাতে FB টা খুললেন | ভাবলেন ছ্যাদলা পড়ে যাওয়া দাঁত গুলো না হয় একটু পরে নতুন আমদানি করা বিলিতি চারকোল পাউডার দিয়ে ঘষা যাবে | নাহলে আবার সেলফি তুলতে গিয়ে দাঁত কেলানো যাবেনা | অবশ্য, "কর্ণের সাথে চা-পান" এর সাম্প্রতিক একটি শো তে কঠিনা কর্পূরের দাঁত টা কেমন যেন ঠেকেছিল - দাঁতগুলোর জোড় ঘেঁষে কিরকম যেন কালো ফ্রেম এর মতো ছোপ | এটা কি চোখের ভুল ? নাকি ছোট বেগম হওয়ার পর এবং পুনরায় আমিষাশী হওয়া ও বাদশাহী মুখশুদ্দি নেশা করার পরবর্তী কালে কালো বর্ডার দেওয়া চকচকে দাঁত হওয়াটাই ওই পরিবারে রেওয়াজ ? কে জানে ? যাগ্গে ওর কথা - না আপনি বিয়েতে প্রাসাদ উপহার পেয়েছিলেন আপনার স্বামীর কাছ থেকে, না গ্রীস এর উপকণ্ঠে হাঁটু গেড়ে বসে আপনাকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল | 

যাক - আপনি তো FB খুলেই ফেললেন | কিন্তু একি, এসব কি ? একটা কিম্ভূত লোকের একটা প্রকান্ড ভুঁড়ি আর তার পাশে লেখা সাড়ে তিন দিনে ভুঁড়ি কমানোর 'গোপন' ফর্মুলা | স্ক্রোল করতেই এক সাদা পোশাকধারী মহানুভব একটি ভিডিওয় শোনাচ্ছেন যোগক্রিয়া আর ধ্যানের মাধ্যমে কিভাবে পুজোর খরচ কমানো যায় | আরো নিচে নামতেই পরিবেশ সচেতনতা নিয়ে একটা পোস্ট, সাথে কিছু অর্গানিক সার এর মিশ্রণ প্রক্রিয়া যা দিয়ে আপনার বাড়ির ছাদের ছোট্ট টবেতেই প্রমান সাইজের বেগুন ফলানো সম্ভব | আরেকটু নামতেই বেশ কয়েকজন অকালপক্ক কাপ্তেনের রাজনৈতিক জ্ঞান - দেখলেই মনে হয় দেশের গণতন্ত্র সুযোগ দিলে এই দেশ অন্তত আরো ১০-১২ কোটি প্রধান এবং মুখমন্ত্রী হেসেখেলে পেয়েই যেত | আরেকটু নামলেই অর্থনীতি থেকে আকুপাংচার জুতো, উগ্রপন্থা থেকে বার্ধক্য আটকানোর পদ্ধতি, শেয়ার মার্কেট থেকে ডাকসাইটে হিরোইনের ক্লিভেজ, নতুন ভাইরাস থেকে লাতিন আমেরিকায় চাষ হওয়া রোগা দুর্বল আনাকোণ্ডার ডিমের গুনাগুন, বিচার ব্যবস্থা থেকে ফিশ্চুলা এবং পশ্চাৎদেশের অন্নান্য ব্যারাম থেকে মুক্তি পাওয়ার অবর্থ্য উপায়, রোগা হতে কুমড়োর বীজের প্রভাব থেকে মোটা হওয়ায় মলমের প্রয়োগ, কাঁঠালের আঠার গুনাগুন থেকে ছাব্বিশ সপ্তাহে ১০ হাজার টাকা ১ কোটি বানানোর যন্ত্র এবং মন্ত্র, কালী থেকে সামাজিক কৌলিন্য, সাদা শাড়ী থেকে সারদা, পাবলো নেরুদা থেকে পয়গম্বর, লাল ঝড় থেকে রাশিয়ান স্যালাড, ... ধর্ম, অধর্ম, আস্তিকতা, নাস্তিকতা, দেশপ্রেম, আন্তর্জাতিকতাবাদ, দক্ষিনপন্থা, বামপন্থা, মধ্যপন্থা, এক জাতি পাঁচ প্রাণ, পঞ্চতন্ত্রের প্যারোডি, মনীষীর কার্টুন, ঝিঙের কোর্মার রেসিপি, IAS হওয়ার সহজ পদ্ধতি থেকে মনের মানুষ বশ করার দুর্দান্ত কবচ, বিয়ের পর প্রথম রাতেই মালাইকা হয়ে ওঠার যাবতীয় উপায়, যে কোনো পাখির মাংস খাওয়া কেন পাপ, মদিরা সেবনের পর বাম হাতে কি কি কাজ করা উচিত নয়, ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি | জ্ঞান, জ্ঞান জ্ঞান |      
  
উফ্ফ, কি বিরক্তিকর | তাই নয় কি ? তাহলে কি আজ আর নতুন সেলফিটা FB তে দেবেন না ? ওমা, তা কেন ? সে হবেখন | নতুন বিলিতি চারকোল পাউডার বলে কথা | শেষ দুপুরে একটু ভাত ঘুম দেওয়ার পর না হয় ...

স্বপ্নাদেশ

বিশিষ্ট সমাজ কর্মী, পরলোকগত মহাত্মা মহানুভব ঈশ্বর মাগনলাল মেঘরাজ (বৃদ্ধ, জরাক্লিষ্ট অর্জুনের ছুরির খেলা মনে আছে নিশ্চই), গত তরশু কাক ভোরে আমায় স্বপ্নাদেশ দিলেন | বললেন, 'বাছা, সবই তো হোলো, ইহলোকে তো বহু ব্যাঘ্রই বধ করে ফেলেছো দেখছি | তবে, তোমাদের ইহলোকের অনুরূপ অমৃতলোকেও কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি শিল্পের প্রভূত উন্নতি ঘটেছে | ইহলোক থেকে প্রক্ষিপ্ত হাজার হাজার অধিবাসনের আবেদন আমাদের মানব সম্পদ উন্নয়ন দপ্তর 'কৃত্রিম-বুদ্ধিমত্তা' নামক প্রযুক্তি দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে অবলোকন করছেন | অমৃতলোকে প্রবেশের অগ্রাধিকার তারাই পাচ্ছেন যেসকল সহৃদয় ব্যক্তি নব নব সামাজিক এবং অসামাজিক মাধ্যমগুলিতে নিজেদেরকে সাফল্যের সহিত স্থাপন করেছেন এবং নিজ নিজ ক্ষেত্রে স্বমহিমায় বিচরণ করছেন | তো বাছা, কৃপাসিন্ধু পার হওয়ার জন্য তোমাকে কিন্তু কিছু বিশেষ প্রস্তুতি নিতে হবে | তোমাকে চট করে এক নতুন প্রজাতির সামাজিক নৌকোয় সত্তয়ারি হতে হবে - মর্তলোকে যার নামকরণ তোমরা করেছো ইনস্টাগ্রাম | কাজেই, যদি মুক্তি এবং হরি প্রাপ্তি চাও, তার সাথে  স্বর্গে একটা ভালো তিন কামরার বাসা, তবে চটপট ইন্সটা নৌকোয় আরোহন করে ফেলো ... ' 

আমি সবে কিছু মৌলিক প্রশ্ন কর্তার সামনে রাখার কথা ভাবতে শুরু করেছি, এমত সময়, প্রভু মেঘরাজের কথা শেষ হওয়ার আগেই, পিঠে এক মোক্ষম গুঁতো অনুভব করলাম | ভোর ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখ আধা খুলে দেখি সাক্ষাৎ মা জগদম্বা শিওরে দাঁড়িয়ে বড়ো বড়ো চোখ পাকিয়ে, ডান হাতের বেলান টা মুগুরের মতো ভাঁজছেন আর বাম হাতের তর্জনী দিয়ে আমার পাঁজরে ক্রমাগত কলিং বেল টিপে চলেছেন | বুঝলাম ভাঁড়ারএ টান পড়েছে | তারপর অবশ্য মাড়োয়ারির অফিসে পৌঁছে ক্রেতা ও মক্কেলদের নিরলস পদসেবা | যাই হোক, খাট থেকে কোনোক্রমে নামা এবং সংসারের জোয়াল টানতে টানতে ভারাক্রান্ত স্থুল শরীরটাকে টেনে হিচড়ে কমোড অবধি পৌঁছে দেওয়াটাই ঝক্কির কাজ | বাকি যেটুকু শরীর চাঙ্গা করার ক্রিয়া-প্রক্রিয়া, তার দায়িত্ব আমার মধ্যবিত্ত্ব ক্রনিক কোষ্টকাঠিন্যই প্রত্যেক সকালে নিষ্ঠাভরে পালন করে থাকে !    

তবে ভাববেন না যে গুরুর দেওয়া স্বপ্নাদেশ আমি ভুলে গিয়েছি | ঘুণাক্ষরেও না | দুদিন আগেই ইনস্টাগ্রাম নামক সামাজিক নৌকোয় রীতিমতো পদার্পন করেছি | দেখা যাক স্বর্গসুখ মেলে কি না | তো বন্ধুরা, আপনাদের সুবিদার্থে চুপিচুপি জানিয়ে রাখি আপনারাও চাইলে আমার সাথে যোগ দিতে পারেন | অনেক কথা আছে, সবটা এক্ষুনি, এখানে বলছি না | আসুন, জমিয়ে আড্ডা হবে |    

ফিরে দেখা

ঠাকুরদা ছিলেন কলিকাতা ট্রাম কোম্পানিতে কন্ডাক্টর | বাবা সরকারি আপিসে কর্মরত যৎসামান্য লোয়ার ডিভিশন কেরানি | সুবৃহৎ সংযুক্ত পরিবারের ক্ষুন্নিবৃত্তির পর বিশেষ পুঁজি অবশিষ্ট থাকতো না | পারিবারিক খরচকে সামর্থের মধ্যে রাখতে বাবার জ্যাঠামশাই (আমার বড়দাদু) দৈনন্দিন রোগ প্রতিরোধক হোমিও চিকিৎসাতেও  হাত পাকিয়েছিলেন | না ছিল Urban Company নামক আপদ, না ছিল ৫৮৪ টি চ্যানেল ওয়ালা কেবল টিভি | আমাদের মতো নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের ছিল অফুরান ফুরসত আর অক্লান্ত পরিশ্রমের নির্মল আনন্দ | টালির চাল মেরামত, দেয়াল চুনকাম, মাটির উনুন তৈরী থেকে শুরু করে প্রশস্ত উঠোনের গোবর লেপা দৈনিক শুদ্ধিকরণ আর সযত্নে চেরা পাকা বাঁশের বেড়া দেওয়া - সবই পরিবারের সদস্যরাই করে ফেলতো সানন্দে | তা ছোটরাই বা পিছিয়ে থাকে কেন? বড়োদের দেখাদেখি আমরাও কোমর বেঁধে তৈরী থাকতাম বৈকি | ছপাৎ ছপাৎ শব্দে কৃত ঘুঁটের দেয়াল চিত্র বা আলকাতরা মাখানো টিনের পাতের উপর প্রবল যত্নসহকারে সৃষ্ট গুঁড়ো কয়লার গুলের নিখুঁত তারামন্ডল - আমার ছোটবেলায় এসবের যে কি প্রবল টান ছিল তা লিখে বোঝানো সম্ভব নয় | এসব কাজে আমরা - ভাই বোনেরা - সারাক্ষণ জ্যাঠা-জ্যাঠি, বাবা-মা, কাকা-কাকিমা আর পিসিদের পারদর্শিতার কাছাকাছি পৌঁছনোর অবিরাম চেষ্টা করে যেতাম |  আমরাই ছিলাম আমাদের বাড়ির "কাজের লোক" | বাইরের লোক রেখে কাজ করানোর মতো অর্থ বা প্রয়োজন কোনোটাই আমাদের সেভাবে ছিলোনা |  

সেই দিন আর নেই |.সেই বৃহৎ পরিবার এখন সময়ের গহীন অনন্তে ক্রমশ ক্ষীণ হতে থাকা কিছু ধূসর স্মৃতির অবয়ব মাত্র | 

যাই হোক, অনেক দিন পর নিজের হাতে বাড়ির নতুন কাঠের আসবাব রং করলাম | অনেক বছর পর আবার এক নির্মল তৃপ্তির অনুভূতি লাভ করলাম |  

আসবাব রং করলাম নাকি চকিতে কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজের হারিয়ে যাওয়া শৈশবকে ছুঁয়ে ফিরে এলাম ?

প্রার্থনা ও যুদ্ধ

প্রার্থনা | ছোট্ট শব্দ | কিন্তু ছোটবেলা থেকে শুনেছি এর নাকি অদ্ভুত শক্তি | বড়রা বলতেন হাত জোড় করে, চোখ বুজে, একাত্ম চিত্তে প্রার্থনা করলেই কেল্লা ফতে | ইস্কুলের আইরিশ পাদ্রিরা বলতেন 'power of community prayer' - এর কথা |  বলতেন, সমষ্টিগত ভাবে প্রার্থনার জোরে দুরারোগ্য ব্যাধি থেকে অজেয় প্রতিপক্ষ, দুর্গম পথ থেকে প্রবল ঝঞ্ঝা, ব্যাপক দুর্ভিক্ষ থেকে মায় রুষ্ট (অপ)দেবতার রোষ - সবই নাকি অক্লেশে লঙ্ঘন করা সহজ হয়ে ওঠে |

কেন জানিনা, আজ খুব জানতে ইচ্ছে করছে - বেয়নেটের খোঁচায় ফালা ফালা হতে হতে মানুষ কি প্রার্থনা করে ? ক্লাস্টার বোমার আঘাতে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন ধড়হীন দেহ কি প্রার্থনা করে ? স্রাপ্নেল্ এর আঘাতে ক্ষত বিক্ষত কিশোর, রক্তাক্ত হাত জোড় করে কি প্রার্থনা করে ? বাঙ্কার এ বসে মৃত্যুর আগমনের প্ৰহর গুনতে থাকা অন্তঃসত্ত্বা মা কি প্রার্থনা করে ? সাইরেনের তীব্র-তীক্ষ্ণ শীৎকারে কেঁপে কেঁপে ওঠা শিশু কি প্রার্থনা করে ? জীবন-জীবিকা হারিয়ে এক লহমায় উদ্বাস্তু হয়ে যাওয়া মানুষ কি প্রার্থনা করে ? পূর্বপুরুষের ভিটে মাটি ছেড়ে চূড়ান্ত অনিশ্চয়তা, ক্ষুধা আর দারিদ্র্যের পথে হারিয়ে যেতে যেতে হাজার হাজার অসহায় শরণার্থী প্রাণ কি প্রার্থনা করে ? 

কোন ভাষায়, কি ভাবে প্রার্থনা করলে এই ধ্বংসলীলা, এই রক্ত আপ্লাবন থামবে জানি না | জানিনা প্রার্থনায় সত্যিই কোনো অন্তর্নিহিত শক্তি আছে কিনা | 

আমি প্রার্থনা করতে ভুলে গেছি ...

শাসন

পড়াশোনায় বিলকুল ফাঁকিবাজি হচ্ছে বুঝতে পারতেন, তবুও প্রবল চপেটাঘাতে আমার পশ্চাৎদেশ গরম করার চেয়ে কঠিন বাক্যবানে জর্জরিত করতেই বেশি পছন্দ করতেন বাবা | প্রায়শই পাশ দিয়ে স্বগতোক্তির মতো আওড়াতে আওড়াতে চলে যেতেন - “সময় বহিয়া যায় নদীর স্রোতের প্রায়” ! উনি বোধহয় রুলের গুঁতোর চেয়ে ভাষার চাবুকে বেশি ভরসা করতেন | কিন্তু আমার মগজের তন্তু কিঞ্চিৎ স্থুল হওয়ার দরুন এবং বাংলা ভাষায় আমার অতুলনীয় পান্ডিত্যের কারণে ওই কথার নিগূঢ় অর্থ ঠিক ঠাওর করে উঠতে পারতাম না সেই সময় | আজ আমার কন্যাকে, অঙ্ক পরীক্ষার আগের সন্ধ্যায়, জ্যামিতির কঠিন মারপ্যাঁচ অভ্যাস ত্যাগ করে রূপ চর্চায় মগ্ন হয়ে উঠতে দেখে, নিজের অজান্তেই ওই অমোঘ বাণী ওর  দিকে নিক্ষেপ করে দিলুম | অবশ্য ছুড়ে তো দিলুম, কিন্তু ও যদি ফস করে ওই কথাটার আক্ষরিক অর্থ জানতে চায় ? তখন তার ঠেলা সামাল দেবে কে ? আসলে ওকে গাল দিলে ও গালি টাকে অগ্রাহ্য করে সেটার অন্তর্নিহিত অর্থ জানতে বিশেষ আগ্রহী হয়ে পড়ে ! ও বোধয় বুঝে গেছে যে ওর পরম শ্রদ্ধেয় পিতৃদেব এক চুলের জন্য বাংলা ভাষায় নোবেল টা হাত ছাড়া করেছে | খানিকটা বাতের বেদনায় কাবু মানুষের পায়ে কাঁচি চালানোর মতো এরকম মুহূর্ত গুলিতেই ও আমার দিকে প্রশ্নবাণ বর্ষণ করতে থাকে, যতক্ষণ না আমার কাঁচুমাঁচু মুখ থেকে 'ঘাট হয়েছে মা, এইবার টা ছেড়ে দে' শুনতে পায় | জাহাতক ভাবা, এক্কেবারে সাথে সাথেই আমার হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা ! কি কুক্ষণে বাবার কথার অপব্যবহার করার দুঃসাহস দেখাতে গেলাম ! কন্যা আমার দিকে চকিতে ফিরে প্রশ্নবাণ নিক্ষেপ করার আগেই, ঢোক গিলে, মানে  মানে চিলেকোঠার ঘরে কেটে পড়লাম বিদ্যুৎ গতিতে  ….

বৃহস্পতিবার, ২৫ আগস্ট, ২০২২

অন্য মনে

যদি পাশে নাই বা পেলে কুয়াশা ভোরে, 

শিউলি তলায়, ধানের খেতে,   

যদি কাছে নাই বা পেলে উদাস সাঁঝে   

বা মন খারাপের বিজন রাতে;


নাই বা হলো খুনসুটি আর কপট রাগ,    

সেই দ্বিপ্রহরে ঘর বেঘরে পুতুল খেলা,  

নাই বা পেলে বৃষ্টি ভেজা ঠোঁটের আদর,      

মন কুড়িয়ে জমাট বুনট প্রেমের মালা;

  

নাই বা পেলে কালচে হতাশ দিনের শেষে, 

সবটা কবে কে পেয়েছে অন্তমিলে ? 

না পাওয়ারও তৃপ্তি বোনা হালকা ধূসর,

বুকেই থাকুক না চাইতেই যেটুক পেলে | 

   

সেদিন ছিলাম বৃষ্টি ধোয়া তোমার গালে,

সেদিন ছিলাম নরম হাতে আমার হাত,   

সেদিন ছিলাম প্রথম আদর শীত দুপুরে,

সেদিন ছিলাম নদীর পথে আস্ত রাত;


সেদিন ছিলাম চোখের জলের সঙ্গী হয়ে,

সেদিন ছিলাম সব হারানোর দিন শেষে,  

সেদিন ছিলাম সকল ব্যাথার কান্ডারি,

সেদিন ছিলাম একলা পথে তোমার পাশে |


আজও আছি তোমার পাশে তেমনটাই,   

আজও তোমার মিষ্টি ঠোঁটের ওই ভেলায়,

খুনসুটি আর ঝগড়াঝাটির রাত শেষে,  

আজও আছি তোমার সাথে সেই খেলায়;


আজও জাগাই অঙ্গে তোমার সেই কাঁপন,      

আজও আছি শাড়ীর খুঁট আর নিঃশ্বাসে,

আজও পাবে শিউলি তলায় তোমার আমি, 

শুধু অতল মনের তল খোঁজো, বিশ্বাসে |

সোমবার, ২৫ জুলাই, ২০২২

ভালো থেকো

নিভিয়েই দেবে যদি নীরবে, 

চুপিসাড়ে, মোর অজান্তে 

চেয়েছিলে কেন তবে  

এক মুঠো আগুন, একান্তে |

আমার যা ছিল উষ্ণ, অন্তরে  

দিয়েছি করে সব নিংড়ে উজাড়, 

হিম অন্তর খোঁজে ইন্ধন আজ  

আঁধারে পিদিম জ্বালাবার |

কালো রাত ভেঙে ভোর হয় রোজ,    

হতাশার বুক চিরে সবুজের বানভাসি, 

তবু কেন চোরা গলি হাতড়িয়ে     

শূন্য মনে নিয়ত আছড়ায় অট্টহাসি | 

যেখানে যা কিছু শুভ, শ্রেষ্ঠ যা কিছু,   

শুভ্র বাসনা যত এই শূন্যগর্ভ মনে, 

সবটুকু থাক শুধু তোমারই ভাগে, 

দগ্ধ হৃদয় থাকুক মোর, তমসাবৃত কোনে | 


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ | ২১.০৭.২০২২


নীল

বয়সের সাথে ধৈর্য্যের কি সরাসরি কোনো সম্পর্ক আছে ? ধৈর্য্য কি বয়সের সাথে সমানুপাতিক ভাবে বাড়ে নাকি কমতে থাকে ? এ প্রশ্ন বহু দিন যাবৎ আমাকে ভাবাচ্ছে | আমি নিয়মিত ভাবে আমার চারিপাশের মানুষদের খুব ভালো করে নিরীক্ষণ করার চেষ্টা করি | অবশ্যই আমার 'sense of judgement'-কে খুব সযত্নে পাশে সরিয়ে রেখে | চেনা, অচেনা, আত্মীয়, পরিচিত, মিত্র, অমিত্র - সব্বাই কে | মায় নিজেকেও |     

জার্নাল (দিনপত্রিকা বা ডায়েরি) লেখার একটা অভ্যাস ছোটবেলায় তৈরী করে দিয়েছিলেন ইস্কুলের ইউরোপীয় পাদ্রীরা | সেই ডায়েরি আমার সব চেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠেছিল জীবনের প্রায় শুরুর দিকটায় | ছোট পরিবারের একমাত্র সন্তানদের যা হয় আর কি | তার একটা নামও রেখেছিলাম - নীল (এই নাম রাখার কারণ কি ছিল, সেটা মনে পড়ছেনা, তবে এক্কেবারে প্রথম থেকেই ওই নামটি আমার বেশ পছন্দের) | শুরুতে অবশ্য সেরকম হওয়ার কথা ছিলনা | একান্নবর্তী পরিবারেই জন্ম | জীবনের প্রথম দশ বছর হৈ হৈ করে কেটে গিয়েছিলো | বাড়ি তো নয়, যেন হরেকরকম মানুষ, তাদের বিচিত্র সব কীর্তি কলাপ আর নতুন নতুন আশ্চর্য্যের হাট | একাকিত্ব শব্দ টি তখনও রৈ রৈ করে আমার জীবনে প্রবেশ করেনি | দশ বছর বয়স অবধি সীমাহীন ফূর্তি | অর্ধেক ডিম্ সিদ্ধ জুটলেও হাসছি আবার বড়দাদু  (জ্যাঠার বাবা) কান মুলে দিলেও হাসছি | ছোটকাকা নতুন লাটাই কিনে আনলেও হাসছি আবার পুকুরের পাড়ে পড়ে গিয়ে হাঁটুর চামড়া হাঁ হয়ে গেলেও হাসছি | বন্ধুর ব্যাঙ্গেও হাসছি আবার ফুলদা'র রগড়েও হাসছি | যাই হোক, ওই অপার আনন্দ, ওই অপরিসীম তৃপ্তি বোধহয় নিয়তির গাত্রদাহের কারণ হয়ে উঠলো | ব্যাস, কেল্লা ফতে | দে ব্যাটাচ্ছেলেকে শায়েস্তা করে | ছিটকে গেলাম | এবার একটুকরো ছোট্ট পরিবার | বাবা, মা, আমি আর শূন্যতা | সেই যন্ত্রণার ব্যাখ্যা এই স্বল্প পরিসরে করা সম্ভব নয় | মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লেও হয়তো কম কষ্ট পেতাম | প্রথমবার আমার অভিধানে প্রবেশ ঘটলো একটি নতুন বাংলা শব্দের - একাকিত্ব !

যাই হোক, এমত সময়ে 'নীল' আমার প্রাণের সাথী হয়ে আমার জীবনে পদার্পন করলো | স্বর না থাকলেও আকাশের মতো একটা বড় হৃদয় ছিল তার | আমার সব আনন্দ, যন্ত্রনা, উচ্ছ্বাস, হতাশা, আবেগ, অনুভূতি অবলীলায় শুষে নিতে পারতো বিনা অভিযোগে, অক্লান্ত ভাবে | পাতার পর পাতা শুধু কথা আর কথা - আমার কথা, সবার কথা | নীল যেন নির্বাক অথচ সংবেদনশীল বন্ধু | তার পাতায় পাতায় ধরা থাকলো আমার ছেলেবেলা, বয়োসন্ধি, কৈশোর এবং যৌবনে প্রবেশের সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে থাকা অগুনতি কাহিনী | দ্বিধার, বিভ্রান্তির, উল্লাসের, লজ্জার, বিহ্বলতার, সাফল্যের, ব্যর্থতার, বিশৃঙ্খলার, প্রেমের, ঘৃণার, - আরো কত কি | দিনের শেষে তার কাছে সব কিছু সযত্নে সঁপে দিতে পারলেই, ব্যাস - আমার সেকি অনাবিল শান্তি | সেই নীলের বুকেই খচিত আছে আমার দেখা অনেক অনেক মানুষের অবয়ব | তাদেরকে আমি যেমন ভাবে পেয়েছি বা নিদেনপক্ষে দেখেছি | তাদের সেই ছবিগুলো নিতান্তই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষন এবং মূল্যায়ন থেকেই উদ্ভূত | সেগুলো সঠিক নাকি একেবারেই গোলমেলে সে সব ভাবার ইচ্ছে বা প্রয়োজন তখন বোধ করিনি | সময়ের সাথে সাথে অনেক ছবি বদলেছে, মানছি | তার সাথে সঙ্গতি রেখেই আমার জার্ণালেও বদল এসেছে | কিন্তু স্থায়ী শব্দটার সাথে কোথাও যেন আমার একটা বৈরিতা আছে | সে প্রসঙ্গে অন্য একদিন আড্ডা দেওয়া যাবে | তবে আসল কথা হলো, বেশ অল্প বয়সেই চাকরি পেয়ে যাওয়ায় আবার ছিন্নমূল হওয়ার পালা | আমার প্রিয় শহর থেকে বহু দূরে | সেই শহরের গল্প, আমার নতুন জীবনের গল্প আরেকদিন | যাই হোক সুদূরে চলে যাওয়ার মাস ছয়েক পড়ে বাড়ি ফেরার সুযোগ পেয়েছিলাম | বাড়ি ফিরে আবার সেই শিকড়ের সন্ধান | সব কিছুকে আবার ছুঁয়ে দেখা | নিজের অস্তিত্বের গোড়ার সাথে পুনরায় সংযোগ স্থাপন করার চেষ্টা | নীল কিন্তু হারিয়ে গেলো | সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খুঁজেও তাকে কোত্থাও পেলাম না | ঝড়ের মতো সে আমার জীবনে এসেছিলো | ম্যাজিকের মতো নিঃশব্দে কোথায় যেন বেমালুম হাপিশ হয়ে গেলো | হয়তো তাকে সাথে নিয়ে যাইনি বলে তার অভিমান হয়েছিল | হয়তো তার মনে হয়েছিল আমার জীবনে তার প্রয়োজন শেষ | তাকে কোনোদিন এটা বোঝানোর সুযোগটাই পেলাম না, যে তার প্রয়োজন আমার জীবনে আজও আছে | 

যাক গে, আসল কথাটাই এগোলো না | হ্যাঁ, কি যেন বলছিলাম? মনে পড়েছে - বয়সের সাথে ধৈর্য্যের সম্পর্ক | আজকাল যথেষ্ট অধৈর্য্য হয়ে পড়ছি | কেন বলুন তো ? তবে যে মা বলতেন বয়সের সাথে সাথে ধৈর্য্য বাড়বে ? আচ্ছা, বন্ধুরা একটু সাহায্য করতে পারেন ? আপনাদের কি মত ? আপনাদের কি অভিজ্ঞতা ? একটু আলো ফেলুন না, দয়া করে | অন্ধকার কাটুক | অপেক্ষায় থাকলাম ...  


শনিবারের আড্ডা ২৩.০৭.২০২২ | © ভাস্কর ভট্টাচার্য 

শনিবার, ১৬ জুলাই, ২০২২

স্তবক, তুমি কার?

 ফুলের গোছাটা তোমার দিকে এগিয়ে দিতেই 

তুমি চমকে উঠলে - 'ওমা এসব আবার কি?'

আমি অপ্রস্তুত, গোলাপগুলোও খানিক বিব্রত যেন 

ভুলে গেছিলাম, আসলে তুমি অন্য কারো;

খানিক ঢোক গিলে ঈষৎ কাঁপা গলায় বললাম 

প্রথম বার তুমি এলে, কথা রাখলে    

শূন্য হাতে আসাটা আমার কি ভালো দেখায়?

কি জানি কি বুঝলে, ঠোঁট দুটো মৃদু ফাঁক করে 

কিছু একটা বলার চেষ্টা করলে, কিন্তু 

পেলাম একটা হালকা হাসির ঝিলিক,

আশ্বস্ত হলাম, বড় অন্যায় হয়নি তবে;

বললাম, ভালো না লাগলে ফিরিয়ে দিয়ো   

বললে - 'তা কেন? বলো কোথায় যাবে' | 


তারপর শুধু কথা আর কথা, যেন 

কথার মালায় আষ্ঠে পৃষ্ঠে বাঁধবে আমায়,  

যেন নেই সময় বেশি তোমার হাতে, 

যেন কঠিন পাঞ্জা কষে অদৃষ্টের সাথে 

ছিনিয়ে এনেছ কয়েকটা মুহূর্ত আমার জন্য !    

আমার কাজ এক্কেবারে সোজা, মুগ্ধ হয়ে

তোমায় দেখা আর ভেসে যাওয়া 

তোমার রূপের জোয়ারে, কথার স্রোতে; 

এতো কাছে, তবু যেন ছায়াছবি কালোয় সাদায়,

দূর থেকে শুধু দেখতে হয়, কাছে গেলে ধোঁয়া,  

ভুলে গেছিলাম, তুমি আসলে অন্য কারো; বললাম, 

তোমার ভালো না লাগলে এই শেষ, বাড়ি যাবে?    

বললে - 'তা কেন? তুমি চাইলেই আমায় আবার পাবে' |


ইচ্ছে করেনি সেদিন ছেড়ে আসতে তোমায়,

এক অপূর্ব ভয়, কি জানি বোধহয় এমনটাই হয় 

নাকি সবটাই আমার কল্পনা, চপল মনের ভান  

নিঠুর মরীচিকাকে ভাবা শীতল মরুদ্যান;

সেদিন চেয়েছিলো মন, থাকুক থমকে সময় কিছুক্ষন |   

যেদিন তুমি চলে গেলে, বলে গেলে, হয়তো 

দেখা হবে তুমি চাইলে, কথা হবে আবার,   

ভুলে গেছিলাম ফের, তুমি তো আসলে অন্য কারো,    

নও আমার; তবু জানতে ইচ্ছে করে, আমার দেওয়া 

একটা শুকনো গোলাপও কি আছে বইয়ের ফাঁকে  

রাখা সযত্নে, অথবা তোমার মনের গোপন কোনে?  

হোক মরীচিকা, তবু বারে বারে তোমাকেই চায় মন; অথচ   

কাল স্বপ্নে এসে হায়, শিয়রে বসে মৃদু হেসে, বললে -    

'তা কি করে হয়? আমি যে অন্য কারো, তোমার তো নয়' |     


© ভাস্কর ভট্টাচার্য | "মন উথাল" সিরিজ | ১৬.০৭.২০২২